যিনি সাধারণের মধ্যে জন্মে বেড়ে ওঠে, সাধারণের মধ্যে থেকে, সমাজের উপকারে আসার জন্য একাত্ম এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকতে পারেনÑতিনিই অসাধারণ এবং অনন্য। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ একজন ব্যক্তিই শুধু নন; নারীর যে অবস্থান ও স্তরবিন্যাসে ‘অনগ্রসর’ সেই সমাজে তাকে অনন্য-অসাধারণ বলতে কোনো দ্বিধা থাকার কারণ নেই।
খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন। তিনবারের নারী প্রধানমন্ত্রী এটা তার জন্য কোনো বিশেষ বিশেষণ বা পরিচয় নয়Ñতিনি ছিলেন তার দলের বা ওইসব পদের চেয়েও বড়। দল বা পদপদবির ঊর্ধ্বে তিনি এমন এক উচ্চতায় এবং শীর্ষে পৌঁছে ছিলেন যে, বিএনপির চেয়েও কারোর মাপকাঠিতে তিনি ছিলেন আরো অনেক উঁচু। তিনি বিএনপির মাপের চেয়েও শীর্ষে উঠে গিয়েছিলেন। বরং খালেদা জিয়া বিএনপি করেনÑএতে খালেদা নন, বিএনপির উচ্চতা বেড়ে গেছে। তিনি ছিলেন তার পদপদবির চেয়েও অনেক অনেক গুণ বড় এবং বিশালতার দিক দিয়ে কোনো মাপজোকের ঊর্ধ্বে। অনন্য এক অবস্থানে।
বিএনপি এখনো আছে। এর একজন চেয়ারপারসন আছেন। এখানে মাতা-পুত্রের সম্পর্কের নিরিখে বা বিশ্লেষণে নয়Ñতারেক রহমানের জন্য এটি একটি সংকটও বটে। দুজনই দলের চেয়ারপারসন। একজন ছিলেন, আরেকজন হলেন। একজন দলের, অর্থাৎ বিএনপির চেয়েও অনেক অনেক গুণ বড় ছিলেন। তিনি বিএনপির বৃত্তে আবদ্ধ ছিলেন না, রাখা সম্ভবও হয়নি। আর একজনের পরিচয়ে শুধুই দলের চেয়ারম্যান। তারেক রহমান বিএনপির পরিচয়ে পরিচিত এবং বৃত্তে বন্দি। আরেকজনের কোনো বৃত্ত ছিল না। বৃত্ত ও মাপজোকের সীমানায় তিনি আবদ্ধ ছিলেন না। তার জন্য বৃত্তকেই ভাঙাচোরা বা বিন্যস্ত করতে হতো। আর তারেক রহমান এখনো মাপের ও বৃত্তের মধ্যেই।
কাজেই বিএনপির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার সিদ্ধান্ত নতুন চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিতে হবে। এই বোঝাপড়াও তার ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) ১৯৪৬ সালে তার এক বইয়ে বলেছিলেন, এ ধরনের নেতৃত্বকে ‘ক্যারিশম্যাটিক নেতা’ বলা হয়। Politics As a Vocation গ্রন্থে ম্যাক্স ওয়েবার বলেন, ‘ক্যারিশম্যাটিক নেতারা চিরন্তন অতীতের, এমনভাবে শুদ্ধীকৃত, যা অবিশ্বাস্যভাবে স্বীকৃত যুগ-যুগান্তরের মাপকাঠিতে। চিরায়তভাবে তারা মানুষের সঙ্গে ওই ঐতিহ্যগতভাবে একাত্মতার মাধ্যমে তার অধীনতার নৈতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ম্যাক্স ওয়েবার এই ক্যারিশমাকে অসাধারণ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির প্রাপ্ত নম্রতা, ভদ্রতা ও লাবণ্যÑঅর্থাৎ এক কথায় ক্যারিশমা হিসেবে দেখেছেন। তিনি এই মাত্রার নেতৃত্বকে রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বক্তা, দূরদর্শী নেতা এবং রাজনীতির পথপ্রদর্শক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। এই মাত্রার নেতৃত্ব সর্বসাধারণের জনসম্পৃক্ততার কাছে দায়বদ্ধতার বন্ধনে আবদ্ধ, আবার তিনি রাষ্ট্রের শাসক ননÑসেবক। ওয়েবার বলছেন, মানুষ এই নেতাদের একদিকে তারা তাকে যেমন রাজনৈতিক বন্ধু মনে করে, একাত্ম আপনভাবে অপ্রিয় সম্পর্কে সম্পর্কিত মনে করে। অন্যদিকে তারাই আবার অর্থাৎ জনগণ তার কথা শোনে, মান্য করে, বিশ্বাস করে ও অধীনতা মেনে নেয়। আর বিশ্বাস করে, এমনভাবে যা চিরায়ত ও ঐতিহ্যগতভাবেÑকোনো বাধ্যবাধকতায় নয়Ñভালোবাসার ও সম্মানের কারণে। তারা অতিমানবিক ননÑসমাজের, রাষ্ট্রের এবং রাজনীতির জটিলতা, স্রোতের বিপরীত বা বৈরী ধারার বিপক্ষে। তাদের সংগ্রাম করতে হয়। আর এভাবেই রাজনৈতিক সংগ্রাম, জটিলতার বিরুদ্ধে সহায়কভাবে, নিষ্পত্তিমূলক চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। আর এই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র প্রক্রিয়ায় অধীনতামূলক ব্যবস্থা থেকে চিরায়ত এবং আইনি ব্যবস্থার চূড়ান্তকরণ যিনি করতে পারেন, তিনিই ক্যারিশম্যাটিক নেতা। এই অধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম, বিপ্লবে পরিবর্তনে কতটা এই নেতা ধারণ করতে পারেন, জন-একাত্মতা কায়েম করতে পারেনÑএই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই একজন সাধারণ নেতা উত্তীর্ণ হন ঐতিহাসিক পর্বের ভেতর দিয়ে আর এই নেতাই হলেনÑ‘ক্যারিশম্যাটিক’। অধীনতার বিপক্ষে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ডিঙিয়ে যিনি কতটা শক্তিশালীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন, সার্বক্ষণিক জনতার কাতারে দাঁড়াতে পারেনÑতার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অপর নামই হচ্ছে ক্যারিশম্যাটিক নেতা।
[বিস্তারিত আলোচনার জন্য Max Weber, Politics As a Vocation, oxford university press New York, 1946, Page-3-৬]
সবাই রাজনৈতিক নেতা কিন্তু সব নেতা ক্যারিশম্যাটিক ননÑএটাই হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। এ ধরনের নেতা তৈরি বা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় জন্ম নেন না কিংবা কোনো ছাঁচে ফেলে তৈরি করা যায় না। এমন নেতা দীর্ঘ রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, বৈরিতা, সময়ের অথবা সমাজের ও রাজনীতির নানা মাত্রিকতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেন। এ ধরনের নেতা যুগোত্তীর্ণ। ইতিহাস তাকে ধারণ ও বরণ করে এক ভিন্নমাত্রায়। কারণ তা নির্ধারণের একটি পথ হচ্ছেÑএই নেতারা কীভাবে গভীরভাবে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং জনমানুষকে কতটা প্রভাবিত করতে পারেন। নিজের কর্মকাণ্ডের বৈধতা উৎপাদন করতে পারেন ও তাদের সঙ্গে আত্মার সংযোগ স্থাপনে সক্ষমতা তার ওপর নির্ভর করে। আর এটাই হচ্ছে সমাজ এবং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামোর বন্দোবস্ত স্থাপনের ভূমিকা। তারা কী করতে পারেন, কতটা বদলাতে পারেন, তার জন্য প্রমাণের প্রয়োজন হয় না বলে অনেক রাজনীতিবিজ্ঞানী ও সমাজবিশ্লেষকরা মনে করেন।
মাতা-পুত্রের সম্পর্কের নিরিখে নয়, খালেদা জিয়ার স্থানে বিএনপির নতুন চেয়ারপারসন তারেক রহমানÑএমন একজন নেত্রীর শূন্যতা কতটা পূরণে সক্ষম হবেনÑসে প্রশ্ন আসবেই। আসবেইÑকারণ অচিরেই শোক কাটলেই এ প্রশ্ন অবধারিত। কারণ খালেদা জিয়া এমন নেতা ছিলেনÑএটা ইতিহাসের মাধ্যমে অথবা অন্যপথে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন আকারে দাঁড়াবে।
বেগম খালেদা জিয়া প্রথমে রাজনীতির মানুষ ছিলেন নাÑছিলেন গৃহবধূ। কেন একজন গৃহবধূ রাজনীতিতে এলেনÑসে প্রশ্নটি আসবে এবং অতীতেও এসেছে। সৈনিক জিয়াউর রহমানকে বারবার আসতে হয়েছে দেশের অসম্ভবে এবং দুর্বিপাকে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেনÑএকজন ‘শূন্যতা পূরণকারী’ হিসেবে জাতির প্রয়োজনে এবং জাতির স্বার্থে, মনের টানে। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং ন্যায়-ন্যায্যতা বোধ থাকত, তাহলে তাকে একজন শূন্যতা পূরণকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে হতো না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দোদুল্যমানতার গভীর সংকটে তার আবির্ভাব। আর এটি তাকে করতে হয়েছে গভীর দেশপ্রেমে। এ কারণেই তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আবার একই জিয়াউর রহমান এক ‘রাজনৈতিক মহাশূন্যতা’ পূরণে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তাকে এগিয়ে আসতে হয়। তিনি তখন রাজনীতিতে কতটা আগ্রহী ছিলেন, সে প্রশ্ন রেখেই বলতে হয়Ñএকজন আগাগোড়া সৈনিককে রাজনীতিবিদ্যা শিখতে হয়েছে নানাভাবে প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। এই রাজনীতিবিদ্যা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অথবা কোনো গুরুর কাছ থেকে তিনি পাননি। রাজনৈতিক শূন্যতা এবং আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা ও বিশেষ করে অধীনতা পরাজয়ের তত্ত্ব (dominant theory) তাকে বুঝতে হয়েছে। আর এটিই ছিল তার রাজনৈতিক পাঠ এবং রাজনীতি, সমাজ, জনমানুষকে বোঝার ‘পাটাতনটি’ নির্মিত হয়েছে এভাবেই। পুঁথি কলমে নয়Ñতাকে অভিজ্ঞ করেছে বৈরী বাস্তবতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
জিয়া শিক্ষা পেয়েছিলেন আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা এবং সেনাপতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের কাছ থেকে। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮) শুধু একজন সমর নায়কই ছিলেন না, ছিলেন দীক্ষাগুরু হিসেবে। আতাতুর্ক ভেঙেচুরে পড়া তুরস্কের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তখনকার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র (Small State)-কে তৈরি করেন এক ভিন্নমাত্রিক রাষ্ট্রে, যাতে তিনি একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য ধর্মীয় তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ এবং জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে গড়ে তোলেন এক নতুন রাষ্ট্রকাঠামো। উসমানিয়া খেলাফতের স্থানে রাজনৈতিক, আইনগত, কট্টর, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকÑঅর্থাৎ সামগ্রিক এক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে, যাকে ‘তুরস্ক বিপ্লব’ বা Turkish Revolution বলা হয়। আর সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি এক কঠোর অবস্থান নেন। সেনাবাহিনীনির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আতার্তুক জারি করলেন নতুন এক নিয়ম, সেনাবাহিনীতে থাকলে রাজনীতি নয় অথবা রাজনীতিতে থাকলে সেনাবাহিনীকে নয়। একে রাজনীতি বিজ্ঞানে বলা হয়Ñক্যাথলীয় তত্ত্ব বা Kemalits Model হিসেবে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়া বহির্বিশ্বে দুজনকে গণ্য করতেনÑআতাতুর্ক এবং নেপালের রাজা মহেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ দেবকে (ক্ষমতাকাল-১৯৫৫ থেকে ১৯৬৯)। তিনি নেপালকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাসহ নানা সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলোÑভারতের অধীনতা থেকে বেরিয়ে এসে রাজা মহেন্দ্র চীনের সঙ্গে গভীর সুসম্পর্ক স্থাপন করেন, যাকে এক কথায় বলা হয়Ñবিরাট মৌলিক ও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপ। মহেন্দ্র বিদেশি শক্তিকে নেপালে ফিরিয়ে আনাসহ সূক্ষ্ম সার্বভৌমত্বের ভারসাম্যের মাধ্যমে ভারতের চাপকে প্রতিহত করেন।
[বিস্তারিত আলোচনার জন্য তালুকদার মনিরুজ্জামান তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আমীর খসরু, গণতন্ত্রের সংকট, সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসনের সমস্যা]।
সার্ক গঠন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পর্কোন্নয়ন, ইসলামি দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি ইত্যাদি।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ধারণাসহ মৌলিক পরিবর্তনের অনেক কিছু করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার ধারণা এই কারণে যে, অনেকেই এসব বিষয় নিয়ে অতি আবেগী অথবা অন্য কোনো কারণে বিস্তর আলোচনা করেছেন।
কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার এক সংসারের গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি জেনারেল জিয়ার মতো ছিল না। তিনি রাজনীতিকে ভয় পেতেনÑতার স্বামীর অপমৃত্যু এবং আধিপত্যবাদের ভয়াল থাবা দেখে ও নেতিবাচক উপলব্ধির কারণে। জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে এসেছিলেন অপরিহার্য ও অত্যাবশ্যকীয় শূন্যতা পূরণে। আর বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হনÑরাজনীতির বিশাল এক শূন্যতা পূরণ, দলের দুঃসময়ে প্রায় ডুবন্ত জাহাজকে কূলে টেনে আনার অপরিহার্যতা এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে। দুটোই শূন্যতা পূরণ, তবে ভিন্নমাত্রিক। যদি কেউ প্রশ্ন করেন দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে? জবাব হবে ইতিবাচক। তবে পরাধীনতা এবং আধিপত্যবাদ থেকে দেশকে রক্ষা ‘কমন ইস্যু’।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকে বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বেরিয়ে আসে যে, এক. ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তার অজানা ভবিষ্যৎ, দুই. ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে স্বামীহীন, দুটো সন্তানসহ অনিশ্চিত জীবন ও যাত্রা, তিন. ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে স্বৈরশাসক এরশাদের প্রতিহিংসা ও নানা কূটকৌশলে বিপর্যস্ত বিএনপিকে রক্ষায় ইতিবাচক সম্মতি এবং ৮৪ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ, চার. ১/১১ থেকে শুরু হওয়া দেশীয় মূলত সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের হাতে নিঃগৃহীত হওয়া, পাঁচ. কোনো বহিঃশত্রু এর পেছনে জড়িতÑতা তিনি জানতেন, ছয়. আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের আমলের ১৭ বছর নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়া। সবসময়ই তিনি বলতেন, ‘বাংলাদেশ আমার শেষ ঠিকানা, বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।’ ১/১১-এর সময়ে তার বাক্স-পেটরা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার পরও তিনি বলেছিলেন, আমি বিদেশে যাব না। আমি বাংলাদেশেই থাকব। জোর-জবরদস্তির পরও বিদেশে না যাওয়া, ছোট সন্তান হারানো, বড় সন্তানকে সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে। আমার বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই এবং আমি নিজেকে একজন সামান্য মানুষ হিসেবেই মনে করিÑএ দুটো কোনো সাধারণ বাক্য নয়। এটা হচ্ছে তার সময়ের নিজস্ব সততা, দেশপ্রেমের জবানবন্দি বা বাইবেলে যাকে বলা হয়েছেÑ‘Testament’। এটিই তার সঙ্গে আর দেশপ্রেমিক জনগণের মধ্যে নির্মাণ করেছে আত্মীয়, নৈতিক কর্তৃত্ব মানার ভিত্তিভূমি। অনুসরণকারীরা একে কখনো কখনো বীরত্ব, আপসহীনতা হিসেবে মনে করে। দেশের জনগণ অর্থাৎ সাধারণ অনুসারীরা তাকে আর শুধু নেতা হিসেবেই নয়, প্রকাশ করে আবেগপূর্ণ ভক্তি, যা যুক্তির চেয়ে বিশ্বাস এবং পরম ঐন্দ্রজালিক অনুভূতির প্রকাশ করে। জনবিশ্বাস এমন দৃঢ় হয় যে, যেখানে নেতার কথা তার কাছে মনে হয় অবশ্য পালনীয় কর্তব্য এবং অনুরোধকে মনে হয় আদেশ হিসেবে।
এই অবস্থাকে ফরাসি মার্কসীয় দার্শনিক মিচেল ফ্যুাকো (Michel Foucault) তার বিখ্যাত-তত্ত্ব Political Spirituality বা রাজনৈতিক আত্মিকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য একে অনেকে আধ্যাত্মিকতাও বলে থাকেন। ইরানি বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও এটিকে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে দেখা সঠিক হবে না। তত্ত্বটিকে বরং আত্মরূপান্তরণমূলক প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তিকে মৌলিকভাবে ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে জানা ন্যায় ও সত্যের শাসনকে স্থাপন এবং নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি উত্থাপন করতে শেখায়। সংক্ষেপে ফ্যুাকোর আত্মিকতা হচ্ছে অন্যায্য, নীতিবিরোধী ক্ষমতার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা।
বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক আত্মিকতার ধারণার সৃষ্টি করেছিলেন এক ভিন্নমাত্রায়, অর্থাৎ ন্যায়, নীতি ও ন্যায্যতার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা এবং আধিপত্যবাদ, অধীনতার বিপক্ষে মানুষের মুক্তির। ১৯৯১ সালের একটি মাত্র উক্তিতে তিনি তুলেছিলেন তার সেই তত্ত্ব এবং অভিব্যক্তিÑ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে জাতীয় পতাকা’। এই একটি বাক্যই বলে দেয়, জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অধীনতামুক্ত বাংলাদেশের কথা। এটাই বেগম জিয়ার চিরস্থায়ী মেনিফেস্টো, মানুষের সঙ্গে তার চুক্তি এবং জনতার সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির সঠিক ও স্থায়ীভাবে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন খুব সাবলীলভাবে। সব মিলিয়ে এ কারণেই তিনি হয়ে উঠেছেন দল-মত নির্বিশেষে সবার ওপরে।
তারেক রহমানের বিএনপি
এখন তারেক রহমানের কাঁধের ওপরে পড়া দলের বিশাল চাপ যেমন সহ্য ও সামাল দিতে হবেÑতেমনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষানীতি কৌশলকে নির্ধারণ করতে হবে। তিনি কি পিতা ও মাতার মতো আধিপত্যবাদ ও অধীনতার বিপক্ষে দাঁড়াবেন? না এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার নামে নতুন নীতি কৌশল গ্রহণ করবেন?
এ এক কঠিন সিদ্ধান্তে সূক্ষ্মতর দড়ির উপর দিয়ে পথ পাড়ি দেওয়া। ভুলের কোনো সুযোগ নেই। তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যায়, ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা হবে রাজনৈতিকভাবে বিতাড়ন বা বিলোপ (Political Elimination)।
লেখক : গবেষক, সাংবাদিক