২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭% পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস, তাই এই সিদ্ধান্ত একদিকে ব্যবসায়ী মহল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনিতেই, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর থেকে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা হারিয়েছে, ফলে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকে ইতোমধ্যেই ১৭% শুল্ক দিতে হচ্ছিল।
বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনে, বাংলাদেশ কেনে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার, ঘাটতি ৬ বিলিয়ন ডলার বা বেশি। ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের অর্থহীন উঁচু শুল্ক (ট্যারিফ ও নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার) কাঠামো যা কোনো পণ্যে ৩০-৫০%, দেশের শ্রম মানহীন আইন ও পরিবেশগত মেজার, বিভিন্ন সেক্টরের কমপ্লায়েন্স হীনতা, কপিরাইট ও পাইরেসি বাস্তবতা ইত্যাদি আলোচনায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
নেগোসিয়েশনে বসে, বাংলাদেশ আমদানি বৈচিত্রায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে ভারত থেকে গম, ভুট্টা ও তুলা, কৃষি পণ্য; ইন্দোনেশিয়া থেকে ভোজ্যতেল; ইউরোপ থেকে বিমান ও অস্ত্র; মধ্যপ্রাচ্য থেকে LNG ও জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোর্স করার ৫-১০ বছর মেয়াদি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে, ঐ দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কিছুটা কমে আসবে (যদিও বন্ধ হবে না), এবং এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। ফলে, এসব দেশের প্রভাববলয়ে থাকা ইন্টেলেকচুয়ালরাও বেশ সরব। পাশাপাশি যেসব ব্যবসায়ী এসব আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতো তারাও নাখোশ হয়েছে। পাশাপাশি, নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষর এবং বৈষম্যমূলক ধারা গুলোর জন্য স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রতিবাদও চলমান।
বর্তমান পরিস্থিতি
চুক্তি ও ট্যারিফের বর্তমান অবস্থা: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যে দুই স্তরে ৩৭% থেকে কমিয়ে ১৯% ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে (প্রধান প্রধান শিডিউল মেনে চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়ায় ২০%, চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পরে ১৯%), এবং মার্কিন তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার দিয়ে তৈরি RMG’তে শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে রায় দেয় যে IEEPA আইন প্রেসিডেন্টকে ট্যারিফ আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন Section 122-এর অধীনে ১০% ট্যারিফ আরোপ করে, কিন্তু ৭ মে ২০২৬-এ সেই ১০% ট্যারিফও Court of International Trade বাতিল করে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন তৃতীয় আইনি পথ খুঁজছে। অর্থাৎ চুক্তির মূল ভিত্তি ৩৭% ট্যারিফের ভয়, এখন আইনত বিদ্যমান নেই।
১৩১ বনাম ৬ শর্ত: এই অসাম্য কতটা বাস্তব?
৩২ পাতার চুক্তিতে shall শব্দটি ১৭৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে will মাত্র তিনবার। 'Bangladesh shall' ব্যবহৃত হয়েছে ১৩১ বার, আর 'US shall' মাত্র ছয়বার। বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা বেশি। নেগোসিয়েশন টিমের মতে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ট্রেড গ্যাপ বেশি, তাই তা কমাতে বাংলাদেশের উপর শর্তও বেশি। তুলনামূলকভাবে, ইন্দোনেশিয়ার চুক্তিতে 'Indonesia shall' ব্যবহৃত হয়েছে ২০০-রও বেশি বার, আর 'United States shall' মাত্র নয়বার যার অনুপাত ২২:১। এধরনের বৈষম্য, ট্রাম্প-যুগের সব ART চুক্তির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, শুধু বাংলাদেশের জন্য আলাদা নয়। তবে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শর্তগুলোর মান। কোনগুলো গ্রহণযোগ্য, কোনগুলো বাড়াবাড়ি, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার ভালোভাবে।
বাড়াবাড়ি শর্তগুলো কী কী?
ক. ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সবচেয়ে বিপজ্জনক
Article 4.1-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক কারণে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেবে, বাংলাদেশকেও ‘পরিপূরক নিষেধাজ্ঞা’ নিতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকা চীন বা রাশিয়াকে শাস্তি দিলে বাংলাদেশকেও সেই পথে হাঁটতে হবে, এমনকি যদি তা বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও যায়। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস; এই শর্ত মানলে রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ অবকাঠামো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমন চুক্তি আছে। কিন্তু একটি স্বল্প-আয়ের উন্নয়নশীল দেশের জন্য চরম অবিবেচক শর্ত। এই চুক্তি কার্যত বাংলাদেশকে চীন বা রাশিয়ার সাথে FTA করতে বাধা দেয়, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী।
খ. GMO শর্ত কৃষি সার্বভৌমত্বের হুমকি
Article 1.6-এ বলা হয়েছে ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত যেকোনো কৃষি বায়োটেকনোলজি পণ্য অর্থাৎ GMO নিজস্ব পূর্ব-বাজার পর্যালোচনা, লেবেলিং বা অনুমোদন ছাড়াই আমদানি ও বাজারজাতকরণের অনুমতি দিতে হবে। বাংলাদেশের ৮৩% গ্রামীণ পরিবার পশুপালনের সাথে যুক্ত, মার্কিন পশুখাদ্য শিল্পকে গত কয়েক দশকে USDA সরাসরি ৭২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে, ফলে এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আবার এটাও কথা, অনুমোদন দেওয়া মানেই আমদানি নয়। এসব পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা, স্বাদ ও ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদিও গুরুত্বপূর্ণ। তথাপি, বাজার খুলে দিলে স্থানীয় চাষী ও খামারিরা বিপদে পড়তে পারে।
গ. Boeing ক্রয় বাধ্যবাধকতা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে (বলা হচ্ছে পরামর্শ না করেই) ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ইতোমধ্যেই ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, যা ২০৩১-৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এতে এয়ারবাস থেকে কেনার চাপও বাড়বে, কেননা ইইউও বাংলাদেশের রপ্তানি গন্তব্য।
এটাও ঠিক বিমানের উড়োজাহাজ দরকার, জাহাজ না কিনলে এটি লোকসানেই থাকবে। আবার কারিগরি দক্ষতা, জনবল ও খরচের দিক থেকে দুটা ফ্লিট, বোয়িং ও এয়ারবাস প্যারালালি চালানো বিমানের জন্য লাক্সারি।
ঘ. RCEP-সংযুক্তির পথ বন্ধ
চুক্তিটি বাংলাদেশকে চীন বা রাশিয়ার সাথে নতুন ডিজিটাল বা বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধা দেয় এবং RCEP-এ যোগদানও জটিল করে তুলতে পারে, কারণ চীন RCEP-এর সদস্য।
ঙ. WTO-তে ভোটের অধিকার বিক্রি
বাংলাদেশকে ডিজিটাল পণ্যের উপর কাস্টমস ডিউটিতে স্থায়ী মোরেটোরিয়াম সমর্থন করতে হবে WTO-তে। এটি একটি বিতর্কিত বিষয় যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রাজস্বের উৎস হারানোর ভয়ে বিরোধিতা করে। একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বহুপাক্ষিক ভোটের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সার্বভৌমত্বের সীমা অতিক্রম করে বলে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে।
কোন শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য?
সব শর্তই ক্ষতিকর নয়, কিছু বাংলাদেশের নিজের সংস্কার এজেন্ডার সাথে মিলে যায়।
১। শ্রম আইন সংস্কার (ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজ করা, EPZ-এ শ্রম আইন প্রযোজ্য করা) বাংলাদেশের নিজেরই দরকার ছিল। রপ্তানি বাজার সুরক্ষায় শিল্পে শিশুশ্রম, চুক্তিবদ্ধ বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রম ইত্যাদিতে কমপ্লায়েন্স আনা জরুরি ছিল।
২। ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কিছু শর্ত যেমন সম্প্রচারে এনক্রিপশন কি হস্তান্তর বাধ্যবাধকতা বাতিল ঠিক আছে বলা যায়। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দিক থেকেও ইতিবাচক।
৩। পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ বিধিমালাও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪। চুক্তিটির নিজের এক্সিট ক্লজ এবং রি-নেগোসিয়েশন ক্লজ দুটাই আছে। এধরনের চুক্তিকে গড়পরতাভাবে দেখা যায় না। কারণ রিনেগোসিয়েশন উইন্ডো গুলো খোলা আছে। এটা তাই চিরস্থায়ী আত্মসমর্পণও নয়।
মালয়েশিয়া যা করেছে:
১৫ মার্চ ২০২৬-এ মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি ঘোষণা করেন যে মার্কিন-মালয়েশিয়া ART চুক্তি এখন ‘null and void’। যদিও পরে এই অবস্থান কিছুটা নরম হয়েছে, কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে রিনেগোসিয়েশনের জন্য চাপ দেওয়া সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়া যা দেয়নি:
ইন্দোনেশিয়া ৯৯% মার্কিন পণ্যে শুল্ক তুলে দিয়েছে এবং $৩৩ বিলিয়নের ক্রয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া ফ্রিপোর্ট-ম্যাকমোরানের মাধ্যমে Grasberg খনির লাইসেন্স রক্ষা করেছে যেখান থেকে বার্ষিক $১০ বিলিয়ন রাজস্ব আসবে। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়া বড় ছাড় দিয়েও কৌশলগত খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশও এই কৌশল নিতে পারে। ইন্দোনেশিয়া Halal সার্টিফিকেশনে আংশিক নমনীয়তা দেখিয়েছে। বাংলাদেশও GMO লেবেলিং ও প্রি-মার্কেট রিভিউতে নিজস্ব মান বজায় রেখে একটি পৃথক প্রোটোকল আলোচনা করতে পারে। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ডস গুলো ঠিকঠাক নাই।
চিন ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও সার আমদানিকে সকল মার্কিন শর্তের বাইরে রাখতে পুনরায় আলোচনা শুরু করতে পারে।
ভিয়েনা কনভেনশনের আইনি ভিত্তি:
ভিয়েনা কনভেনশনের Article 62-এ বলা আছে যখন কোনো চুক্তির মূল ভিত্তিগত পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে এবং সেটি প্রত্যাশিত ছিল না, তখন একটি দেশ চুক্তি থেকে বের হওয়ার বা পুনরায় আলোচনার দাবি রাখে। IEEPA ট্যারিফ বাতিলের পর এই আইনি ভিত্তি বাংলাদেশের হাতে রয়েছে।
কৃষি ও মৎস্য:
GMO শর্তে একটি পাল্টা প্রস্তাব হতে পারে 'science-based framework' মেনে নিয়েও নিজস্ব independent safety review-এর অধিকার এবং GMO লেবেলিং-এর অধিকার ধরে রাখা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরের পর বছর ধরে এই অবস্থান ধরে রেখেছে।
WTO মৎস্য ভর্তুকি চুক্তি থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য Article 12 বিশেষ ছাড় ছিল, বাংলাদেশ এই ছাড় ছাড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এটি পুনরায় দাবি করার যুক্তিযুক্ত ভিত্তি আছে।
ডিজিটাল ট্রেড:
১। ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপের অধিকার ধরে রাখা দরকার, এটি ভবিষ্যতের রাজস্বের উৎস। অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলো এই অবস্থান বহাল রেখেছে। বাংলাদেশও WTO ডিজিটাল মোরেটোরিয়ামে স্বয়ংক্রিয় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার দাবি করতে পারে।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের নতুন ডেটা প্রটেকশন আইনে ডেটা প্রসেসিং এ লভ্যাংশের উপর ভ্যাট ও করারোপ করার বিধান আছে।
২। প্ল্যাটফর্ম গুলোর Data localization বিরোধী কিছু দাবির প্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন থেকে ক্রিটিক্যাল সেক্টরে সিঙ্ক্রোনাস লোকাল ব্যাকাপ, ডেটা ডিকশনারি জানানো, সিকিউরিটি প্রটোকল শেয়ার করা, ডেটা ব্রিচ ডিক্লারেশন ইত্যাদি সভারেন্টি মেকানিজম ও প্রটেকশন তুলে দিয়েছে। কিন্তু নাগরিকের সংবেদনশীল ডেটার স্থানীয় ব্যাকআপের বাধ্যবাধকতা রাখার অধিকার বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই দরকার। এতে কোনো সেক্টর হঠাৎ প্যারালাইজড হবার ঝুঁকি থাকবে না।
বিএনপি সরকার এখন কী করবে?
১. চুক্তি বাতিল নয়,পুনরায় কৌশলী আলোচনা শুরু
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মিলিয়ে সরকারের হাতে এখন নতুন bargaining leverage আছে। নির্বাচিত সরকার ভয়ে চুপ করে থাকবে, এমন কিছুর দরকার নাই। চুক্তির Article 6.2 পুনরায় আলোচনার সুযোগ দেয়, Article 6.5 বের হওয়ার সুযোগ দেয়। ৬.২ ধারা ব্যবহার করে নতুন আলোচনায় যেতে হবে।
২. পুনরায় আলোচনার জন্য অগ্রাধিকার তালিকা:
সবচেয়ে জরুরি হলো Article 4.1-এর ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সংশোধন, GMO-তে লেবেলিং ও স্বাধীন পর্যালোচনার অধিকার পুনরুদ্ধার, Boeing ক্রয় এবং আপরাপর আমদানির শর্ত কিছুটা শিথিল করে টার্গেট ইয়ার স্প্রেড বাড়িয়ে দেয়া, এবং RCEP-যোগদানের পথ খোলা রাখা এবং ডিজিটাল ট্রেড সভারেন্টি অক্ষুণ্ন রাখা।
৩. US cotton RMG শূন্য শুল্কের সুবিধা অবিলম্বে নেওয়া
চুক্তির এই বাস্তব সুবিধাটি নষ্ট করা ঠিক হবে না। সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠন করে মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়িয়ে শূন্য শুল্কের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
৪. বিশেষজ্ঞ নেগোশিয়েটিং টিম গঠন
আন্তর্জাতিক ট্রেড নেগোশিয়েটর, আইনজীবী ও স্বীকৃত অর্থনীতিবিদের নিয়ে পরবর্তী রাউন্ডের নেগোসিয়েশনের জন্য এক্সপার্ট পুল তৈরি করা।
সারসংক্ষেপে চুক্তিটি সংকটের মুহূর্তে দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনার ফলাফল। RMG খাতের জন্য ১৯% ট্যারিফ এবং US cotton শূন্য শুল্ক বাস্তব সুফল। কিন্তু ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, GMO চাপানো, উচ্চাভিলাষী আমদানির চাপ, এবং নির্বাচনের তিন দিন আগে স্বাক্ষর, এগুলো গুরুতর ত্রুটি। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত মিলিয়ে BNP সরকারের কাছে এখন পুনরায় আলোচনার একটি বাস্তব সুযোগ আছে, যদি না তারা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ালে ভারত সহ কোনো বিশেষ দেশে থেকে আমদানি কমে যাবে, এজন্য চুক্তির বিরোধীতা নয় বরং আমদানির যৌক্তিক বহুমুখীকরণ করাই শ্রেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ট্রাম্প রিসিপ্রোকাল ট্র্যারিফ নেগোসিয়েশন সহজ ছিল না, বিএনপির জন্যও তা সহজ না। কঠিন কাজটি ধর্তব্যে রেখেই সম্পাদন করতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ্যই মূখ্য।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক।