শহুরে জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ প্রায়ই প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়। কেউ গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করতে চান, কেউ পাহাড়-জঙ্গলে বসতি গড়তে চান, কেউ ছোট খামার বা বাগান করে স্বনির্ভর জীবন বেছে নিতে চান। ধারণাটি নতুন নয়। শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিমতা থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা সাহিত্য ও দর্শনে শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলেই কি মানুষ সত্যিই মুক্ত হতে পারে? মার্কিন সাময়িকী দ্য নেশন-এ প্রকাশিত ড্যান সিনকিনের প্রবন্ধ ‘হাউ এ ক্রিয়েটিভ মাইন্ড লাইভস ইন ন্যাচার’ এই প্রশ্নটিই নতুনভাবে সামনে এনেছে।
সিনকিনের নিজের জীবনই এ প্রশ্নের পরীক্ষাগার। ২৩ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় হরিণ শিকারে যান। খাবারের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে মাইকেল পোলানের দ্য অমনিভোরস ডিলেমা পড়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, মাংস খেলে অন্তত একটি প্রাণী হত্যার অভিজ্ঞতা নিজের জানা উচিত। একই সময়ে তিনি উত্তর মিনেসোটায় একজন বন্যপ্রকৃতি-গাইড হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তরুণদের গাছপালা, প্রাণীর পদচিহ্ন, নদী ও বনের সঙ্গে পরিচয় করানোর পাশাপাশি তিনি নিজেও প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
এরপর তিনি সঙ্গিনী জ্যাকলিনের সঙ্গে আর্জেন্টিনায় চলে যান। শেষ পর্যন্ত তারা মেনদোজার কাছে একটি পারমাকালচার খামারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তারা গাছ লাগিয়েছেন, আপেল সংগ্রহ করেছেন, সেচব্যবস্থা তৈরি করেছেন, প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সিনকিন বুঝতে পারেন, কৃষিকাজ তার জন্য সহজ নয়। শারীরিক শ্রমে তিনি ধীর; বরং লেখালেখি ও চিন্তার কাজেই তাঁর স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। খামারের পরিবারও তাঁকে ‘সৃজনশীল’ হিসেবে বিবেচনা করে তুলনামূলকভাবে তাঁর উপযোগী কাজ দেয়।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন অস্টিন ওয়েলার্সের ২০২৫ সালের উপন্যাস ‘হটহাউস ব্লুম’। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনা মানুষের সমাজ, অর্থনীতি ও নিজের পরিচয় থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির মধ্যে এমন এক জীবন খুঁজতে চায়, যেখানে চিন্তারও প্রয়োজন থাকবে না। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি পারমাকালচার খামারে গিয়ে সে প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হতে চায়, যেন নিজস্ব মানবিক সত্তাটিও বিলীন হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা তাকে ছাড়ে না। খামারের আপেল নষ্ট হয়, অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়, ভবনের মেরামতে হাজার হাজার ডলার লাগে, ঋণের প্রয়োজন হয়। একসময় তাকে কম্পিউটারে বসে অন্য খামার নিয়ে গবেষণা করতে হয়। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছেও যেতে হয়। অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে পালিয়ে গিয়ে আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
সিনকিন এখানে পরিবেশ-চিন্তাবিদ উইলিয়াম ক্রোননের ‘উইল্ডারনেস’ ধারণার সমালোচনাকেও সামনে আনেন। ক্রোননের মতে, মানুষ প্রকৃতিকে প্রায়ই এমন এক পবিত্র ও মানবসমাজ-বহির্ভূত স্থান হিসেবে কল্পনা করে, যেখানে গিয়ে সে সভ্যতার ইতিহাস, রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে নিজেকে মুক্ত ভাবতে পারে। অথচ বাস্তবে বন-জঙ্গলও মানুষের ইতিহাস, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে রাজনৈতিক অর্থনীতির জায়গা থেকে। লেখক আলিসা বাত্তিস্তোনির ‘ফ্রি গিফটস’ বইয়ের আলোচনা করে দেখান, পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে প্রায়ই একটি ‘বিনামূল্যের উপহার’ হিসেবে বিবেচনা করে। একটি গাছ ফল উৎপাদনে বছরের পর বছর যে শ্রম ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, বাজারে তার মূল্য নির্ধারণের সময় সেই প্রকৃতির অবদানকে আলাদা করে হিসাব করা হয় না। একইভাবে মাটি, পানি, পরিষ্কার বাতাস কিংবা জলবায়ুর স্থিতিশীলতাও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাছে অনেক সময় বিনামূল্যের সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এখানেই লেখাটির গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হবে না। কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে নিজের খাবার উৎপাদন করলেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি বা পরিবেশগত সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। প্রকৃতির মূল্য কীভাবে সমাজ ও অর্থনীতিতে নির্ধারিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তুলতে হবে।
তবে লেখক শিল্প ও সাহিত্যকে সম্পূর্ণ সমাধান হিসেবেও দেখেন না। বরং তাঁর নিজের জীবন দেখিয়েছে, প্রকৃতি থেকে দূরে সরে তিনি আবার সাহিত্যের দিকে ফিরেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি; বরং তা বদলে গেছে। এখন তিনি আটলান্টায় নিজের বাড়ির কাছের একটি ছোট জলধারা, বনাঞ্চল ও শহুরে কৃষিখামারে সন্তান ও কুকুর নিয়ে যান। সেই ছোট নদীটি দূষিত, ইতিহাসে নানা মানবিক সংঘাতের সাক্ষী; তবু সেটি বয়ে চলেছে এবং নানা প্রাণের আবাস তৈরি করছে।
এই জায়গাতেই প্রবন্ধটি সবচেয়ে মানবিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচা সম্ভব নয়, আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন সরল ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। মানুষ প্রকৃতির অংশ, কিন্তু সে একই সঙ্গে ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও অংশ।
প্রকৃতিকে তাই মানুষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখা নয়; বরং মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভেতরেই প্রকৃতির অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। একটি ছোট নদী, একটি গাছ, একটি খামার কিংবা একটি বন—এসব কেবল ‘প্রকৃতি’ নয়; এগুলোর সঙ্গে মানুষের ইতিহাস, শ্রম, স্মৃতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
সিনকিনের ব্যক্তিগত যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই—প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মূল্যবান, কিন্তু মুক্তির জন্য শুধু স্থান পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। মানুষকে নিজের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক—তিনটিকেই নতুন করে ভাবতে হবে। আর সেই নতুন ভাবনার পথে বিজ্ঞান, কৃষি, পরিবেশচেতনা ও শিল্প-সাহিত্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন দরজা।
সূত্র: দ্য ন্যাশন
এআরই