হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

তাপমাত্রার চেয়ে বেশি উত্তাপ, ভ্যাপসা গরমে দিশেহারা নগরবাসী

সরদার আনিছ

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে গতকাল ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও আজ শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টি নেই। এছাড়া তাপমাত্রা আরো বেড়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে; এতে ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা বেড়ে গেছে। টানা আট দিনের ভ্যাপসা গরমের নগরবাসী অনেকটাই দিশেহারা; কখন এক পশলা ভারী বৃষ্টি পুরো শহরকে শীতল করবে—অপেক্ষাতেই সময় পার করছেন রাজধানীবাসী।

আবহাওয়া দপ্তর বলছে, মে মাসের প্রথম দিনের মতো আজ আবার রাজধানীতে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এর আগে গত বুধবারও তাপপ্রবাহ ছিল রাজধানীতে। ওই দিন এ রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে গত বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ২ দশমিক ২ ডিগ্রি কমে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গরম আরও বেড়ে যায়। আর আজ মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার দেশের খুলনা বিভাগে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও সাতক্ষীরা চার জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও শুক্রবার বয়ে গেছে ১৩ জেলার ওপর দিয়ে। খুলনা বিভাগের জেলাগুলোসহ দেশের ১৬টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ যাচ্ছে। তাপপ্রবাহ আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

বিকাল চারটার দিকে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক আমার দেশকে বলেন, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তাপপ্রবাহ এবং ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকতে পারে। কেন এত গরম অনুভূত হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বেশি না হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়; এতে গরম আরো বেশি অনুভূত হয়। কেননা ঘায়ের সহজে ঘাম শুকাতে দেয় না। রাজধানীসহ সারাদেশে গরম কমার সম্ভাবনা সহসাই দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও আগের দিনের তুলনায় আজ তাপমাত্রা বেড়ে চলমান ভ্যাপসা গরম কমেনি; বরং বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যে গরম আরো তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে আগের কয়েকদিনের তুলনায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমেছে।

আজ শনিবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও পাবনার ইশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ রাজধানীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল রাজশাহী, লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও বাগেরহাটের মোংলায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা আগেরদিন ছিল খুলনার কয়রায়, ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে তাপমাত্রার পারদ যতটা না উপরে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে শরীরে। তাপদাহের সঙ্গে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গত আটদিন ধরে রাজধানীজুড়ে বিরাজ করছে এক অসহনীয় ভ্যাপসা গরম। সকালের দিকে হালকা মেঘ বা কোথাও কোথাও সামান্য গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও তা স্বস্তি তো আনছেই না, উল্টো গরমের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। ঘরে-বাইরে কোথাও মিলছে না এতটুকু শান্তি।

সাধারণত তাপমাত্রা বেশি হলে বাতাস শুষ্ক থাকলে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায়। কিন্তু মে মাসের এই সময়ে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের শরীরের ঘাম সহজে শুকাচ্ছে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি মনে হচ্ছে।

দুপুরের দিকে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও ফার্মগেট ঘুরে দেখা যায় শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন কষ্ট। তীব্র রোদে পিচঢালা পথ থেকে যেন আগুন বের হচ্ছে। যান্ত্রিক এই শহরের গণপরিবহনগুলোতে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। বাসের ভেতরে গরমে অনেককেই হাতপাখা বা রুমাল দিয়ে ঘাম মোছার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

কারওয়ানবাজার এলাকায় রিকশাচালক এখলাস উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ‘কোনো বাতাস নাই। রিকশা চালাইলে গা দিয়া টপটপ কইরা পানি ঝরছে, শরীর এক্কেবারে ছাইড়া দেয়। একটু পরপর পানি খাইয়াও তৃষ্ণা মেটে না। গরমের চোটে দুপুরে রিকশা চালানোই অসম্ভব হয়া পড়ছে।’

ফুটপাথের হকার থেকে শুরু করে দিনমজুর—সবাই এই ভ্যাপসা গরমে নাকাল। তীব্র রোদের কারণে দুপুরের দিকে রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা কিছুটা কমে যাওয়ায় দৈনিক আয়ের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে।

চরম এই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রাজধানীতে ডায়রিয়া, ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা), হিট স্ট্রোক, জ্বর ও সর্দি-কাশির মতো গরমজনিত রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে সুস্থ থাকতে হলে সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলতে হবে। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন পানের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। একই সাথে রাস্তার ধারের খোলা শরবত বা বাসি খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে মেঘ তৈরি হয়ে হালকা বৃষ্টি হলেও, এই ভ্যাপসা গরম থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। একটি বড় অঞ্চলজুড়ে টানা ও ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত বাতাসের এই আর্দ্রতা এবং ভ্যাপসা ভাব কমবে না।

আকাশ মেঘলা হলেও গুমোট এই পরিস্থিতি কখন কাটবে, আর কখন এক পশলা ভারী বৃষ্টি পুরো শহরকে শীতল করবে—চাতক পাখির মতো এখন সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছে রাজধানীবাসী।

বৃষ্টির আবহ তৈরি হলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি নেই

ঈদের দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি, দক্ষিণাঞ্চলে ভ্যাপসা গরমের পূর্বাভাস

ঈদের দিন আবহাওয়া কেমন থাকবে, জেনে নিন

ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস, স্বস্তি মিলবে কবে

যেসব অঞ্চলে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস

এবার চীন সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

তাপমাত্রা কমলেও রাজধানীতে ভ্যাপসা গরম, রাতে হালকা বৃষ্টির পূর্বাভাস

ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত, স্বস্তির লক্ষণ নেই

আকাশ কী সবসময়ই নীল থাকবে?

১৪ বছরেও গ্রীষ্মে এমন পরিস্থিতি দেখেননি আবহাওয়াবিদেরা