‘জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, দেশের রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের জন্য আগে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
তারা বলেন, জুলাই বিপ্লবপরবর্তী এ সময়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ এসেছে। এক্ষেত্রে জুলাই বিপ্লবের প্রধান স্লোগান ‘মেধার মূল্যায়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বৈষম্যমুক্ত করতে হবে।’ সর্বোপরি বাঙালি মুসলমান হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় বিশ্বের মাঝে নতুন করে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে আমরা আমাদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলছি।
তিনি বলেন, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামিক হিস্ট্রি এবং অ্যারাবিকের মতো বিষয়গুলোকে কণ্ঠরোধ করার একটি সুপরিকল্পিত কাজ চলছে। আমাদের প্রশাসনে যেন ধর্মকে পছন্দ করা হয় না, তাই আগামী দিনের শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ঢোকানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা থামিয়ে দিয়েছিলাম। এখন আবার সেটা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে আমরা জাপানের দিকে তাকাতে পারি। জাপানের প্রাথমিক স্কুলগুলোতে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই, টেবিল মোছা থেকে শুরু করে সব কাজ ছাত্র ও শিক্ষকরা মিলেমিশে করে এবং দুপুরে একসঙ্গে বসে খাবার খায়। ছাত্রদের মধ্যে এই যে কর্মস্পৃহা তৈরির পদ্ধতি, এগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দুর্ভাগ্যজনকই থেকে যাবে।
অন্যদিকে এখানে অতি রাজনীতির প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা ক্যামব্রিজের মতো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই । সেখানে সরকারদলীয় লোকেরা ভাইস চ্যান্সেলর হন না। এখানে ছাত্ররাজনীতির নামে যে নোংরামি চলে, তা বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় যেমনÑইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে নেই, সেখানে রাত ৯টায় মেয়েরা নিরাপদে ক্লাস করে ঘরে ফিরতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে সে অনুকূল পরিবেশ আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। তিনি বলেন, আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ভেতর ধর্মীয় চেতনাবোধ থাকতে হবে এবং আমাদের ধর্মহীন করার যেকোনো প্রচেষ্টা সচেতনভাবে রুখে দিতে হবে।
প্রধান বক্তা হিসেবে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা প্রথমেই আমাদের পড়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজেই মুসলমান হিসেবে আমাদের শিক্ষা অর্জন করা ফরজ। দ্বিতীয়ত, আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এজন্য আমাদের অবিরত পড়াশোনা করতে হবে। তৃতীয়ত, নিজেকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের বিপুল জনসংখ্যার দেশ, কিন্তু দেশের সাইজটা ছোট। আল্লাহ আমাদের অত্যন্ত মেহেরবানি করে উর্বর জমি দিয়েছেন, কিন্তু জমির তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি। এ অবস্থায় আমাদের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে অবিরত আধুনিক প্রযুক্তি শিখতে হবে।
ভিয়েতনামের উন্নয়নের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটির জনসংখ্যা সাড়ে ১০ কোটি। তাদের মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলার, আমাদের প্রায় দ্বিগুণ। তারা প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছে আমাদেরও পরে। এ বছর তাদের জিডিপি হবে আট শতাংশের ওপর। আর গত বছর আমাদের জিডিপি ছিল ৩ দশমিক ৭, চলতি অর্থবছর এটা সাড়ে চার শতাংশ হবে বলে এডিবি পূর্বাভাস দিয়েছে। গার্মেন্টস রপ্তানিতে আমরা চায়নার পরে ছিলাম। এখন আমরা তিন নম্বরে আর ভিয়েতনাম দুই নম্বরে চলে গেছে।
তিনি বলেন, আমাদের জাতি হিসেবে স্বাধীন থাকতে, পরনির্ভরশীল না হয়ে স্বনির্ভর হতে হলে এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য অবশ্যই আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে ।
দেশের নানা ধারার শিক্ষার কথা উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লবে আমাদের একটা কথা ছিলÑবৈষম্যহীন রাষ্ট্র তৈরি। এজন্য ছেলেরা জীবন দিয়েছে। বৈষম্যহীন রাষ্ট্র তৈরি করতে গেলে এ শিক্ষাব্যবস্থাগুলোতে কোনো বৈষম্য রাখা যাবে না। সবাইকে একভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য আমাদের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, এটাই হচ্ছে আমাদের প্রথম কাজ।
শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি উপকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার প্রধান ‘র’ ম্যাটারিয়াল হলো ছাত্র। আমাদের এ উপকরণ আল্লাহর রহমতে ভালো। দ্বিতীয় উপকরণ হলো, বইপত্র। এ বইপত্রের দিকে বিরাট দুর্বলতা আছে। আমাদের এখানে বইপত্র কম লেখা আছে। কাজেই স্কলারদের বেশি বেশি করে সব ধরনের বইপত্র লেখার আহ্বান জানান তিনি। তৃতীয়ত, শিক্ষক দরকার। তাই সংস্কার নিয়ে আলোচনা করলে এ তিনটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অতিরিক্ত রাজনীতিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, শিক্ষকরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে তিনি প্রকৃত শিক্ষক হতে পারবেন না। কাজেই শিক্ষকদের মধ্যে রাজনীতিকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ কোটা না, মেধার স্লোগান দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা জীবন দিয়েছে। এখন কোটা মানে মেধার ক্ষেত্রÑএটা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন না করতে পারি, তাহলে তো বিপ্লবের প্রধান উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। দুঃখজনক হলো, এসব শিক্ষক ও ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ হঠাৎ করে ১৯৭২-এ নাজিল হয়নি। বাঙালি মুসলমানের লড়াই হাজার বছরের লড়াই এবং এ লড়াই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমানের যে মিশ্রণ, এটা আমাদের বুঝতে হবে। আমরা বাঙালি কিন্তু আমাদের ধর্ম ইসলাম, আমরা মুসলমান। এ মুসলমান এবং বাঙালি কালচারের সংমিশ্রণে বাঙালি মুসলমান হিসেবে আমরা এগিয়ে যাবÑআমাদের পরিচয় এটাই। এ পরিচয়কে ভর করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যে শিক্ষা সংস্কারের কথা আমরা বলছি, সর্বক্ষেত্রে এটা দিতে হবে । আমি একমত, আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। এতে আমরা ধর্মশিক্ষা পাব, নৈতিকতা শিক্ষা পাব, আমরা ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারব। সর্বোপরি, আমাদের পরিচয় জানতে পারব ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে ।
তিনি বলেন, সমস্যার কথা হলো, আমাদের দেশে আসলে ইসলামের ইতিহাস জানানোর খুব একটা চেষ্টা করা হয়নি। কোনো পর্যায়েই করা হয়নি। এমনকি পাকিস্তান আমলে পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে ইসলামিকভাবে পড়ানো হয়নি। কাজেই এ ব্যর্থতা দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, এ জুলাই বিপ্লবের পর এখন একটা সুযোগ এসেছে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর। এজন্য এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ডিজাইন করতে হবে যে, শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। তার সঙ্গে তাদের এমনই আত্মবিশ্বাস থাকবে, এমন পরিচয়ের ওপর তারা দাঁড়িয়ে থাকবে, এমন ঈমানের বলে তারা বলীয়ান হবে যে, পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের স্বাধীনতা আর হরণ করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।
সভাপতির বক্তব্যে আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উপদেষ্টা অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, যে শিক্ষায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতে যাওয়া যাবে, সে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় দলকানা নিয়োগ বন্ধ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জনগণকে সম্মান করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং একটি আদর্শভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও উন্নত সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কোরআন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং প্রতিটি শ্রেণিতে একজন করে কোরআন শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কোরআন ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, মুফতি আলী হাসান উসামা, শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, ড. খলিলুর রহমান মাদানী, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামসুল আলম, রোকেয়া বেগম এমপি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম।