২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর গাজা যুদ্ধের একেবারে শুরুতে ইসরাইলের কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজেলাল ঘোষণা করেন বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। বেজেলাল বলেন, শুধু ফিলিস্তিন নয়, বরং সিরিয়ার দামেস্ক হবে ভবিষ্যৎ জেরুজালেমের অংশ। বেজেলালের এই অশুভ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আবার সামনে আসে ইহুদিদের জন্য বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিষয়টি।
আজকের সিরিয়া, মিসরের নীল নদ অববাহিকা, লেবানন, জর্ডান, ইরাক এবং সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চল বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র পরিকল্পনার অংশ। তারা যেমন ১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের জায়গা-জমি জোর করে দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রসারণ করেছে, ঠিক একইভাবে প্রতিবেশী এসব দেশের ভূখণ্ড তারা নিজেদের দাবি করে জোরপূর্বক দখলে নেওয়ার চেষ্টা করবে এবং একপর্যায়ে সেটাকে ইসরাইল রাষ্ট্রের অংশ ঘোষণা করবে।
ইতোমধ্যে তারা সিরিয়ার গোলান মালভূমি, মাউন্ট হারমন দখলে নিয়েছে আসাদ পতনের পর। মাউন্ট হারমন থেকে দামেস্কের দূরত্ব মাত্র ৩০ মাইল। মাউন্ট হারমনে বর্তমানে অবস্থান করছে ইসরাইলি সেনা। গাজা এখন তাদের দখলে এবং পশ্চিমতীরকেও ইসরাইলের ভূখণ্ড ঘোষণা করার অপেক্ষায় রয়েছে তারা।
এর আগে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকতে পশ্চিমতীরকে ইসরাইল রাষ্ট্রের অংশ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু এর পক্ষে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারেনি তখন। এবার নেতানিয়াহু সরকার অপেক্ষায় আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের। তা ছাড়া হামাস ও হিজবুল্লাহর বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতি, সিরিয়ায় আসাদের পতন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইরানের বিদায়ের ফলে পাল্টে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দৃশ্যপট। ইসরাইল দামেস্ক দখল করলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দাবার কোর্ট পাল্টে যাবে তাই নয়, বরং পাল্টে যেতে পারে বিশ্বব্যবস্থা।
আসাদ পতনের পর এক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ায় হামলা চালায় ইসরাইল। ধ্বংস করে সিরিয়ান আর্মির সব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অস্ত্রগুদাম, অস্ত্র নির্মাণ কারখানাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। এভাবে সিরিয়ান আর্মির ৮০ ভাগ শক্তি ধ্বংসের দাবি করে ইসরাইল। সামরিকভাবে সিরিয়া বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে বহিঃশত্রু প্রতিরোধহীন একটি রাষ্ট্র। আসাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও সিরিয়া ইসরাইলের জন্য কোনো হুমকি ছিল না।
কারণ আসাদ সিরিয়ার জনগণকে অত্যাচারের মাধ্যমে দমন করতে পারলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ছিল না তার কোনো প্রতিরোধ শক্তি। ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে আসছে সিরিয়ায়। এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি আসাদ সরকার। সিরিয়া ছিল নামে মাত্র একটি রাষ্ট্র।
আসাদের পতনের পর ইসরাইল দখলে নিয়েছে সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা। কিন্তু নতুন সরকার এর বিরুদ্ধে তেমন সরব হতে পারছে না। বস্তুত ইসরাইল যদি শুরুতে সিরিয়ার আরও বেশি ভূখণ্ড দখল করে নিত, তবু কারোর কিছু করার ছিল না। কিন্তু ইসরাইলের মধ্যে এক ধরনের ভীতি আর দ্বিধা কাজ করেছে এ বিষয়ে।
সে জন্য তারা নতুন অঞ্চল দখলের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সিরিয়ার প্রতিরোধব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে। সিরিয়ার নতুন সরকার বলেছে, আমরা ইসরাইল নিয়ে ভীত নই। ইসরাইল আমাদের সমস্যা নয়। আমরা এখানে এমন কিছু হতে দিতে চাই না, যা ইসরাইল বা অন্য কোনো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। আমরা শান্তি চাই।
আসাদকে উৎখাতকারী প্রধান বিদ্রোহী গ্রুপ হায়াত তাহরির আল শামের প্রধান আহমেদ আল শারা এবং দামেস্কের গভর্নর মাহের মারওয়ান একই কথা বলেছেন গণমাধ্যমের কাছে। আহমেদ আল শারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করে বলেছেন, সিরিয়ায় বসে কেউ ইসরাইলে হামলা চালাতে পারবে না। একই সঙ্গে ইসরাইলকেও সিরিয়ায় হামলা বন্ধ করতে হবে । দখলীকৃত এলাকা ছেড়ে দিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে তাদের।
দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা করার কোনো শক্তি নেই বর্তমানে ইসরাইলের নতুন সরকারের। ইসরাইলের দখলে থাকা ভূমি উদ্ধারেরও ক্ষমতা নেই তাদের। শক্তিশালী কূটনীতি আর কৌশলই এখন তাদের প্রধান অবলম্বন। এ ক্ষেত্রে সিরিয়ার মূল শাসক আহমেদ আল শারা ওরফে জুলানি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসার। আসাদবিরোধী সব সশস্ত্র গ্রুপকে এক পতাকাতলে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সব সশস্ত্র গ্রুপকে নিরস্ত্র করে তাদের সবাইকে সিরিয়ান আর্মিতে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। বিশেষ করে কুর্দি বিদ্রোহীদের সিরিয়ান আর্মির অধীনে আনতে পারা সবচেয়ে সফল একটি দিক।
সিরিয়ান অভ্যন্তরীণ সব বিষয় মীমাংসার জন্য তারা জাতীয় সংলাপেরও পরিকল্পনা করেছেন। অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ মীমাংসা করে সিরিয়াকে একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আনতে পারলে সেটি হবে আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে তাদের শক্তির সবচেয়ে বড় দিক।
অতিশয় দুর্বল সিরিয়ার বর্তমানে শক্তির আরেকটি ভিত্তি হলো তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতা। তুরস্ক এবং আরব দেশগুলো বর্তমানে আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী কার্ড।
তুরস্ক যেভাবে সিরিয়ার নতুন সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, তা সিরিয়ার জন্য ইসরাইলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কাউন্টার ব্যালেন্সি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি বিষয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরাইল। ইসরাইল অভিযোগ করেছে, সিরিয়ায় ইরান এবং রাশিয়ার স্থান দখল করছে তুরস্ক। নতুন সিরিয়ার প্রতি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারের আগ্রহ বিষয়েও সন্দিহান ইসরাইল। এসব দেশ সিরিয়ায় বড় ধরনের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এলে দ্রুত পাল্টে যেতে পারে সিরিয়ার অবকাঠামোসহ সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা
তুরস্কসহ আরব দেশগুলোর পাশাপাশি পশ্চিমা কয়েকটি দেশকেও ইতোমধ্যে পাশে পেয়েছে সিরিয়া। ইতোমধ্যে সিরিয়া সফর করেছেন জার্মানি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন আহমেদ আল শারা। পশ্চিমা অনেক দেশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে সিরিয়ার নতুন সরকারের প্রতি।
এসবই বর্তমানে আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে দুর্বল সিরিয়ার শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সিরিয়ার সরকার এবং প্রধান বিদ্রোহী গ্রুপ হায়াত তাহরির আল শামের প্রধান আহমেদ আল শারা ভালো করে জানেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে বর্তমানে গরম বা উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে তাদের ক্ষেপিয়ে তুলে কোনো লাভ নেই। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের অপেক্ষায় আছেন ইসরাইল ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা তো দূরের কথা, ইসরাইলের দখলে থাকা সিরিয়ার কোনো ভূমি উদ্ধারেরও ক্ষমতা নেই সিরিয়ার নতুন সরকারের। এ অবস্থায় ইসরাইলের প্রতি সহনশীলতার যে বার্তা আহমেদ আল শারা দিয়েছেন, তা প্রশংসিত হয়েছে সব মহলে। আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুর্বল সিরিয়ার অন্যতম শক্তি হলো বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতি। ইসরাইলকে সিরিয়ায় আগ্রাসনের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। আহমেদ আল শারা এবং সিরিয়ার নতুন সরকার ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, এটি তারা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে, যা শুভকর আগামী সিরিয়ার জন্য।
লেখক : মধ্যপ্রাচ্যবিয়ষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর : মেহেদী হাসান