হোম > মতামত

আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার জন্য বড় হুমকি ইসরাইল

পল ম্যাকলাফলিন

প্রতীকী ছবি

প্রায় এক বছর আগে গত ডিসেম্বরে সিরিয়ার বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল শারার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শামের (এইচটিএস) আকস্মিক জোরালো আক্রমণ শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যেই বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটে। ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি সিরিয়ায় পদ্ধতিগত দুর্নীতি ও নিপীড়নের অবসান ঘটানোর ব্যাপারে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু ইহুদি বর্ণবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলের অব্যাহত হামলার কারণে সেই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়েছিল। তবে সিরিয়ার নতুন সরকারের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইতিবাচক মনোভাব ইসরাইলের আগ্রাসী তৎপরতায় কিছুটা হলেও লাগাম টানবে বলে আশা করা যায়।

যদিও দামেস্কের নতুন সরকার দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ও নিয়মনীতি চিরতরে পরিবর্তন করতে এ পর্যন্ত কতটুকু সক্ষম হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু তারপরও এ কথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সিরিয়া আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি স্বাধীন, স্থিতিশীল ও জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে রয়েছে। কারণ এগুলো দেশটির দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার ক্ষত নিরাময় করতে এবং দেশটির পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু তারপরও সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এর কারণ ওই অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখনো সীমিত এবং ইসরাইলি বাহিনীর নিয়মিত আক্রমণের ফলে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার দামেস্কের দক্ষিণের বেইত জিনে এলাকায় ইসরাইলি টহলদল এবং স্থানীয় সশস্ত্র লোকজনের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এর পরই দামেস্কের দক্ষিণের ওই গ্রামাঞ্চলে ইসরাইলি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোয় কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হন।

ইসরাইলের যে চরিত্র, তাতে এটা সহজেই অনুমান করা যায়, তারা দামেস্কের দক্ষিণের ওই এলাকায় একটি কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে স্থানীয়দের ওপর হামলা চালানোর গল্পটি প্রচার করার চেষ্টা করেছে। ইসরাইল দাবি করেছে, তারা সেখানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সিরিয়ার এই অঞ্চল থেকে ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই এবং এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতির কোনো তথ্যও কারো জানা নেই। ইসরাইলি হামলার সর্বশেষ এই ঘটনাটি গত এপ্রিলে দারা প্রদেশের নাওয়ার এলাকার কাছে ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি মাত্র। সেখানেও একটি ইসরাইলি হেলিকপ্টার ও কামান স্থানীয় লোকজনের একটি দলকে লক্ষ করে গুলি চালায়। এতে ৯ জন নিহত হন।

ইসরাইলি গণহত্যার দুই দিন পরও সেখানে নিহতদের ছেঁড়া জুতা ও রুকস্যাক পড়ে ছিল এবং চারপাশের মাটিতে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের গর্ত ছিল। এই হামলার পর স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এবং আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। ইসরাইলের হামলার পর স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ একে-৪৭ ও পিস্তল বহন করছিলেন। কারণ তারা শহরের কেন্দ্রস্থলের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে আসা ইসরাইলি সেনাদের কাছ থেকে আরো আক্রমণের আশঙ্কা করছিলেন।

নিহতদের স্মরণে স্থানীয় নিরাপত্তা ঘাঁটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভবিষ্যতে ইসরাইলি আক্রমণ প্রতিহত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। দারার এই লোকজনের মধ্যে বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়ানো ব্যক্তিরাও ছিলেন এবং তারা সিরিয়ান, রাশিয়ান ও ইরানি বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

ইসরাইলের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তির সম্প্রসারণবাদী তৎপরতায় তারা মোটেও বিচলিত নন। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক ব্যক্তি গত এপ্রিল মাসে ইসরাইলি সেনাদের হামলায় তার ছেলেকে হারিয়েছেন। এর আগে দারায় বাশার আল আসাদ সরকারের দশকব্যাপী হামলার সময় তিনি তার আরো চার সন্তানকে হারিয়েছেন। এসব কারণে মৃত্যু এখানে স্বাভাবিক একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইসরাইলি আক্রমণে নিহতদের মধ্যে বেসামরিক লোকজনের সংখ্যাই বেশি থাকে। ফলে এই এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে এবং শহর ছেড়ে চলে যাওয়া অনেক লোক নিজেদের সুরক্ষার জন্য হালকা অস্ত্র বহন করে। ইসরাইলি হামলার পর আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন হতাহতদের উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে এলে অনেক সময় তাদের ওপরও হামলা করে ইসরাইলি সেনারা। অনেক সময় এসব হামলায় হেলিকপ্টার গানশিপ ও কামানও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

এটি ইসরাইলের একটি ইচ্ছাকৃত সংঘাতের নীতি, যা দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজনের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। ইসরাইলের এই আগ্রাসী তৎপরতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিরিয়ার আরো ভূখণ্ড দখল করা। সিরিয়া থেকে ইসরাইলে আইএসের হামলার দাবিটি হাস্যকর। কারণ তারা তাদের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ কখনো দেখাতে পারেনি। ইসরাইল বিশ্বাস করে, সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে বোমা হামলা দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যতের আলোচনায় তাদের জন্য দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করে দেবে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় ব্যাপক রক্তপাত ও হৃদয়বিদারক নানা ঘটনা এবং বাশার আল আসাদ-পরবর্তী সময়ে দেশটিতে ইসরাইলের ব্যাপক হামলা সত্ত্বেও নতুন সরকারের সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে, তারা একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছে। দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া, জনসেবা ধীরে ধীরে উন্নত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে আশা করা যায়, দেশটি স্বাভাবিকতার স্তরে ফিরে আসার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই অগ্রগতি অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসরাইল।

কিন্তু ইসরাইল সবসময়ই তার ‘নিরাপত্তার ইস্যু’টিকে এই অঞ্চলে তার অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু বাশার আল আসাদ সরকারের পরাজয় এবং ইরান-সমর্থিত সংগঠনগুলোর সিরিয়া ছাড়ার পর দেশটিতে অব্যাহত হামলার জন্য আর কোনো যুক্তি বা অজুহাত নেই। এখন সিরিয়ায় ইসরাইলের এসব তৎপরতা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও উসকানি হিসেবে গণ্য হবে।

এই পরিস্থিতিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ না করতে ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের অধীনে দেশটিতে চলমান পরিবর্তনে তিনি খুবই সন্তুষ্ট। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরে এখন সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

সোমবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘সিরিয়ার সঙ্গে দৃঢ় ও আন্তরিক যোগাযোগ বজায় রাখা ইসরাইলের জন্য জরুরি এবং সিরিয়ার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড যেন না ঘটে। আমরা চাই সিরিয়া একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হোক।’

ট্রাম্প সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার প্রশংসা করে বলেন, তিনি দুই দেশের জন্যই ‘ভালো কিছু ঘটানোর’ জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছেন এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য এটি এক ঐতিহাসিক সুযোগ’। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন সিরিয়ায় ইসরাইলের বিমান ও স্থল অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়া বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে ইসরাইল অন্তত এক হাজার বার বিমান হামলা এবং সীমান্ত অতিক্রম করে চার শতাধিক হামলা করেছে। তারা গোলান মালভূমির নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোনও দখল করেছে। ইসরাইলের এসব কর্মকাণ্ড ১৯৭৪ সালের সমঝোতার লঙ্ঘন। প্রেসিডেন্ট আল শারা স্থায়ী শান্তির জন্য ৮ ডিসেম্বরের আগের সীমান্তে ফিরে যাওয়ার দাবিও জানিয়ে আসছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, কঠোর পরিশ্রম ও সংকল্পের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে সন্তুষ্ট যুক্তরাষ্ট্র। একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সিরিয়ার সরকারকে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, সিরিয়ার ওপর থেকে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের আমন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা হোয়াইট হাউসে গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী তালিকা থেকেও একাধিক জ্যেষ্ঠ সিরীয় কর্মকর্তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরব দেশগুলো সিরিয়ায় বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে। ফলে নানা দিক থেকেই একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার পথে এগিয়ে চলেছে সিরিয়া।

দ্য নিউ আরব থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত