জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। একটি কার্যকর বাজেট প্রণয়নে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন সমিতি, এফবিসিসিআই, বাণিজ্যিক বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তিরা বাজেট নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বাজেট প্রণয়নে নানা পরামর্শ রাখছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে যেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন, তার কিছু এখানে তুলে ধরছি।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বারোপ : ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার গত ১৬ বছরের শাসনামলে ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। লুটপাট আর বিদেশে অর্থ পাচার ছিল আর্থিক খাত ধ্বংসের অন্যতম কারণ। তাই আসন্ন বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। দেশের সব ব্যাংক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নীতি সহযোগিতার মাধ্যমে সবল করে তোলার জন্য। দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ পাচারসহ যাবতীয় নেতিবাচক কাজকর্ম থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্প গ্রহণ : দেশে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। প্রতিবছর শিক্ষিত বেকার আসছে চাকরির সন্ধানে। ২০ লাখের অধিক জনশক্তি চাকরির বাজারে প্রতিবছর প্রবেশ করছে। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এমন প্রকল্প সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে চীন, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বন্ধু দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের জন্য নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি। আগামী বাজেটে এটিকে লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে অগ্রসর হতে হবে।
দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা : দেশের দারিদ্র্যের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। করোনার কারণে বেড়েছে দারিদ্র্যের হার। পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সঙ্গে ছিল পতিত হাসিনা সরকারের লুটপাট। শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে বেড়েছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। বেড়েছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা। সে কারণে দেশের গরিব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য বাজেটে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : দেশের মূল্যস্ফীতি এখন বড় সমস্যা। স্বল্প আয়ের মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের ব্যয় হ্রাস করতে হবে। পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পিতভাবে আমদানি করা পণ্যের এলসি খুলে পণ্যের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পদক্ষেপ থেকে দূরে থাকতে হবে।
সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা : বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের কারণে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প খাতে যেন কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেটি আসন্ন বাজেটে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
করনীতি : আসন্ন বাজেটে করনীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ব্যক্তিকর বাড়িয়ে কমপক্ষে পাঁচ লাখ কর মুক্ত করা উচিত। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে এর সীমানা বাড়ানোর যুক্তি রয়েছে। করদাতা যেন ঝামেলামুক্তভাবে কর দিতে পারে, সে বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন। সামঞ্জস্যপূর্ণ করনীতি করতে হবে, যা হবে বাস্তবায়নযোগ্য। ভ্যাটের হার পরিবর্তন করে সাত শতাংশে নামিয়ে আনা দরকার। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ ১০ শতাংশের প্রস্তাব রেখেছেন। ব্যক্তি কর ২৫ শতাংশ করা উচিত, যা বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ রয়েছে।
এনডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে : সরকার ইতোমধ্যে দেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর করার জন্য ২০২৬ সালকে ঠিক রেখেছে। এই অবস্থার ফলে রপ্তানিকারকরা নগদ সহায়তাসহ অন্যান্য সুবিধা পাবেন না। দেশীয় শিল্প রক্ষার স্বার্থে বিকল্প হিসেবে শিল্প খাতে সব পণ্যের ওপর ভ্যাট হ্রাস করে মাত্র পাঁচ শতাংশ করানো যেতে পারে। তাতে ব্যবসায়ীরা নগদ সহায়তার বিকল্প সুবিধা পাবেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত : দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নের ওপর পুরো দেশের উন্নতি নির্ভর করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ম্যাগাসিটি পেমেন্ট বিষয়টি বাতিল করা উচিত। পেট্রোবাংলার মাধ্যমে দেশে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির স্বার্থে কূপ খননে মনোযোগী হতে হবে। গ্যাস উন্নয়নের তহবিলকে বৃদ্ধি করতে হবে। কূপ খননে এই তহবিল পেট্রোবাংলার ব্যবহার করা উচিত, বিদেশি ঋণের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এই দুই খাতের ব্যয় বৃদ্ধি হলে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথ সহজ হবে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের আমদানি করা বইয়ের ওপর শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত। মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করা উচিত। শিক্ষা উপবৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ কর উচিত। ’২৪-এর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
ডিজিটাইজেশন করা : দেশের বিভিন্ন খাত আইটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে। এ খাতে বিনিয়োগ করলে এর ওপর কর কয়েকগুণ বেশি পাওয়া যাবে।
দুর্বল শিল্পকে সহায়তা : বিগত স্বৈরশাসকের আমলে ইসলামি ব্যাংকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে এস আলমসহ কিছু গ্রুপ ও ব্যক্তি কর্তৃক লুট করে দুর্বল করা হয়েছে। সেই সময় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, যার ফলে অনেক বড় বড় ভালো শিল্প উদ্যোক্তা এখন ঋণখেলাপি; কারখানা বন্ধ, এলসি করতে পারছে না। আসন্ন বাজেটে বিশেষ ব্যবস্থা রেখে এসব ঋণখেলাপি শিল্প খাতকে উদ্ধার করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। তাদের সব ঋণ ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি করে দিয়ে আবার ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংকগুলো তাদের ঋণের অর্থ সহজে ফেরত পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্বল এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আবার নগদ ঋণ সহায়তা দিতে হবে। এলসি খোলার অনুমতি দিতে হবে।
তৈরি পোশাকশিল্প ও স্পিনিং খাত : দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধানতম খাত হচ্ছে তৈরি পোশাকশিল্প খাত। ৭৮ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে এ খাতের মাধ্যমে। তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান সহযোগী খাত হচ্ছে দেশের স্পিনিং খাত। শতভাগ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করে আমাদের স্পিনিং খাত তৈরি পোশাকশিল্পে সুতা সরবরাহ করছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমাদের স্পিনিং খাত টিকতে পারছে না। তাই দেশের সামগ্রিক বস্ত্র খাতের সহযোগিতার জন্য সুতা আমদানিকারকের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ সুতা দেশীয় স্পিনিং থেকে ক্রয় করার বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। তাহলে দেশের স্পিনিং খাত ভারতের দানবীয় আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাবে। সরকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মাধ্যমে এমআরও জারি করে দ্রুত এই ব্যবস্থা নিতে পারে। তুলা আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের ভ্যাট ও কর মওকুফ রাখা প্রয়োজন। তুলার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের নানা চার্জ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার আহ্বান করছি।
গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি : আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসনির্ভর। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার গ্যাসের মূল্য ঘনফুটপ্রতি এক লাফে ১৫ থেকে ৩০ টাকা উন্নীত করে। তাতে অনেক শিল্প দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুধু দেশের শিল্প খাতে উন্নতির স্বার্থে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস আগের মূল্যে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে স্পিনিং খাত ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, তাই গ্যাসের মূল্য হ্রাস করা খুবই জরুরি।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লি., অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম; সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই