ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে
ধর্ষণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নয়, বরং প্রতিটি মামলাতেই আইনে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে তদন্ত প্রক্রিয়া এবং নিষ্পত্তি সম্পন্ন করতে হবে। তারা বলেন, চলমান মামলায় নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার অভাব, ডিএনএ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। শাস্তি প্রদানের নির্দেশিকার অভাব এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করায় ধর্ষণ অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে মূল অন্তরায় বলে উল্লেখ করেন তারা।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তারা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি, যথা—বিচারক, আইনজীবী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিকতায় পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিচার ব্যবস্থা দ্রুত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান না হলে অপরাধীরা মনোবলে বলীয়ান হয়ে যাবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, পিতামাতার মাধ্যমে পারিবারিক পর্যায় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সচেতনতা তৈরি এ ধরনের অবক্ষয় প্রতিরোধের অন্যতম পন্থা। বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিবর্গ এবং সামাজিক পর্যায় থেকে সহিংসতা প্রতিরোধ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি কোনো কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও সেই চাপের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল আলোচিত বা জনমতের কেন্দ্রে থাকা মামলাগুলোতেই নয়, বরং সব ক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে একদিকে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
আইন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি জিনাত আরা বলেন, আইন কমিশনের কার্যতালিকার মধ্যে থাকা একটি অভিন্ন শাস্তি প্রদানের নির্দেশিকা প্রণয়ন ধর্ষণ অপরাধের ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত উভয় পক্ষের আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের বিষয়ে নাগরিক সামাজিক সংগঠনসমূহের সচেতনতা প্রশংসার দাবি রাখে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে অভিযুক্তের শাস্তি প্রদান করতে গেলে চূড়ান্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র ভুক্তভোগী নয়, অভিযুক্ত নিজেও ন্যায়বিচারের অধিকারী এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করা প্রয়োজন, যা ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই হয়েছে।
পূর্বতন নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং নারীপক্ষ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভিন হক বলেন, সমাজের কোন উপাদানগুলো অপরাধীদের ধর্ষণ বা অন্যান্য সহিংসতা সংঘটনের দিকে ধাবিত করছে সে বিষয়ে মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ধর্ষণের অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, যা সম্ভব হবে রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সদিচ্ছায়। ধর্ষণে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইন সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নাগরিক সমাজ সংগঠন কর্তৃক কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়াও আইনি বিধান মেনে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করার জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোসা. লিজা বেগম বলেন, ধর্ষণের ভুক্তভোগী নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পাদনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাছাড়া বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহের ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর দ্বারা তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সমন্বয়ের অভাব ও তথ্যভান্ডারের অভাবের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এড. শিপ্রা গোস্বামী বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় কার্যকরী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিভিত্তিক ই-কেস মনিটরিং ব্যবস্থা জরুরি। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মামলা তদারকির ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগী পুনর্বাসন সংক্রান্ত তদারকির ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে ধর্ষণসহ অন্যান্য নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা হ্রাস পাবে।