গত ২৩ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের এক ফাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ভুয়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছিল; কিন্তু বিশ্ব তার এসব দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি! ড. ইউনূস বলেন, এর জন্য পুরো বিশ্ব দায়ী। হাসিনা তার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায়ই দম্ভভরে বলতেন, ‘আমাদের প্রবৃদ্ধির হার অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে।’ আসলে এটা ছিল একেবারেই ভুয়া প্রবৃদ্ধির হার ও উন্নয়ন।
আমরা জানি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো সমস্যা সমাধানের সঠিক ও সর্বোত্তম উপায় নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্তকে নির্ভরযোগ্য করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্যের প্রয়োজন হয়। তথ্য-উপাত্তের বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলে তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়; তবে যে ধরনের তথ্যই হোক সেটা হতে হবে নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবসম্মত।
কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ করা হচ্ছিল। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরও দেশে আশানুরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় অর্থনীতির মূল সূচকগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল। ২০১৪ সালে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিসংখ্যান বিভ্রাট আরো প্রকট হয়। মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পাঁচ-ছয়জনের একটি সিন্ডিকেট। তখন অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বানোয়াটভাবে দেখানোর অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও পরিসংখ্যানগত পার্থক্য বাড়তে থাকে। এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়ে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেই কেবল সাড়ে তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হয়েছিল। এসব বানোয়াট তথ্য প্রদানের প্রধান কারিগর হিসেবে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী লোটাস কামাল ওরফে মুস্তফা কামালকে মনে করা হয়। তিনি পরিসংখ্যানের তথ্য বিকৃতি ঘটিয়ে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় রচনা করেছিলেন, যা কেবল বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক ইতিহাসেও বিরল ঘটনা!
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে ধারাবাহিকভাবে বানোয়াট প্রবৃদ্ধি দেখানো হতো, সামষ্টিক তথ্যের সঙ্গে যার কোনো মিল ছিল না। মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনে বিকৃত ও বানোয়াট পরিসংখ্যান সরবরাহ করা হয়। এসব ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণের কারণেই দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে এসব শুভঙ্করের ফাঁকি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
জানা যায়, বিশ্বব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যানগত পারফরম্যান্স বিবেচনায় স্কোর প্রকাশ করে থাকে। ২৫টি সূচক বিবেচনায় এমন তালিকা তৈরি হয়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ছিল একশর মধ্যে ৮০। কিন্তু এর পর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৮ সালে সে স্কোর দ্রুত হ্রাস পেয়ে ৬২-তে নেমে যায়। ২০২০ সালে নেমে আসে ৬০-এ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোর ছিল ৬৯। সে সময় বাংলাদেশ মেথডোলজি বা পদ্ধতিগত সূচকে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়ে এবং এক্ষেত্রে বিকৃতি ও বানোয়াট পরিসংখ্যান তথ্য তৈরি ও সরবরাহের কারণে ২০১৪ সালের ৭০ স্কোর থেকে ২০২০ সালে তা অর্ধেকের বেশি কমে ৩০-এ নেমে আসে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের সব ধরনের সরকারি পরিসংখ্যান তৈরি ও প্রকাশ করে থাকে। লোটাস কামাল এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিবিএসে নিজের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সময় সংস্থাটির মাধ্যমে নিয়মিত মাসিক মূল্যস্ফীতি প্রকাশের দায়িত্বও নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরবর্তী সময়ে বিবিএসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিপিআই শাখায় পদায়ন করা হয় তার অনুগত ও আশীর্বাদপ্রাপ্তদের। বিবিএসের বর্তমান ও সাবেক পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানটিতে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। পরিসংখ্যান নিয়ে কেউ ন্যূনতম আপত্তি তুললে বা কথা বলার চেষ্টা করলে ঢাকার বাইরে বা কম গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হতো। এমনকি বিনা কারণে হয়রানির জন্য বিভাগীয় মামলাও করা হতো।
ওই সময়ে বিবিএসের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির তথ্যগত পার্থক্য বেড়েই চলছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও লোটাস কামাল ওই বছরের এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হবে বলে দাবি করেন। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এডিবির পক্ষ থেকেও সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা হয়। এতে লোটাস কামাল ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্বব্যাংকের তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করে সংবাদ সম্মেলন করেন।
দেশকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে প্রতিটি সেক্টরে নির্ভুল ও সময়ানুগ পরিসংখ্যানের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সব খাতে পরিসংখ্যানের প্রয়োগ বৃদ্ধি পেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি আরও বাড়বে। সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যান টেকসই উন্নয়ন-পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভিত্তি হিসাবে কাজ করে এবং আমাদের পরিবর্তিত বিশ্বকে বুঝতে সাহায্য করে।
পরিসংখ্যানের গুরুত্ব স্থান ও কালভেদে সবসময়ই ছিল এবং এখন আরও বেড়েছে। কারণ দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। তাছাড়া জাতির উন্নয়ন আর অগ্রগতি যা-ই বলেন, সবকিছুর সঙ্গেই পরিসংখ্যানের তথ্য জড়িত। মানুষের সুষম উন্নয়নের জন্যও পরিকল্পনার প্রয়োজন। এখন বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যানের দিক বিবেচনা করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া প্রয়োজন।
পরিসংখ্যানবিদদের মতে, সব খাতে নির্ভুল পরিসংখ্যানের তথ্য প্রয়োগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়। পরিসংখ্যান উন্নয়ন ও অগ্রগতির পরিমাপক। আর্থ-সামাজিক সব কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত সঠিক পরিসংখ্যানই কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বশর্ত। অর্থনৈতিক, জনমিতিক, সামাজিক- সব ক্ষেত্রে পরিমাণগত ও গুণগত পরিমাপে পরিসংখ্যানের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান বিশ্বে সরকারি-বেসরকারি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সঠিক ও সময়োচিত পরিসংখ্যানের ব্যবহার অপরিহার্য।
দেশের বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান নিয়ে পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ জিয়া হাসান ২০২২ সালে ‘উন্নয়নবিভ্রম এক দশকের অর্থনীতির না বলা ইতিহাস’ শীর্ষক বই লেখেন। প্রবাসী এ লেখক বইটিতে পদ্ধতিগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে সরকারি পরিসংখ্যানের অসারতা তুলে ধরেন।
পরিসংখ্যানগত কারসাজি নিয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা ছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল দেশের পরিসংখ্যান। তাই সুনিপুণভাবে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও ম্যাক্রোর ডেটার সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না। প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ার কথা। কিন্তু শিল্পে প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি দেখানো হয়েছিল কৃষিতে। আবার কর্মসংস্থান না বাড়লে শিল্প ব্যাপক মেকানাইজেশন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটাও আমরা সেভাবে দেখিনি।’
তথ্যবিকৃতির পরিণাম সম্পর্কে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটা চোখ বন্ধ করে গাড়ি চালানো কিংবা অন্ধের হাতি দর্শনের মতো ঘটনা। কীসের ভিত্তিতে দেশ চলবে, তা বলে দেয় পরিসংখ্যান। কিন্তু ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করলে দেশকে কোথাও না কোথাও ধাক্কা খেতে হবে, যেমনটা এখন দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া রাজস্ব ও রপ্তানিসহ সব পরিসংখ্যানের মধ্যেই দূষণ ধরা পড়ছে। ভবিষ্যতে পরিসংখ্যানের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। একইসঙ্গে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জোয়ার দেখানো দুষ্টচক্রের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও কলাম লেখক