দেশে গত দেড় দশকে বজ্রপাতে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। প্রতি বছর বজ্রপাতের ঘটনা বাড়লেও এর প্রতিকারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ পর্যন্ত প্রতিকারে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে ‘গায়েবি’ তালগাছ প্রকল্পের তালগোলে শতকোটি টাকা গায়েব হয়ে গেছে।
আবহাওয়া দপ্তরের মতে, প্রতি বছর বৈশাখ মাস শুরু হলেই ভয় বাড়ে কালবৈশাখী আর বজ্রপাতের। পত্রপত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত ৪০ জন মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। গতকাল শনিবার সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার পৃথক স্থানে বজ্রপাতে মারা গেছে ১২ জন। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত ২১ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছে। এছাড়া গত বছর ২৪৩ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (জরুরি সাড়া দান কেন্দ্র) জাহিদ হাসান বলেন, যাচাই করার পর এ তথ্য পাওয়া গেছে।
গত বছরের ২৮ জুন আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে আবহাওয়া বিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা রাইমসের (রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম) আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বলেন, বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন বজ্রপাত হয়। মারা যায় প্রায় ৩৫০ জন। বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো হচ্ছেÑসুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি থাকে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বজ্রপাতের হার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরো বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ৩০০ মানুষ মারা যায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতের কারণে বছরে ২০ জনেরও কম মৃত্যু ঘটে।
জিডাস্টার ফোরাম বলছে, গত দেড় দশকে বজ্রপাতে চার হাজার ৫০৮ জন মারা গেছে। এর মধ্যে গত বছর ৩৫০ জন, ২০২৪ সালে ২৮৮ জন, ২০২৩ সালে ২৮০ জন, ২০২২ সালে ৩১৬ জন, ২০২১ সালে ৩৬২ জন, ২০২০ সালে ৩৮১ জন, ২০১৯ সালে ২৩০ জন, ২০১৮ সালে ২৭৭ জন, ২০১৭ সালে ৩০২ জন, ২০১৬ সালে ৩৫০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৪ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১০ সালে ১২৩ জন মারা গেছে। আর চলতি বছর গতকাল ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জন বজ্রপাতে মারা গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১৯ সালেই ৪০১ জন মারা যায়।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে, প্রতি বছর বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ৭০ শতাংশই মাঠে কাজ করার সময়। বাকি সাড়ে ১৪ শতাংশ খেতখামার থেকে বাড়ি ফেরার পথে আর ১৩ শতাংশ মারা যায় গোসল কিংবা মাছ ধরার সময়। এছাড়া বজ্রপাতে আহতরা স্মৃতিশক্তি হ্রাস, শ্রবণশক্তি হারানো, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, কর্মক্ষমতা হ্রাস, ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ, মাথা ঘোরা অথবা ঝিমঝিম করা, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যাজনিত বিভিন্ন ধরনের স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় প্রথমে নেওয়া হয়েছিল তালগাছ সৃজন প্রকল্প। ব্যবস্থাপনার তালগোলে প্রায় শতকোটি টাকা গায়েব হয়ে যায় ‘গায়েবি’ গাছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, ‘তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া। কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষাও হয়নি।’ এখন তালগাছ কর্মসূচি বাতিল করে শুরু হয়েছে বজ্রপাত প্রতিরোধক বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের কাজ। এটি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। ৩০ থেকে ৪০ ফুট লম্বা দণ্ডে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি জিআইপি পাইপ এবং তামার তার থাকে। বজ্রনিরোধক দণ্ডের ওপর বসানো লাইটনিং অ্যারেস্টার ডিভাইসের মূল কাজ, নির্ধারিত ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনা। এতে মিটারের মতো কাউন্টার রয়েছে, কয়টি বজ্রপাত হলো, তার হিসাব সেখানে থাকবে। যন্ত্রটিকে ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রাখতে হয়। যে ধরনের অ্যারেস্টার এখন ব্যবহৃত হচ্ছে, তাতে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে এটা কার্যকর হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের অ্যালার্ট মেসেজ দেওয়া শুরু হয়েছে। এর আগে এ সক্ষমতা ছিল না।
গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএম) নিতাই চন্দ্র দে সরকার আমার দেশকে বলেন, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ আছে। তাই এটা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এখন পূর্বভাস ও সচেতনতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ‘গায়েবি’ তালগাছ প্রকল্পের তালগোলে শতকোটি টাকা গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তালগাছ প্রকল্প একটি দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প। ফলে বিশেষজ্ঞরা এটাকে অর্থের অপচয় বলছেন। অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইসব প্রকল্প সম্পর্কে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ ভালো বলতে পারবে।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলেই নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে যত পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।