সুজন সম্পাদক
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, হাওরের উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের জাতির স্বার্থ জড়িত রয়েছে। হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হাওরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। সুজনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি ‘হাওরের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন ও হাওরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, হাওরের মূল সমস্যা হলো সুশাসনের সমস্যা। সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। তবে সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। আমরা নাগরিকরাও যদি কিছু উদ্যোগ নেই, সোচ্চার হই, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, হাওরবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও খরচ হয়তো বাড়বে। কিন্তু এর ইতিবাচক দিক হলো, হাওরবিষয়ক কাজগুলোর সমন্বয় হবে, এই মন্ত্রণালয় শুধু হাওরের উন্নয়নেই কাজ করবে, অন্যান্য বিষয়ের মতো উপরি বিষয় না হয়ে হাওর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বিষয়ে পরিণত হবে। তবে সরকার যে পন্থায় উন্নয়ন করুক না কেন মূল বিষয় হলো হাওর ও হাওরবাসীর সমস্যাগুলোর সমাধান হওয়া দরকার। আর তা করা গেলে সারা দেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুজন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি নুরুল হক আফিন্দী। সঞ্চালনা করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুজনের সহযোগী সমন্বয়কারী নেসার আমিন এবং সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক কাজী নুরুল আজিজ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধে ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, ‘বর্তমানে হাওর নিয়ে কাজ করছে কৃষি, পানি সম্পদ, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নৌপরিবহনসহ একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। ফলে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, একই ধরনের কাজ একাধিক সংস্থা করে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ দায়িত্বহীন থেকে যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি দুর্বল হয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা মনে করি, স্বতন্ত্র হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করলে একটি একক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষণা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, ‘প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে। কিন্তু কৃষকের দুর্ভোগ কমছে না। কারণ, আমরা মূল সমস্যার পরিবর্তে উপসর্গের চিকিৎসা করছি। আজ হাওরের নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত সড়ক, অপর্যাপ্ত কালভার্ট এবং পলি জমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাঁধ ঠিক থাকলেও পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হাওরকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
মূলপ্রবন্ধে আরও বলা হয়, ‘হাওর আমাদের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি। এখানকার বোরো ধান জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এটি বাংলাদেশের দেশীয় মাছের অন্যতম প্রজননক্ষেত্র, পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র। একসময় হাওরে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৬০-৭০ প্রজাতিতে নেমে এসেছে। তাই, হাওর রক্ষা মানে শুধু একটি অঞ্চল নয়; বাংলাদেশের খাদ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিকে রক্ষা করা।’