শিক্ষা হলো সভ্যতার ভিত্তি। আর উপমহাদেশে শিক্ষার প্রথম আলো ছড়িয়েছিল মাদরাসা থেকেই। এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতিকে আলোকিত করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলা, নিপীড়ন এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছে মাদরাসাশিক্ষা।
যারা শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলে মুখে ফেনা তোলেন, তারা কি জানেন মাদরাসাশিক্ষা থেকেই এই উপমহাদেশে শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল? মাদরাসাশিক্ষা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বছরের পর বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে। কিন্তু এই অবহেলা এবং বৈষম্যের ইতিহাস কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকারের সৃষ্টি নয়; এটি বিগত ৫০ বছরের প্রতিটি সরকার এবং শাসকের ব্যর্থতার ফল। মাদরাসাশিক্ষার প্রতি এই অবিচার এবং বৈষম্যের ইতিহাসকে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। কারণ একটি জাতির উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থা সমান গুরুত্ব পাবে।
আজ যখন মাদরাসাশিক্ষকরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তখন কিছু মানুষ বিগত ১৭ বছরের উদাহরণ টেনে তাদের আন্দোলনকে ঠুনকো প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। তারা ভুলে গেছেন, এই ১৭ বছর দূরের কথা, বিগত ৫০ বছরেও মাদরাসাশিক্ষার প্রতি কেউ সুবিচার করেনি। বরং শিক্ষকদের কণ্ঠরোধ, তাদের ন্যায্য দাবিকে অগ্রাহ্য এবং তাদের মর্যাদাকে পদদলিত করা হয়েছে।
মাদরাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি উপমহাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অংশ। এই প্রতিষ্ঠানে থেকে শিক্ষার যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তা একসময় বিশ্বকে জ্ঞান ও ন্যায়ের আলো দেখিয়েছিল। অথচ আজ সেই মাদরাসাশিক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলার চরম সীমায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫,৯৯৯ হলেও, মাত্র ১৫০০ ইবতেদায়ি মাদরাসার একটিও সরকারি করা হয়নি।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩৩৩টি হলেও, একটি দাখিল মাদরাসাও সরকারি করা হয়নি। সরকারি কলেজ সংখ্যা ৭০১, কিন্তু সরকারি কামিল মাদরাসা মাত্র তিনটি। এসব ব্যবধান কি আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার পরিচয় বহন করে?
যারা কথায় কথায় বিগত ১৭ বছরের উদাহরণ টানেন, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, এ সময় অন্তত ১৭ বার মাদরাসাশিক্ষকরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। তাদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে নানা অজুহাতে আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে। এখন যারা সমালোচনা করছেন, তারা তখন এই শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করেননি।
সম্প্রতি মাদরাসাশিক্ষকদের ওপর নৃশংস হামলা এবং একজন শিক্ষকের হত্যাকাণ্ড জাতি হিসেবে আমাদের চরম লজ্জার বিষয়। আদর্শিক জাতি গঠনের কারিগরদের প্রতি এমন আচরণ সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। যারা এ হামলার পক্ষে সাফাই গাইছেন, তারা ভুলে গেছেন, এই শিক্ষকরা শুধু নিজেদের অধিকার নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যও আওয়াজ তুলেছেন। তারা কি একবারও ভেবে দেখেন, এই বৈষম্য ও নির্যাতন শুধু শিক্ষকদের নয়, পুরো জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত হানছে? জাতি গড়ার কারিগরদের প্রতি এমন নৃশংস আচরণ কি সভ্যসমাজে মানায়?
যারা মাদরাসা শিক্ষকদের আন্দোলনকে ঠুনকো বলে অপমান করেন, তাদের জানা উচিত, মাদরাসাশিক্ষকরা শুধু নিজেদের অধিকারের জন্য নয়, বরং শিক্ষার মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করছেন। আর যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন, তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
মাদরাসাশিক্ষার প্রতি বৈষম্য শুধু বর্তমান সরকারের সময়েই নয়, বরং অতীতের সব সরকার ও শাসনামলের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকার কিংবা স্বৈরশাসক মাদরাসাশিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নে আন্তরিক ছিলেন না। মাদরাসাশিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা এবং বেতন-ভাতার মতো মৌলিক দাবিগুলো কখনোই গুরুত্ব পায়নি।
স্বাধীনতার পর থেকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা সবসময়ই অবহেলার শিকার। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি ইবতেদায়ি মাদরাসার সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। মাধ্যমিক পর্যায়ে কোনো দাখিল মাদরাসা সরকারি করা হয়নি। উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও মাদরাসাশিক্ষার উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এত বছরেও কেউ মাদরাসাশিক্ষার প্রতি সুবিচার করেনি। অথচ আজ যখন শিক্ষকরা ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন, তখন কিছু মানুষ তাদের আন্দোলনকে ঠুনকো বলে উপস্থাপন করতে চান।
যারা মাদরাসাশিক্ষকদের ন্যায্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের মনে রাখা উচিত, মাদরাসাশিক্ষকরা জাতি গঠনের কারিগর। তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। মাদরাসাশিক্ষার প্রতি বৈষম্য শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে নয়, বরং দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলার শামিল। শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়া মানবতার চরম অপমান।
মাদরাসাশিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের বৈষম্য এখনই দূর করতে হবে। মাদরাসাশিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে স্বকীয়তা বজায় রেখে একটি ন্যায়সংগত এবং আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলা উচিত। ১. মাদরাসাশিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সরকারি সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ২. মাদরাসাশিক্ষকদের ন্যায্য বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. মাদরাসাশিক্ষার আধুনিকায়ন এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।
মাদরাসাশিক্ষকদের ন্যায্য দাবি অবজ্ঞা করা এবং তাদের আন্দোলনকে ঠুনকো হিসেবে উপস্থাপন করা শুধু অমানবিক নয়, এটি আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটি দুর্বলতাও প্রকাশ করে। এখন সময় এসেছে বৈষম্য দূর করে একটি সুষম, আধুনিক এবং ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার। যারা মাদরাসাশিক্ষার প্রতি বৈষম্য এবং শিক্ষকদের প্রতি অন্যায়কে সমর্থন করেন, তাদের লজ্জা হওয়া উচিত। কারণ এই বৈষম্য শুধু শিক্ষকদেরই নয়, আমাদের জাতীয় উন্নয়নের পথকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
লেখক : এমফিল গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া