হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

লাফিয়ে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, অবনতির পথে বন্যা পরিস্থিতি

স্টাফ রিপোর্টার

বর্ষার চিরচেনা রূপ—ঝুম বৃষ্টি, মেঘের গর্জন আর অবিরাম বর্ষণে প্রকৃতিতে নিয়ে এসেছে অন্যরকম আবহ। তবে প্রকৃতির এই নয়নকাড়া রূপই এখন দেশের লাখো মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশের অন্তত ১৬টি জেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এরইমধ্যে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বসতঘর, সড়ক ও কৃষিজমিতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। সেখানকার পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। ভারী বর্ষণে গত দুইদিনে কক্সবাজারে পাহাড়-দেয়াল ধস ও পানিতে ডুবে ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সারাদেশে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। নিম্নচাপের প্রভাব কেটে গেলেও উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। এজন্য সাগর উত্তাল থাকায় সমুদ্র বন্দরসমূহকে বারবার তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। নৌবন্দর সমূহেও এক নম্বর সতর্ক বার্তা অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় আগামী দুইদিন দেশের আট বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানিয়েছে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।

তবে বুধবার বিকালে আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর থেকে বৃষ্টির প্রবণতা কমে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, দেশের কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তা ভারী এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে তা অতিভারী বৃষ্টি বলে গণ্য করা হয়।

আবহাওয়া দপ্তরের বুধবার সন্ধ্যা ছয়টায় দেওয়া আগের ২৪ ঘণ্টার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সারাদেশেই কমবেশি বৃষ্টি হলেও চট্টগ্রাম বিভাগেই গতকালও সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামের আমবাগানে সর্বোচ্চ ২৭৭, চট্টগ্রাম শহরে ১৯৪, রাঙামাটিতে ১৬৫, বান্দরবানে ২১০, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ৮৬, সীতাকুন্ডে ১২৮, নোয়াখালীর হাতিয়ায় ১১১, কক্সবাজারে ১০৩, কুতুবদিয়ায় ১৪২, কিশোরগঞ্জের নিকলিতে ২৩০, ময়মনসিংহে ১৭৫, নীলফামারীর ডিমলায় ১৩৫, সিলেটে ১৩০ ও শ্রীমঙ্গলে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন রাজধানীতে ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

এর আগের দিন বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল; যা ৪৩ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এদিকে, বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সাঙ্গু নদী বান্দরবান এবং মাতামুহুরী নদী লামা (কক্সবাজার) স্টেশনে এরইমধ্যে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল—রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা গেছে। আগামী ৩ দিন এই অঞ্চলগুলোতে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে এবং পরবর্তী ২ দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

এর ফলে গত ২৪ ঘণ্টায় গোমতী, মুহরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি সমতল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। এছাড়া ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু স্থানে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় নদীসমূহ সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অন্যদিকে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও কুশিয়ারা নদীর পানি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে।

তিস্তা নদীর পানি সমতল ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীসহ বিভিন্ন জেলায় তীব্র জলাবদ্ধতা এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় গতকাল বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা হবে।

বন্যা উপদ্রুত জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। প্লাবিত অঞ্চলের মানুষদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করার পাশাপাশি জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, দিনভর বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীবাসী। অফিস শেষে বাড়ি ফেরার সময় গণপরিবহন সংকটে ভোগান্তিতেও পড়েন অনেকে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এমন বৃষ্টি থাকতে পারে আরো কয়েকদিন।

সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

আমাদের দক্ষিণ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম বাবর জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ডিঙিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়ন কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। বুধবার বিকেল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে থাকায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাতেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় পানি ঢুকে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়।

বন্যার পানি সাতকানিয়া আদালত চত্বরে প্রবেশ করায় বুধবার যুগ্ম জেলা জজ আদালত ও সাতকানিয়া চৌকি আদালতের বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলার সবকটি ইউনিয়নই কমবেশি বন্যাকবলিত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য শুকনো খাবারের বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

এএস

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা, মত বিশেষজ্ঞদের

ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা, সতর্কতা জারি

ঝড়ের শঙ্কা কাটেনি, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সংকেত বহাল

দুর্যোগের আগাম বার্তার ভরসাস্থল আবহাওয়া দপ্তরই মহাদুর্যোগে

সমুদ্রে লঘুচাপ, বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল

সাগরে নিম্নচাপ, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

তাপপ্রবাহের মধ্যে লঘুচাপে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস

ঢাকায় বৃষ্টির পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা: আবহাওয়া অফিস

আষাঢ়ের খরতাপে অস্বস্তি, লঘুচাপে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস