দেশের আকাশ যেন আজ অশ্রুঝরা কোনো ব্যথিত জনপদ। গত পাঁচ দিন ধরে প্রকৃতির এই অঝোর কান্না থামার নাম নেই। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ বিদায় নিলেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আজ শুক্রবারও রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে অবিরাম বর্ষণ। এই টানাবর্ষা জনজীবনকে যেমন স্থবির করে দিয়েছে, তেমনি রাজধানীবাসীর মনে জাগিয়েছে এক বিষণ্ণ হাহাকার।
সাঁঝের শিশির কিংবা ভোরের রোদ—সবই আজ যেন মেঘের অকাল আঁধারে ম্লান। পূর্ণিমার চাঁদ কিংবা নীলাকাশের হাতছানি নেই আজ পাঁচ দিন ধরে; শুধু ঝরেই চলেছে অবিরাম বৃষ্টিধারা। শুরুটা হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এক অস্থির নিম্নচাপের হাত ধরে। সেই পথিক নিম্নচাপ তার অভিমান মিটিয়ে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে দিগন্তের ওপারে। কিন্তু মেঘের কান্না থামেনি। এখন তো মৌসুমি বায়ুর সেই চিরাচরিত প্রাণচাঞ্চল্য—সেই সক্রিয় বাতাসই আকাশজুড়ে গেয়ে চলেছে তার বর্ষণমুখর সুর।
সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত রাজধানীতে ১৫ মিলিমিটার, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা আর বাতাসের আর্দ্রতা যেন জানিয়ে দিচ্ছে, বৃষ্টি এখনই থামার নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, শুধু আজ নয়, ভারী বৃষ্টির এই ধারা শনিবার এমনকি রোববার পর্যন্ত গড়াতে পারে।
এবার এই সময়ে কেন এতো বেশি বৃষ্টি হচ্ছে এবং তা আর কতদিন থাকবে এমন প্রশ্নে জবাবে আবহাওয়া দপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আবহাওয়ার এ অবস্থা আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত থাকতে পারে। এরপর থেকে পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য তিনি বৈশ্বিক এল নিনোর প্রভাবকেই দায়ী করে বলেন, জুনে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হলেও জুলাইয়ের শুরুতেই কমসময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে; এবার বছরজুড়েই কমবেশি এল নিনোর প্রভাব থাকতে পারে। এতে অতিবৃষ্টি ছাড়াও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনাও ঘটতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্ষার বৃষ্টি সাধারণত অনেক সময় ধরে থেমে থেমে কখনো স্বল্প কখনো বেশি হয়ে থাকে; কিন্তু এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে তা বর্ষাকালের মতো কোনো স্বাভাবিক বৃষ্টি নয়। অল্প সময়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হচ্ছে; এটা বৈশ্বিক এল নিনোর প্রভাব বলেই আমরা মনে করছি।
এই প্রবীণ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, জুলাই মাসে একদিনে এতো বৃষ্টি গত চার দশকেও দেখা যায়নি। আমাদের কাছে যতটা রেকর্ড রয়েছে তাতে ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল।
এদিকে পাহাড়ধস ও বন্যার করুণ বাস্তবতায় যখন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটে মানুষের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন রাজধানী ঢাকাও যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে আছে। রাজপথের জলাবদ্ধতা আর যান চলাচলের ধীরগতি রাজধানীবাসীর প্রাত্যহিকতায় যোগ করেছে এক অন্তহীন অপেক্ষা।
টানা বৃষ্টির এই আবহে সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ফুটে উঠছে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা গভীর উপলব্ধির বয়ান। নাজমুল হক শামীম নামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, শহরটা যেন পানির নিচে কোনো প্রাচীন রহস্যময় নগরী হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির শব্দে কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি ধুয়ে গেলেও, মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি যেন আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।
সাদিয়া আফরোজ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, ‘বৃষ্টির কাব্যিক রূপটা কেবলই উপভোগের হয়, যখন বাড়ির বারান্দায় চা হাতে দেখা যায়। কিন্তু এই টানা বৃষ্টির নিচে যখন লাখো মানুষের ঘরবন্দী হওয়ার খবর শুনি, তখন বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা মনে হয় এক একটি দীর্ঘশ্বাস।’
আবু বকর সিদ্দিক নামের প্রবীণ নাগরিক বলেন, ‘আগেকার দিনে বৃষ্টি মানে ছিল ফসলের হাসি, আজ বৃষ্টি যেন নাগরিক জীবনে এক আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়েছে; মেঘের গর্জনে আজ বৃষ্টির কবিতার চেয়েও মানুষের নিরাশ্রয় হওয়ার ভয়টাই বেশি চোখে পড়ছে।’
আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তার তথ্যমতে, সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগেই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে বৃষ্টির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকলেও সারা দেশেই বৃষ্টির এই ধারা বজায় থাকবে। এতে দেশের চার সমুদ্র বন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা এবং নৌবন্দর সমূহে এক নম্বর সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের দৃষ্টিতে ভারী বৃষ্টির সংজ্ঞায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটারের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে অতি ভারী বৃষ্টির শঙ্কা থাকে, সেখানে এই একটানা বর্ষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শুক্রবার সকাল ছয়টা নাগাদ আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ২১১ মিলিমিটার। এছাড়া টেকনাফে ২০৯, সাতক্ষীরায় ১৭৯, গোপালগঞ্জে ১৬৩, চট্টগ্রামের আমবাগানে ১৫৩, বান্দরবানে ১৩১, কুতুবদিয়ায় ১২৯, সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ১৩৮, টাঙ্গাইলে ১২৪, মাদারীপুরে ১১১ এবং যশোরে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ সময় রাজধানীতে ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
তবে এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টায় আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বেশিরভাগ জায়গায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরো বেশি ছিল। চট্টগ্রামের আমবাগান স্টেশনে সব থেকে বেশি বৃষ্টিপাত ৩২৯ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়। এছাড়া কুতুবদিয়ায় ৩০০ মিলিমিটার, চট্টগ্রামে ২৪৯ মিলিমিটার, বান্দরবানে ২৩৫ মিলিমিটার, রাঙামাটিতে ১৩০ মিলিমিটার, তেতুঁলিয়ায় ১২২ মিলিমিটার, গোপালগঞ্জে ১৪২ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
আগামী রোববার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, সোমবার নাগাদ বৃষ্টির গতি কমতে পারে। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ আর আকাশের অঝোর কান্না কবে থামবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু বৃষ্টির এই ছন্দময় পতনের মাঝে, রাজধানীবাসীর হৃদয়ে এখন প্রার্থনার সুর—বৃষ্টি থামুক, মেঘ কাটুক, আর পৃথিবী আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসুক।