হোম > মতামত

ইউক্রেন যুদ্ধ : চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সতর্কবার্তা

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূইয়াঁ (অব.)

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

‘লিজ থেকে ক্ষতি’র কৌশল কীভাবে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে

বর্তমানে সারা বিশ্বের চোখ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে থাকলেও এই সংঘাতের আসল স্পন্দন অনুভূত হচ্ছে কৃষ্ণ সাগরের গভীর ও শীতল জলরাশিতে। আপাতদৃষ্টিতে এই যুদ্ধকে ভূখণ্ডের দখল নিয়ে লড়াই মনে হলেও এর মূলে রয়েছে শত বছরের পুরোনো সামুদ্রিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার সংগ্রাম। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছে কৌশলগত সমুদ্রবন্দরগুলো হলো এক পরম কাঙ্ক্ষিত সম্পদ, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ঠিক বিপরীতভাবে প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর কাছে এটি হলো টিকে থাকার লড়াইয়ের এক ‘কৌশলগত লঞ্চপ্যাড’ বা অগ্রবর্তী ঘাঁটি।

বাংলাদেশ যখন চট্টগ্রাম বন্দরের মতো আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরাকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের (যেমন, মার্স্ক গ্রুপ, আরএসজিটি বা ডিপি ওয়ার্ল্ড) হাতে লিজ বা ইজারা দেওয়ার পথে হাঁটছে, তখন আমাদের বৈশ্বিক সামুদ্রিক ইতিহাসের এই ট্র্যাজিক শিক্ষাটি মনে রাখা জরুরি। একটি বন্দর কখনোই নিছক কোনো অবকাঠামো নয়; এটি একটি জাতির শক্তির চূড়ান্ত চালিকাশক্তি। ইতিহাস আমাদের এক কঠোর সত্য মনে করিয়ে দেয়—যখন আপনি আপনার ঘরের চাবি অপরিচিত কারও হাতে তুলে দেবেন, তখন আজ হোক বা কাল, আপনি আপনার পুরো ঘরটিই হারাবেন।

সেভাস্টোপল লিগ্যাসি : লিজ থেকে পরাধীনতার এক করুণ ইতিহাস

ইউক্রেনের ‘পোর্ট সেভাস্টোপল’-এর ইতিহাস আমাদের দেখায়, কীভাবে তথাকথিত ‘কৌশলগত লিজ’ বা ইজারার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলে। সেভাস্টোপল বন্দর এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এটি রক্ষায় রাশিয়া এ পর্যন্ত চারটি বড় যুদ্ধ লড়েছে। ১৯৯৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘পার্টিশন ট্রিটি’ স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে রাশিয়াকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই নৌঘাঁটি ব্যবহারের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে এটিকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা মনে করা হলেও শিগগিরই এটি দীর্ঘমেয়াদি পরাধীনতার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

২০১০ সালের ‘খারকিভ প্যাক্ট’-এর আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার বিনিময়ে এই ইজারার মেয়াদ ২০৪২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যা ছিল মূলত এক ঐতিহাসিক ‘অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার’ ফাঁদ। এই পরনির্ভরশীলতা চূড়ান্ত রূপ পায় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে, যখন রাশিয়া একতরফাভাবে ইজারা চুক্তি বাতিল করে এবং সেভাস্টোপলসহ পুরো ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, যখন একটি জাতি তার কৌশলগত ফটক ইজারা দেয়, তখন সেটি বিদেশি শক্তিগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয়। সেই ভাড়ায় দেওয়া বন্দরটিই শেষ পর্যন্ত দেশ দখলের প্রধান ঘাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। আজ সেই সেভাস্টোপল বন্দরই এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ, যা একপক্ষ হারাতে চায় না আর অন্য পক্ষ পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনি এক ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

চট্টগ্রাম : হুমকির মুখে আমাদের সার্বভৌমত্ব

একটি কৌশলগত সমুদ্রবন্দর যদি হয় একটি জাতির হৃৎস্পন্দন, তবে চট্টগ্রাম বন্দর হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির অক্সিজেন। দেশের মোট বাণিজ্যের ৯২ শতাংশেরও বেশি এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আজ এই বন্দরকে বিদেশি অপারেটরদের হাতে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, যা মূলত বৈশ্বিক দ্বন্দ্বে দেখা যাওয়া সেই ‘পুতুল-নাচের’ রাজনীতিরই প্রতিফলন। আমরা একটি ৩০ বছরের ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছি, যা আমাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত একটি ‘ব্যবস্থাপিত গেটওয়েতে’ পরিণত করতে পারে।

আর্থিক রক্তক্ষরণ : এক জাতীয় সংকট

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বিদেশি ‘কনসেশন মডেল’ বা ইজারা মডেলে যাওয়ার আর্থিক প্রভাব হবে ভয়াবহ। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার ‘চট্টগ্রাম বন্দর: লাভ না ক্ষতি’ শীর্ষক নিবন্ধে আমি উল্লেখ করেছি, আমরা মূলত কয়েক পয়সার লোভে আমাদের সোনার খনিটি অন্যদের হাতে তুলে দিচ্ছি।

এর আর্থিক বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ—

  • রাজস্ব বিপর্যয় : বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) কন্টেইনার প্রতি নেট প্রায় ৬৮ ডলার আয় করে। অথচ নতুন ইজারা চুক্তির আওতায় পতেঙ্গা (পিটিসি) এবং লালদিয়া টার্মিনাল থেকে আমাদের প্রাপ্য অংশ কমে মাত্র ১৮ থেকে ২১ ডলারে নেমে আসবে।
  • ৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি : এই ইজারা চুক্তির ফলে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং চার্জ (টিএইচসি) বাবদ কন্টেইনারপ্রতি প্রায় ১২৬ ডলার সরাসরি বিদেশি অপারেটরের পকেটে যাবে এবং তা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। ৩০ বছরের হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আমাদের অমূল্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক বিশাল ধস নামাবে।

অপারেটর মডেল : স্বয়ংসম্পূর্ণতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ

বাংলাদেশে ‘সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড (এসপিএল)’-এর যাত্রা জাতীয় স্বনির্ভরতার এক বলিষ্ঠ উদাহরণ। ২০০৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালের আধুনিকায়নে কাজ করেছে। যদিও শুরুতে তারা বিদেশি দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু কৌশলগতভাবে তারা আজ একটি দক্ষ দেশীয় জনবল গড়ে তুলেছে। আজ সাইফ পাওয়ারটেক প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্বমানের লজিস্টিক সেবা প্রদানে সক্ষম।

এনসিটি টার্মিনালের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের আরো বড় প্রমাণ। বাংলাদেশ নৌবাহিনী যখন সিডিডিএলের মাধ্যমে এর দায়িত্ব নিল, তখন কন্টেইনার খালাসের সময় (টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম) নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত সাইফ পাওয়ারটেকের অভিজ্ঞ জনবলকে কাজে লাগিয়ে। অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দেশীয় দক্ষ জনবল যুক্ত হলে ফলাফল যে বিশ্বমানের হয়, তা আজ প্রমাণিত।

২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত আমার নিবন্ধ ‘চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে’-তে আমি উল্লেখ করেছি, বিদেশিদের হাতে পুরো টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের উচিত ছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘গ্লোবাল অপারেটর’দের সমন্বয়ে একটি ‘অপারেটর মডেল’ গ্রহণ করা। এই মডেলে আমাদের সার্বভৌমত্ব যেমন অটুট থাকত, তেমনি উন্নত অটোমেশনের মাধ্যমে দক্ষতাও বৃদ্ধি পেত। এই ‘গ্লোবাল অপারেটর + লোকাল অপারেটর’ মডেলের সুবিধাগুলো হলো—১. নিয়ন্ত্রণ: বন্দরের শুল্ক নির্ধারণ এবং বার্থ বরাদ্দে সিপিএ’র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকত। ২. রাজস্ব: সব টিএইচসি বাংলাদেশের ব্যাংকে জমা থাকত, যা আমাদের জাতীয় রিজার্ভকে শক্তিশালী করত। ৩. স্বচ্ছতা: বর্তমানে চুক্তির গোপন শর্তাবলি নিয়ে যে ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (NDA)’-এর ধোঁয়াশা রয়েছে, তার কোনো প্রয়োজন হতো না।

ফিডার ট্র্যাপ ও শিপিংয়ের সংকট

মার্স্ক (MAERSK), এমএসসি (MSC) বা ডিপি ওয়ার্ল্ডের (DP World) মতো বৈশ্বিক দানবদের লক্ষ্য কখনোই বাংলাদেশকে ‘মাদার ভেসেল’ বা বড় জাহাজের হাবে পরিণত করা নয়। তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তিই হলো আমাদের ছোট ফিডার জাহাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, যাতে আমাদের বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা জেবেল আলীর মতো তাদের নিজস্ব ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে নির্ভর করতে হয়।

আমাদের নিজস্ব টার্মিনালগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার মানে হলো নিজেদের সাব-রিজিওনাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়ার স্বপ্নকে চিরতরে কবর দেওয়া। আমাদের সত্যিকারের উন্নয়ন চাইলে বিনিয়োগ করা উচিত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) নিজস্ব কন্টেইনার ফ্লিট বা জাহাজ বহরে। এর মাধ্যমে আমরা সরাসরি ইউরোপ, চীন বা জাপানে পণ্য পাঠাতে পারতাম এবং শত শত কোটি ডলারের মুনাফা দেশের ভেতরেই রাখতে পারতাম।

দাতা ও ঋণদাতার সাম্রাজ্যবাদ : মাতারবাড়ী বিকল্প

আমরা আজ এক নতুন ধরনের ‘বিনিয়োগ সাম্রাজ্যবাদ’ প্রত্যক্ষ করছি। বিদেশি গোষ্ঠীগুলো কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত তৈরি ও লাভজনক জেটিগুলোর দিকে হাত বাড়াচ্ছে। অথচ প্রকৃত বিনিয়োগ হওয়া উচিত ছিল মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বা বে-টার্মিনালে, যেখানে বড় ধরনের পুঁজি ও নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে চালু ও লাভজনক জেটিগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া কোনো বিনিয়োগ নয়, এটি মূলত জাতীয় সম্পদ দখলের নামান্তর।

উপসংহার : সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত সতর্কবাণী

ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা হলো, একটি বন্দর কখনোই শুধু বন্দর নয়, এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল ঢাল। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো যেভাবে কৌশলগত সামুদ্রিক সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, তা প্রমাণ করে যে একটি জাতির কাছে এগুলোই হলো তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা কখনোই হাতছাড়া করা উচিত নয়।

উচ্চ আদালত থেকে এনসিটি (NCT) সংক্রান্ত যে দিকনির্দেশনা আসার কথা রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলের গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, আজকের এই তথাকথিত ‘ইজারা’ আগামী দিনের জাতীয় সংকটের বীজ বপন করছে। আমাদের অবশ্যই স্বচ্ছতা দাবি করতে হবে, এনডিএ’র (NDA) গোপন চুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং এমন যেকোনো চুক্তি বাতিল করতে হবে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। আমরা যদি বিদেশি শিপিং লাইনের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর হারাই, তবে রাষ্ট্রের পরিচালনার চাবিকাঠিও আমাদের হাতে থাকবে না। আসুন, আমরা এমন এক প্রজন্ম হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত না হই, যারা তথাকথিত ‘দক্ষ ব্যবস্থাপনার’ দোহাই দিয়ে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বারটি অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিল। মনে রাখবেন, আমাদের সার্বভৌমত্ব কোনো ইজারা দেওয়ার বস্তু নয়।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি

স্মৃতির মণিকোঠায় বেগম জিয়া

ইন্ডিয়ান খোয়াব এবং ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’-এর সেই ডাক

খালেদা জিয়া : রাজনীতির এক মহাকাব্য

এ দেশে ‘ইংরেজী’ ‘নববর্ষ’

বাংলায় ‘ইংরেজী’ ‘নববর্ষ’

বিদায় ২০২৫: অগ্রাহ্য বিপ্লব আর জাতীয় চুনকাম কার্যক্রম

নিঃশেষে প্রাণ, যে করিল দান..., অনন্যা এক রাষ্ট্রনায়ক

খালেদা জিয়া : বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি

খালেদা জিয়া ও মর্যাদার রাজনীতি

ক্ষমা করবেন ম্যাডাম