দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক কাশ্মীরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক আকাশযুদ্ধ হয়েছে। এই সংঘাতের স্বরূপ বাংলাদেশের সামরিক দুর্বলতাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। প্রায় এক যুগ ধরে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা অবহেলার মুখে রয়েছে। বিমানবাহিনী বর্তমান সময়ে প্রধান প্রতিরক্ষা রক্ষাকবচ। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা হয়। বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের দেশ হলেও ১৮ কোটি জনসংখ্যার আবাস, যা রাশিয়ার চেয়েও বেশি এবং বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার। ইতিহাস বলে, সাধারণত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেই যুদ্ধের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের দুর্বল সামরিক সক্ষমতা রোহিঙ্গা সমস্যাকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বর্তমানে মোটামুটি সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ভারত ও পাকিস্তান ব্যাপক সংঘর্ষে জড়ালেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ভারত সুবিধা পেলেও পাকিস্তানের সক্ষমতা রয়েছে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করার। ইতিহাসে এই ভূখণ্ডের মানুষ দুর্বল সামরিক সক্ষমতার কারণে বারবার বহিঃশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ভারতের মারাঠা বর্গিরা বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ইউক্রেন ও ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে, দুর্বল সামরিক সক্ষমতা কীভাবে একটি জাতির স্বাধীনতা, জীবন, অর্থনীতি ও সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা মূলত একটি ডিফেন্সিভ কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের প্রায় দুই লাখ সেনাসমৃদ্ধ সুসংগঠিত সেনাবাহিনী রয়েছে। এ ছাড়া রিজার্ভ ফোর্স, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ কয়েক লাখ প্যারা-মিলিটারি বাহিনী রয়েছে, যাদের যুদ্ধ চলাকালে মোতায়েন করা সম্ভব। দেশের প্রতিরক্ষায় সর্বদা প্রস্তুত কয়েক লাখ বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনতাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মোতায়েন করা যেতে পারে, যা স্থলপথে আমাদের ভূখণ্ড দখল করা প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। যদিও আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক দুর্বলতা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে সংযোগকারী ফেনী করিডর ও রংপুর করিডর।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি আমাদের একটি বিশাল সমুদ্র অঞ্চল, এর সম্পদ ও ব্লু ইকোনমি, সেইসঙ্গে বাণিজ্যস্বার্থ রক্ষার জন্য শক্তিশালী নৌবাহিনীর পাশাপাশি সক্ষম বিমানবাহিনী থাকাও অপরিহার্য, যা প্রধান ডিফেন্সিভ স্তম্ভ হতে পারে। সিঙ্গাপুর, কাতার, ইসরায়েলের মতো ছোট ভূখণ্ডের দেশগুলোও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে এবং আকাশযুদ্ধের সক্ষমতাই তাদের প্রতিরক্ষায় মুখ্য ভূমিকা রাখে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আকাশযুদ্ধের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং এর পাশাপাশি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—ড্রোন, গ্রাউন্ড-বেইজড রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কনট্রোল সিস্টেম, বিমান ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। সম্প্রতি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আকাশযুদ্ধ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রায় ১২৫টি যুদ্ধবিমান ঘণ্টাব্যাপী আকাশে সক্রিয় ছিল।
আধুনিক আকাশযুদ্ধ মূলত বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ বা বিভিআর এবং স্ট্যান্ড-অফ ওয়েপেন প্রযুক্তিনির্ভর। এই ব্যবস্থায় যুদ্ধবিমান অনেক দূর থেকে, এমনকি আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম না করেও ক্ষেপণাস্ত্র বা গাইডেড বোমের মাধ্যমে শত্রুবিমান বা স্থাপনাকে লক্ষ করে আঘাত হানতে পারে। আদর্শ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান সাধারণত হাই অলটিটিউডস (high altitudes) থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং মিসাইলের নিজস্ব গাইডেন্স সিস্টেমের পাশাপাশি বিমানের নিজস্ব রাডার দিয়ে সেগুলোকে গাইড করে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরই শত্রুপক্ষের রাডারে যুদ্ধবিমানের অবস্থান অনুযায়ী পাল্টা মিসাইল হামলা করে । ক্ষেপণাস্ত্রের গতি সাধারণত মার্ক ৪ থেকে ৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা যুদ্ধবিমানের গতি মার্ক ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ২ থেকে বেশি। ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব প্রোপেলান্ট একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য বার্ন হয়, এরপর এটি কেবল তার অর্জিত গতিশক্তির ওপর নির্ভর করে। ফলে উভয়পক্ষের আক্রান্ত যুদ্ধবিমানের লক্ষ্য থাকে মিসাইলকে নিচু altitudes-এ পাহাড়, ভূখণ্ড বা জলভাগের কাছাকাছি অধিক সময় ও দূরত্বে টেনে আনা, যাতে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিশক্তি হ্রাস পায় এবং এর রাডার বা ইনফ্রারেড সিকার সঠিকভাবে ট্র্যাক না করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত উভয়পক্ষের চেষ্টা থাকে যুদ্ধবিমানের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে ভূপাতিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে। বিভিআর ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সাধারণত ১২০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রেরই একটি MAR (Minimum Abort Range) অথবা No-Escape Zone (NEZ) থাকে। এই সীমার মধ্যে প্রবেশ করলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুদ্ধবিমানের ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। এক্ষেত্রে রাফালের মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের নো-এস্কেইপ জোন বিশ্বে অন্যতম বৃহত্তম, যা প্রায় ৭০ কিলোমিটার।
ভারত-পাকিস্তান আকাশযুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতীয় বিমানবাহিনী আন্তর্জাতিক সীমানা এবং এলওসি (Line of Control) লঙ্ঘন না করে পাকিস্তানের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে স্ট্যান্ড-অফ ওয়েপেন ব্যবহার করে হামলা চালায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারত প্রায় চারটি স্কোয়াড্রন অর্থাৎ ৭২টি যুদ্ধবিমান নিয়ে ফর্মেশন তৈরি করে, যেখানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিমান ছিল, যেমন—রাফাল, সুখোই সু থার্টি এমকেআই, মিগ-২৯ এবং মিরাজ ২০০০। ধারণা করা যায়, এর মধ্যে কিছু বিমান সম্ভবত এক স্কোয়াড্রন Hammer গাইডেড বোম, ভারতনির্মিত ব্রাহ্মমস এয়ার টু সারফেস ক্রুজ মিসাইল ও লং রেঞ্জ Scalp এয়ার-টু-গ্রাউন্ড ক্রুজ মিসাইল বহন করছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান সম্ভবত তিনটি স্কোয়াড্রন অর্থাৎ ৫৪টি যুদ্ধবিমান জে-১০সি, জেএফ-১৭ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান নিয়ে একটি প্রতিরক্ষামূলক সমান্তরাল লাইন তৈরি করে এবং ডিফেন্সিভ ফোর্স হিসেবে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল চীনের নির্মিত লং-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার পিএল ১৫ বিভিআর মিসাইল।
বর্তমান আকাশযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় সমসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন না করলে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যায় ভারত এগিয়ে থাকত এবং এর ফলে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান সহজে ঘায়েল হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। সমান সংখ্যার মাধ্যমে ভারতের অ্যাটাকিং ফোর্সের জন্য আকাশপথে হুমকি তৈরি করেছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনী। ভারত ও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম না করার কারণে উভয়ই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বলয়ের মধ্যে ছিল, আকাশে যুদ্ধবিমানের একটি সমান্তরাল লাইন তৈরি হয়েছিল এবং উভয় পক্ষ একে অপরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। পাশাপাশি উভয় পক্ষই এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কনট্রোল সিস্টেম বিমান, অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড-বেইজড রাডার, ড্রোন ও স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছিল। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ডেটা লিঙ্ক দিয়ে এদের সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ট্র্যাকিং অত্যন্ত নিখুঁত ছিল, যার ফলস্বরূপ, ভারতের রাফাল, সু৩০ এমকেআই-সহ কয়েকটি ফাইটার জেট ভূপাতিত হয়। তবে অ্যাটাকিং ফোর্স হিসেবে কিছু যুদ্ধবিমান হারালেও ভারত তাদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যগুলোয় নির্ভুল হামলার মাধ্যমে তাদের অবজেকটিভ সফল করে। এক্ষেত্রে ভারত ব্যবহার করে লং রেঞ্জ এয়ার-টু-গ্রাউন্ড ক্রুজ মিসাইল, যা ভূমির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায় বলে রাডার দিয়ে শনাক্ত করা কঠিন। এ ছাড়া ব্রাহ্মমস ক্ষেপণাস্ত্র মূল ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা ব্যবহার করে সফলভাবে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের রাডার জ্যাম করেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ প্রতিহত করতে উভয় পক্ষই ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেজার, যেমন জ্যামার, রাডার ডিকয়, স্পুফিং ও চ্যাফ বার্স্ট ব্যবহার করেছে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমানের সেন্সরগুলোকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল টাইম মুভমেন্ট প্রেডিক্ট করেছে, পাশাপাশি ব্যাপকসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করেছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান তাদের ড্রোনগুলোকে রাডার জ্যামিং এবং রাডারকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি আকাশে স্যাচুরেশন তৈরি করতে কাজে লাগিয়েছিল। অন্যদিকে ভারত ইসরাইল-নির্মিত SkyStriker লয়টারিং মিউনেশন ও হেরন লজিস্টিক ড্রোন ব্যবহার করে গ্রাউন্ড স্ট্রাইক পরিচালনা করে। ভারত রাশিয়ার এস-৪০০ ও নিজস্ব আকাশ সিস্টেম এবং পাকিস্তান চীনের তৈরি এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধ করলেও কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে, কারণ উভয় দেশই একে অপরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাপকসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে এবং আত্মঘাতী ড্রোনের পাশাপাশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। আকার ও সক্ষমতার বিচারে একটি ড্রোনের মূল্য সাধারণত ০.৫ মিলিয়ন ডলার থেকে তিন মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই কারণে অনেক ক্ষেত্রে একে একটি ‘ডিসপোজেবল’ সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা নির্দিষ্ট মিশন সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে ধারণা করা হয়, ভবিষ্যৎ যুদ্ধে লেজার অস্ত্রের মাধ্যমে ড্রোনগুলোকে সহজেই ভূপাতিত করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি ভারতও সফলভাবে এ ধরনের একটি এমকে-২এ লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা ও গুণগত মানের ঘাটতি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে মাত্র ২ পয়েন্ট ৫ স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান রয়েছে, যার মধ্যে আটটি মিগ-২৯ এবং ৩৭টি ৩ পয়েন্ট ৫ প্রজন্মের এফ-৭বিজি অন্তর্ভুক্ত। এই বিমানগুলোর মধ্যে কেবল মিগ-২৯ বিভিআর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা রাখে, কারণ এর জন্য অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থার প্রয়োজন। ভারতের বর্তমান বিমানবাহিনীর তুলনায় বাংলাদেশের এফ-৭ বিমানগুলো কার্যত কোনো হুমকিই নয়।
বাংলাদেশের পাইলটদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত হলেও আধুনিক যুদ্ধবিমানের অভাবে যেকোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতান্তই অপর্যাপ্ত। ভারতের বর্তমান বিমানবাহিনীতে ৩১টি স্কোয়াড্রন অর্থাৎ ৬১৮টি যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে ৪২টি স্কোয়াড্রনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোয় প্রায় ১০ থেকে ১৫টি স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকবে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে রাফাল ও এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। আধুনিক আকাশযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ছয় থেকে আটটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন অত্যাবশ্যক, যা আগামী ১০ বছরে সরকারের সদিচ্ছায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সামরিক বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা ও অপারেশনাল চাহিদা বিবেচনায় চীনের জে-১০সি সম্ভবত সবচেয়ে আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দুই স্কোয়াড্রন, অর্থাৎ ৩২টি যুদ্ধবিমান ক্রয় করা যেতে পারে। যুদ্ধবিমান, অস্ত্র প্যাকেজ, প্রশিক্ষণ প্যাকেজসহ এর আনুমানিক ব্যয় সর্বমোট ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতার বিচারে খুব বড় বিষয় নয়। জে-১০সি’র ১১টি হার্ডপয়েন্ট বিভিন্ন ধরনের মিশনের জন্য পিএল১২, পিএল১০, পিএল১৫-সহ বিভিন্ন পাল্লার এয়ার টু এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে, সেইসঙ্গে আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, এলএস৬ গাইডেড বোমা, স্যাটেলাইট গাইডেড বোমা ও নাভাল টার্গেটের জন্য বিখ্যাত অ্যান্টিশিপ মিসাইল ওয়াইজে৮৩-কে বহন করতে পারে। পাশাপাশি চীন সীমান্ত খুব কাছাকাছি হওয়ায় চীন বর্ডার থেকে এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কনট্রোল সিস্টেম সুবিধা দিতে পারবে। ভবিষ্যতে, অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে ডুয়াল ইঞ্জিন যুদ্ধবিমান ও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ক্রয় করাও অপরিহার্য। পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের প্রধান সুবিধা হলো শত্রুপক্ষের রাডারে দেরিতে ধরা পড়ার সক্ষমতা। ফলে দূরত্ব কমিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং শত্রুপক্ষের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়সীমা হ্রাস পায়।
একটি দেশের সামরিক বাহিনী তার আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক। আমাদের সামরিক বাহিনীর সাহস, মনোবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র অপরিহার্য। এই ব্যয় অনেকটা ইন্স্যুরেন্স ক্রয়ের মতো, যা আমাদের অর্থনীতিকে যেকোনো আকাশ ও সমুদ্রপথে সংঘটিত সম্ভাব্য সংঘাত থেকে রক্ষা করবে। কারণ সংঘাতকালীন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধনের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে, যা সম্ভাব্য আক্রমণের ইচ্ছা প্রতিহত করবে। যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পাশাপাশি ব্যাপকসংখ্যক অ্যাটাক ও সার্ভেইল্যান্স ড্রোন, উন্নত শট , আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি এবং এই সরঞ্জামগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধনের জন্য একটি সুসংহত নেটওয়ার্ক ও ডাটা লিঙ্ক স্থাপন করাও জরুরি।
পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিটিউট অব এনার্জি কনভার্সন, চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস