স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার কমিশন প্রদত্ত প্রস্তাবিত আইনগুলো হলো—বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইন; বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন আইন; বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান আইন; জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামো আইন; নিরাপদ খাদ্য, ওষুধ, মেডিকেল সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট কৌশল আইন; ওষুধের মূল্য ও প্রাপ্তি নিশ্চয়তার আইন; স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী ও প্রদানকারীর নিরাপত্তা আইন; সহযোগী (অ্যালায়েড) স্বাস্থ্য পেশাজীবী কাউন্সিল আইন; হাসপাতাল ও পরীক্ষাগার অ্যাক্রেডিটেশন আইন; শিশু বিকাশ কেন্দ্র আইন; স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষা আইন; স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন আইন; বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল আইন (সংস্কার); বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন (সংস্কার); মেডিকেল শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন (সংস্কার); নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন (সংস্কার); বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিল আইন (সংস্কার); তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন (সংস্কার); এবং পৌর ও সিটি করপোরেশন আইন (সংস্কার)।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশনের শাখাগুলি হলো—চিকিৎসা শিক্ষা; জনস্বাস্থ্য; ক্লিনিক্যাল সেবা; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সেলেন্স; স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন; বিএমডিসি, বিএমআরসি, ফার্মাসি কাউন্সিল, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল, বিএমইএসি; রোগনির্ণায়ক পরীক্ষাগার; নিরাপদ খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কৌশল; পরীক্ষাগার, ফার্মেসি, অ্যাম্বুলেন্স ও রক্ত পরিসঞ্চালন নেটওয়ার্ক; ব্যক্তি খাত ও বেসরকারি হাসপাতাল; উন্নততর বিশেষায়িত হাসপাতাল; সহযোগী (অ্যালায়েড) স্বাস্থ্যসেবা; বিকল্প সেবা; আন্তঃখাত সমন্বয়; স্বাস্থ্য প্রযুক্তি মূল্যায়ন; নিরীক্ষা ও দুর্নীতি বিরোধ; এবং আইন বিভাগ। এসব বিষয় সম্পর্কে নীতি প্রণয়ন, সমন্বয় ও তদারকি করার দায়িত্ব থাকবে এই কমিশনের। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের বিশ্বাস, এই কমিশন যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে জনগণ তাদের প্রয়োজনের নিরিখে সঠিক মান ও পরিমাণের রোগ প্রতিরোধ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, রোগের প্রতিকার ও পুনর্বাসনসংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। কিন্তু স্বাস্থ্য কমিশনকে কার্যকর করতে গেলে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যান্য কমিশনের মতো স্বাধীন থাকতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির সরকারপ্রধানের কাছে জবাবদিহিতা থাকবে। এর আর্থিক, জনবলসংক্রান্ত ও অবকাঠামোগত স্বাধীনতা থাকবে, যা প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি হতে পারে। এসব নিশ্চিত করা যাবে যদি প্রতিষ্ঠানটি আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একটি অধ্যাদেশ দ্বারা সৃষ্টি করা যায়। আরেকটি সহজ প্রক্রিয়া হতে পারে, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনকে আরেকটি নির্বাহী আদেশে বর্তমান নিয়মেই আপাতত দুই বছরের জন্য স্বাস্থ্য কমিশনে রূপান্তরিত করা। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য কমিশনে সদস্য হিসেবে থাকবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশের বিখ্যাত ও সম্মানিত বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়গুলো হলো—চিকিৎসাসেবা, রোগতত্ত্ব, আইন, চিকিৎসা শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, নার্সিং, ফার্মাসি, বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও পুষ্টি, রক্ত পরিসঞ্চালন, প্যাথলজি, রেডিওলোজি ও ইমেজিং, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রভৃতি।
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠন সময়ের দাবি। কারণ চিকিৎসা সেবাপ্রদানকারীদের জনস্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সীমিত। কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের দুর্বলতা সেটা সমধিকভাবে প্রমাণ করে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন তাই মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবিত এই অধিদপ্তরের অধীন যে কার্যক্রম বা দপ্তরগুলো থাকবে, সেগুলো হলো—নগর স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ (পরিবার পরিকল্পনা), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট। তবে এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইনটি একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আগে রহিত করতে হবে। এই ট্রাস্ট প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থাপনাকে দ্বিখণ্ডিত ও সমন্বয়হীন করে ফেলেছে । অন্যথায় আপাতত এই ট্রাস্ট বাদ দিয়ে হলেও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সৃষ্টি করা অতি প্রয়োজনীয় । নগর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য অধিদপ্তরে দুটি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বর্তমান জ্যেষ্ঠতম স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এই দুই পদে পদায়ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই অধিদপ্তরের জন্য নতুন যে চারটি পরিদপ্তর সৃষ্টি করতে হবে, সেগুলো হলো—পরিকল্পনা, পর্যানুসরণ ও মূল্যায়ন; জনবল, প্রশাসন, সমন্বয় ও জবাবদিহিতা; বাজেট ও অর্থ ব্যবস্থাপনা; জনস্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা। উল্লেখ্য, নতুন পদ সৃষ্ট হলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং নগর স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমানে কর্মরতদের প্রশিক্ষণপূর্বক এসব পদে নিয়োগ করা যাবে এবং নতুন নিয়োগের প্রয়োজন হবে না। একটি টাস্কফোর্স গঠন করে তার মাধ্যমে উল্লেখিত দপ্তর ও অধিদপ্তরে বর্তমানে কর্মরতদের কোন পদে কোথায় পদায়ন করা যায়, সেটার প্রস্তাবনা তৈরি করবেন। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করতে হবে, যেন হাসপাতাল ও রোগনির্ণায়ক সেবা এবং চিকিৎসা ও সহযোগী শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সব অধিদপ্তর স্বাধীনভাবে তাদের প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে। যেহেতু নতুন নিয়োগের প্রয়োজন হবে না, তাই এই পুনর্গঠনে কোনো আর্থিক সংশ্লেষেরও প্রয়োজন হবে না। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠনের জন্য তাই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে একটি প্রশাসনিক নির্দেশ (এক্সিকিউটিভ অর্ডার) বা আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার দিয়েও তা প্রতিষ্ঠিত করা যায়। উল্লেখ্য, সরকার এর আগে মহাখালীতে কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের জন্য দুই একর জায়গা বরাদ্দ করেছিল। এই প্লটে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্মাণ করা যাবে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, সর্বজনীনভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও দরিদ্রদের জন্য সরকারি হাসপাতাল (১০ শতাংশ) ও ব্যক্তি খাতের হাসপাতালে (১০ শতাংশ) সব সেবা বিনা মূল্যে প্রদান। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য সংস্কার কমিশন কয়েকটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। একটি হলো, ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা, যাতে সেবাগ্রহণকারীদের মধ্যে এই আস্থা জন্মায় যে, এসব প্রতিষ্ঠানে গেলে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মিটবে। শহর এলাকায় বর্তমানে অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসেবার জন্য যে অবকাঠামো আছে, সেগুলোয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায় কি না, প্রথমে সেটা পরীক্ষা করতে হবে; তারপর প্রয়োজন হলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য। আরেকটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হবে স্বাস্থ্যসেবার জন্য আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এটা হতে হবে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ১৫ শতাংশ। এছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনা মূল্যে দেওয়ার জন্য সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ করেছে তা হলো—আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা চালু করা, পাপ কর (Sin Tax) আরোপ করা, দান গ্রহণ, সামর্থ্যবান রোগীদের থেকে হাসপাতাল সেবার জন্য নির্দিষ্ট মূল্য নেওয়া এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা ফান্ড গ্রহণ করা। সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা হলো যারা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনে কাজ করেন তাদের স্বাস্থ্যসেবার মূল্য পরিশোধের একটি পদ্ধতি, যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর অটোভন বিসমার্ক চালু করেন। এই বিমার প্রিমিয়াম সেবাগ্রহণকারী এবং তাদের চাকরিদাতা অর্ধেক অর্ধেক করে প্রদান করেন। বিমার প্রিমিয়াম হিসেবে জার্মানিতে চাকুরেরা প্রদান করেন তাদের আয়ের ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর বিপরীতে তাদের জন্য সব সেবা দেওয়া হয় বিনা মূল্যে। তবে এই বিমা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার জন্য থাকতে হবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যা চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে এবং সেবাপ্রদানকারীকে সেবার মূল্য প্রদান করবে, কিন্তু দাবি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কোনো অভিযোগ থাকলে সেটার সুরাহা করার পর। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে এসব বিষয়ের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। বিশেষত সব আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও তাদের চাকুরেরা যাতে এই বিমা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য অধ্যাদেশে থাকতে হবে স্পষ্ট বিধান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে। এই অর্থের সাহায্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো; প্রয়োজনীয় জনবল; যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও অন্যান্য উপকরণ; প্রশিক্ষণ; ওষুধ; রোগনির্ণায়ক পরীক্ষাগার; গণঅবহিতিকরণ; ব্যবস্থাপনা; গণসম্পৃক্তকরণ; তত্ত্বাবধায়ন, পর্যানুসরণ, মূল্যায়ন, ও তথ্যের ব্যবস্থাপনা প্রভৃতির প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট এবং সদস্য, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন