হোম > মতামত

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট

ম্যান্ডেটহীন স্কোপ ও ওভারল্যাপের অন্ধকার

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

বাংলাদেশের এজেন্সি গুলোর মধ্যকার ফাংশনাল স্কোপের ওভারল্যাপ বিস্তর। আমরা যদি বাংলাদেশ পুলিশ এবং ডিজিএফআই এর টিম গুলোর মধ্যকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ এ যাই বড্ড ওভারল্যাপ দেখতে পাই। টেরোরিজম ও কাউন্টার টেরোরিজমের টিম দুই জায়গাতেই আছে। উভয়ের যেসব কারিগরি টুলস এবং সিস্টেম আছে- এসব ইন্টার-ওপারেবল না। একদিকে স্কোপ ওভারল্যাপিং, অন্যদিকে হার্ডওয়্যার সফটওয়্যার এবং ট্রেনিং কিনতে রাষ্ট্রের বাড়তি খরচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ পুলিশের আছে- LIC, Metro police, DB, PBI, CT, ATU, CTTC, APBN, PBI. আবার র‍্যাবের অনুরূপ টিম আছে। রেব apbn এর মত police headquarter report করার কথা কিন্তু তারা করে না, ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (আইজিপি) রেবের কার্যক্রম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকেন না। যদি ডিজিএফআই'তে দেখি- এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স টিম, কাউন্টার টেরোরিজম টিম, এসআইবি, এডমিন ব্যুরো, ফোর্সেস ফরেন লিয়াজোঁ ব্যুরো ইত্যাদি আছে। কিন্তু এর বাইরেও আছে দুটি বিশেষ টিম যা অবাক করা- ক। প্রেস এন্ড পাবলিক মিডিয়া ব্যুরো (PPMB), যারা বিভিন্ন মিডিয়ার জন্য নিউজ ন্যারেটিভ ও নিউজ কন্টেন্ট লিখে দেয়। খ। PRMC পাবলিক রিলেশন মনিটরিং সেল।

(ওয়ান ইলেভেনের সময় এবং তারপরে, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও বিভিন্ন সময় ফ্যাক্টচেকিং এ দেখা গেছে, PPMB টিমের হুবহু কন্টেন্ট পত্রিকায় এসেছে। এসব লেখা প্রথম আলো ডেইলি স্টার মানবজমিন বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকায় সহ বিভিন্ন জায়গায় হুবহু এসেছে, ডেইলি স্টার সম্পাদক এটা পাবলিকলি স্বীকার করেছেন। অন্যদের সাথে এই লেখকের বিরুদ্ধে মানবজমিনে এমন লেখা ছেপেছে যার হুবহু লাইন এমনকি প্যারা সবকিছুই ফ্যাক্ট চেকিং এ ধরা পড়েছে। ওয়ান ইলেভেনের পরে বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কন্টেন্টের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, এসবের ডজন ডজন অকাট্য প্রমাণ রয়েছে।)

এটা অত্যন্ত অবাক করাবে ব্যাপার যে, কোনো লিগ্যাল ম্যান্ডেট ছাড়াই শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর একটি সংস্থা সিভিল ম্যাটারে মিডিয়া ইন্টারফেয়ার করে, কনটেন্ট লিখে দেয় এবং ব্যক্তিকে আক্রমণ করে মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে জনমনে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে এভাবে ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল করে গেছে। নাগরিকের করের টাকায়, পাবলিক মিডিয়া ব্যুরো নামে একটি টিম ডিজিএফআই কেন পালবে, কোনো আইনি ভিত্তিতে পালবে- এসব নিয়ে সমাজে কোন আলোচনা এবং জবাবদিহিতা নাই, বাস্তবে এটি ব্যবহার করা হয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডার হস্তগত করা এবং রাজনৈতিক হয়রানিতে।

আমাদের এজেন্সিগুলো আওয়ামী আমলে বট পেলেছে। ন্যারেটিভ ও কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরিতে সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করতো। কিন্তু আমরা স্ট্যাডি করে দেখেছি, এর কোনো কার্যকারিতা নাই, অর্থ অপখরচ ছাড়া। একটা ভাইরাল কন্টেন্ট এর লাইফ টাইম মাত্র ৮-১২ ঘণ্টা। আপনি ১ বা ২ দিন পরে লাখ টাকার ভিডিও বানালেন, ততক্ষণে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডিং চেঞ্জ হয়ে যায়। অথচ এই বেদরকারি কাজটা ডিজিএফআই সহ একাধিক সংস্থা করতো।

বিভিন্ন দেশে জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থে এজেন্সি গুলোর সিভিলিয়ান মুখপাত্র থাকে। মূলত আমরা দেখি আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক এবং ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তারা বয়ান উৎপাদন করেন দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। এবং এ জাতীয় লোক হন বিদগ্ধ পণ্ডিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক কিংবা খ্যাতমান রিসার্চার। অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয় যে বাংলাদেশে এই কাজটি করেন ডিজিএফআই এর কিছু শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা বা শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, এবং কিছু অসাধু সাংবাদিক যাদের এই সংক্রান্ত কোনো জ্ঞান, ডিগ্রি, গবেষণা, পলিসি স্ট্যাডি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ট্রেড নেগোসিয়েশনের জ্ঞান একেবারেই নাই।

অবাক করা বিষয় আরেকটি টিম আছে, সেটার নাম হচ্ছে, PRMC পাবলিক রিলেশন মনিটরিং সেল। অভিযোগ আছে এই টিমটি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মিডিয়া হাউজের ম্যানেজমেন্ট এ কে বসবে সেটা ডিক্টেট ও ফেসিলিটেট করে দেয়।

অন্যদিকে, সাহায্যকারী বাহিনী হিসেবে যদি আনসারকে দেখি, প্রায় চার লক্ষ জওয়ান। অনেকের হাতে অস্ত্র আছে। কিন্তু তাদের রেগুলার লং কোর্স বা কাঠামোগত ট্রেনিং নাই। মাত্র ৬ মাসের ট্রেনিং এ আপনি একজন জওয়ানকে অস্ত্র কিংবা আইন শৃঙ্খলার দায়িত্ব দিতে পারেন না। একদিকে তার আইনের বিধিবিধান সম্পর্কে, হিউম্যান রাইটস এবিউজ সম্পর্কে ট্রেনিং নেই অন্যদিকে নেই প্রপার আর্মস ট্রেনিং। এসবের পেছনে বাজেটও নাই। ফলে আউটপুটও আসছে না।

ডিজিএফআইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রিফর্মের কী হবে?

ডিজিএফআই ফাংশনালি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে। বাস্তবে এর কাজের প্রসেস, কমান্ড স্ট্রাকচার এবং রিসোর্স এলোকেশন উভয়েই মিলিটারি কমান্ডে চলে।

অন্যদিকে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন (এএফডি) এবং জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্সের সাথে ডিজিএফআই ফাংশনাল রিলেশনও ঠিক করা উচিত। একটা ন্যারেটিভ এমন প্রচলিত আছে যে, প্রধানমন্ত্রী যাতে সেনাপ্রধানকে বাইপাস করে কোন ক্যান্টনমেন্টে কী হচ্ছে এটা জানতে পারেন, তার কার্যকরী টুল ডিজিএফআই; এটা গণতান্ত্রিক সরকারকে সেইফগার্ড দিতে এন্টাই-ক্যু মেকানিজমের অংশ।

আরেকটা অভিযোগ আছে যে, এনএসআইয়ের প্রায় আশি শতাংশই আওয়ামীলীগদের দলীয় বিবেচনায় নিযুক্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। ( অন্য এজেন্সি গুলো কানে কানে বলে)। ফলে কোনো এজেন্সি প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভুল তথ্য দিচ্ছে কিনা’ সেটা ভ্যালিডেট করতে ডিজিএফআই এর মত পেশাদার মিলিটারি ব্যাকড সংস্থা দরকার।

মূলত যেসব ইন্টারনাল এফেয়ার্স এর ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিলেটেড কাজ স্পেশাল ব্রাঞ্চের (যদিও পুলিশের সাথে এটাচড, এটিও ডিজিএফআই এর মতন প্যারালেল বডি) করার কথা, সেগুলোকে বোঝাপড়ার অভাবে ডিজিএফআইয়ের কাছে তুলে দেয়া হয়েছে। এতে করে স্পেশাল ব্রাঞ্চ ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও নেগলেক্টেড।

সাইবার অপরাধে, ব্যাংকিং অপরাধে এসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই'কে আলাদা আলাদাভাবে একই টপিকে কাজ করতে দেখেছি। সাইবার ক্রাইম ডিফেন্স এন্ড ইনভেস্টিগেশন সক্ষমতা সবার থাকলে ভালো, তবে সমন্বয় না থাকা অন্যায়। আমাদের ইন্টার-অপারেবিলিটি ও ইউনিক টিকিটিং সিস্টেম থাকা চাই। ইন্টার-অপারেবিলিটি তখনই কাজ করবে যখন সবাই সবার কাজের স্কোপ ও সীমা জানবে।

আবার দেখুন, সিআইডি আদালতে তথ্য প্রমাণ হাজির করে, মামলার তদন্ত করে কিন্তু তাদের ভালো কোনো সাইবার টুল নাই। পুলিশের ফরেনসিক টিম শুধু এন্ডয়েড ফোন ও ল্যাপটপ ফরেন্সিক করতে পারে, অন্য কোনো ডিভাইস পারে না। এভাবে একদিকে অতি খরচ, অন্যদিকে ফান্ডামেন্টাল ক্যাপাসিটিতে অর্থ নাই।

দেশের ইতিহাসে কয়েকবার এই কনফ্লিক্ট হয়েছিল যে- এরশাদ পতনের কালে, ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চের সময়ে, ওয়ান ইলাভেনের সময়ে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বরতীকালীন সময়- ডিজিএফআই ঠিক সেনাপ্রধানসহ তিন বাহিনী এবং এএফডি, নাকি রাষ্ট্রপতি, নাকি প্রধানমন্ত্রী/প্রধান উপদেষ্টার অধীনে- এটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অর্থাৎ যে কোনও ন্যাশনাল ইস্যুতে কর্মকর্তারা এবং ম্যানেজমেন্ট একটা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট এবং কমান্ড ডিলেমায় পড়েন। এতে ক্রাইসিস ট্যাকেলে এজেন্সি গুলার ফাস্ট এন্ড বেস্ট আউটপুট পাওয়া যায় না।

এটা উনাদের সমস্যা না, সমস্যা সিভিল ও মিলিটারি এডমিনিস্ট্রেশনের যৌথ খবরদারির সমন্বয়ে গড়া সিস্টেমের। অনেকের মতে, একটা ইফিশিয়েন্ট সংস্থার হয় শতভাগ সিভিল ক্যারেকটার, না হয় শতভাগ মিলিটারি চরিত্র থাক উচিত। মানে একক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য থাকা উচিৎ। হাইব্রিড ফাংশনের সমস্যা সল্ভ না হলে, এই অর্গানাইজেশন যেকোনো গণতান্ত্রিক ক্রান্তিকালে ইতিহাসের ভুল সাইডে থাকার সম্ভাবনা প্রবল হয়। তবে হাইব্রিড এজেন্সি হতে হলে, কেইস বাই কেইস স্কোপ অফ ওয়ার্ক, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেস (এসওপি) এবং টার্মস অফ রেফারেন্স (টিওআর) রিফর্ম করতে হবে। (আবারও মনে করিয়ে দেই, বাংলাদেশে র‍্যাবের মত হাইব্রিড এলিট বাহিনী গুম, আয়নাঘর ও খুন সহ প্রায় সবধরনের অপরাধের কালিমা লেপেছে।) বর্তমান বিন্যাস অন্য এজেন্সির ক্ষমতা দায়িত্ব শুধু ওভারল্যাপই করে না বরং সরাসরি খর্ব করে। ডিজিএফআই বন্ধ হবে, নাম পরিবর্তন হবে বা রিফর্ম হবে, যাই হোক এই প্রশ্ন গুলোর বুঝাপড়া তৈরি করেই তা করতে হবে। এটাও ঠিক ইফিশিয়েন্ট সংস্থাকে হত্যা নয় বরং তার মানবিকায়ন দরকার, এজন্য দরকার সংস্থার জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ প্রশাসন।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশকে শক্তিশালী করতে চান এটা ভাল উদ্যোগ। পুলিশকে দেশের সকল সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়ন, তদন্ত ও বিচারকি সহায়তা এবং অপরাধ দমনের সেন্টারে আনতে হবে, বাকিরা সাপোর্ট রোলে থাকবে, আইন প্রদত্ত নিজ নিজ স্কোপে। নাইলে খরচ বাড়বে, অদক্ষতা বাড়বে। পুলিশকে ক্ষমতায়নের আগে এজেন্সিগুলোর মধ্যকার ফাংশনাল ওভারল্যাপ রিমুভ করতে হবে। এজেন্সি গুলোকে নিজ নিজ লিগ্যাল ম্যান্ডেটেড স্কোপে ফিরে যেতে হবে। সার্ভেইলেন্স, কল রেকর্ড, লোকেশন ট্র্যাকিং, ডিভাইস হ্যাকিং থেকে ব্যাংক দখল, বট পালা থেকে নিউজ রুম কন্ট্রোল- এসব থেকে এজেন্সি গুলাকে রোল বেজড ফাংশনে নিতে হবে। অন্যথায় সবাই সব করবে, কিন্তু সবাই ইনিফিশিয়েন্ট থেকে যাবে, মাঝে হয়রানি, মানবাধিকার হরণ এবং স্টেট স্পন্সরড অপরাধ বাড়বেই।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক।

সমীকরণ বদলে দিয়েছে ইরান

জাকাত বনাম চাঁদাবাজি ‘বেটার’ রাজনীতির নতুন নৈতিকতা?

ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে

চার দিনের যুদ্ধে বদলে যাওয়া উপমহাদেশ

ইসরাইলকে চ্যালেঞ্জ জানাবে সৌদি-তুরস্ক জোট

বাংলাদেশে ইসলামি আন্তঃব্যাংক বাজার চাই

সীমান্তে আরএসএস জঙ্গিদের উত্থান

হাওরে বোরো বিপর্যয়ে কৃষকের কান্না

মা দিবস: ভালোবাসা, ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক

জবাবদিহি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা