হোম > মতামত

চক্রের ফাঁদে পড়েছে চীন আর ভারত

তানসেন সেন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগস্টে চীন সফর করেছেন। সফরের পর দিল্লি আবার চীনা নাগরিকদের ভিসা দেওয়া শুরু করেছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইটও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো ভারত-চীন সম্পর্কের আরেকটি ধাপ শুরু করেছে। এই ধারাটার বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আশা আর সংঘাতের মধ্যে এর ওঠানামা হয়। বহু বছর ধরেই এটা অনেক দূরে চলে গেছে। নতুন যে চক্রটা শুরু হলো, সেটাও সম্ভবত একইভাবে শেষ হবে। সীমান্তে সংঘাত অথবা আলোচনার টেবিলে সমস্যা দেখা যাবে। সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য উভয় পক্ষেরই একটা ভালো উপায় বের করা দরকার। পরস্পরের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জায়গাটা তাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। তা না হলে, এই চক্রটা ঘুরতেই থাকবে। এশিয়ার দুটো বৃহত্তম দেশকে এটা উত্থান আর পতনের ফাঁদে আটকে ফেলবে।

সীমান্ত বিবাদের মীমাংসা হয়নি। হিমালয় অঞ্চলের তিনটি জায়গায় সমস্যা রয়েছে। দুই দেশের উত্তেজনার এটাই সবচেয়ে বড় কারণ। তিব্বত আরেকটি বড় সমস্যা। দালাইলামার ভূমিকা এবং তারপর কে এই পদে আসবে, সেটা নিয়েও উত্তেজনা রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও চীন একটা জটিল ত্রিভুজ গড়ে তুলেছে। এতে অবিশ্বাস আরো গভীর হয়েছে। চীন ও ভারতে জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। ফলে পঞ্চশিল চুক্তি ফিরিয়ে আনাটা কঠিন হয়ে গেছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সেখানে পাঁচটি নিয়মের কথা বলা হয়েছিল। ৭০ বছরেরও আগে ভারত আর চীন এই চুক্তিতে সই করেছিল।

১৯৬২ সালে চীন আর ভারতের সীমান্ত যুদ্ধের মাধ্যমে চুক্তিটি ভেঙে যায়। এরপর থেকে দুই দেশ সত্যিকারের আস্থা নির্মাণে কঠিন সমস্যার মুখে পড়ে গেছে। প্রত্যেকবার যখনই মনে হয় যে অগ্রগতি হচ্ছে, তখনই সেটা ভেঙে পড়ে। সীমান্ত আলোচনায় যেমন এই সমস্যা হয়, তেমনি পারস্পরিক আত্মবিশ্বাস নির্মাণের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। অধিক বাণিজ্য বা নেতাদের যৌথ ছবিগুলো নিয়েও সমস্যা নয়। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভয়াবহ লড়াইয়ের আগে ২০১৭ সালে দোকলামে একটা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে সুনডোরোং চু এলাকায় সমস্যা হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনায় এই চক্রের আরেকটি অংশ। একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয় লড়াই দিয়ে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারির জন্য প্রচুর অর্থব্যয় ও প্রাণক্ষয় হয়। এই ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি সম্পর্কের যে সামান্য উন্নতি হয়েছে, তা সত্ত্বেও এই ব্যয় বাড়তেই থাকবে।

গালওয়ানের ঘটনার পরের বছরগুলোয় কোনো আলোচনা হয়নি। এ ঘটনা সমস্যাটাকে আবার সামনে এনেছে। আলোচনা ও ছাড় দেওয়ার জন্য সত্যিকারের চেষ্টা না থাকলে এই চক্রের আরো অবনতি হবে। লড়াই আর দুর্বল শান্তি এই দুইয়ের মধ্যে পরিস্থিতি ওঠানামা করবে। যতক্ষণ না দুই দেশ শুধু প্রতিদিনের সীমান্ত ইস্যুগুলো সমাধানের চেষ্টা বাদ দিয়ে আরো সক্রিয় হবে, ততদিন এ সমস্যা চলতেই থাকবে। সীমান্ত নিয়ে তাদের এমন একটা চুক্তিতে আসতে হবে, যে ব্যাপারে দুই দেশই একমত হবে। সেটা হলে এই চক্রটা চিরদিনের জন্য বন্ধ হবে। নতুন করে তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।

ভারত আর চীন এটা নিয়ে যেভাবে আলোচনা করছে, সেই ধরনটা বদলানোর এখন সময় এসেছে। বহু বছর ধরে তারা এই ধারায় আলোচনা করে আসছে। কিন্তু স্বল্পকালীন শান্তি ছাড়া সেখানে কিছু অর্জিত হয়নি। এই আলোচনাগুলোও এই চক্রেরই অংশ। সেখানে একটা বড় পরিবর্তন দরকার। সম্ভবত তৃতীয় কোনো পক্ষকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। কোনো পক্ষই হয়তো বাইরের সাহায্য নিতে চাইবে না। কিন্তু এটা দরকার হতে পারে। নিজ থেকে ছাড় দিয়ে কোনো সরকারই দেশের মধ্যে সমস্যায় পড়তে চায় না। কিন্তু ছাড় দেওয়াটাই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর, বার্টান্ড রাসেলের পিস ফাউন্ডেশন সাহায্যের চেষ্টা করেছিল। তারা ভারতের জওহরলাল নেহরু এবং চীনের ঝাউ এনলাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিল। তাদের চেষ্টা অবশ্য ব্যর্থ হয়। যারা সাহায্য করতে চেয়েছিল, তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল না। এখন নিরপেক্ষ কোনো দেশ দরকার। এই প্রক্রিয়ায় কোনো সামরিক লক্ষ্য রাখা যাবে না। ভারত আর চীন দুই দেশের জনগণের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য হতে হবে। সিঙ্গাপুর এই মধ্যস্থতা করতে পারে। দেশ হিসেবে তারা ছোট হলেও বিশ্বস্ত। এশিয়ার ভূরাজনীতি ক্রমেই আরো জটিল হচ্ছে। মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এলে এটা আবার অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় পক্ষের কথা ভাবার আগে ভারত আর চীনকে অবশ্যই নিজেদের মধ্যে আস্থা গড়তে হবে। তাদের সত্যিকারের পদক্ষেপ নিতে হবে। চীনেরই এ ক্ষেত্রে আগে এগিয়ে আসা উচিত। ১৯৬২ সালের যুদ্ধ ভারতের ওপর বড় ক্ষত রেখে গেছে। অনেকেই এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে থাকে। এই অনুভূতি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি সংঘাত এই ক্ষতকে আরো গভীর করছে। শান্তিকে আরো কঠিন করে তুলছে। এটা সারানোর জন্য বেইজিং সাহায্য করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের যে আকাঙ্ক্ষা, চীন সেখানে সমর্থন দিতে পারে। ভারতের এই লক্ষ্য বহু দিনের। নেহরু যেমনটা করেছিলেন, এটা হবে সেই ধরনের পদক্ষেপ। এমনকি ১৯৬২ সালের পরও তিনি কাউন্সিলে চীনের অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইতিহাসকে সম্মান জানানো হবে। সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ জানানো হবে। দুই দেশের মধ্যে যে সন্দেহ আছে, সেটা তখন আস্থায় রূপ নিতে পারে।

ভারতকেও অনাস্থা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। চীনা পর্যটক, স্কলার আর ব্যবসায়ীদের আসার সুযোগ দিতে হবে। বহু বছর ধরেই চীনা নাগরিকদের ভারতের ভিসা পেতে সমস্যা হচ্ছে। চীনা কোম্পানিগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। নেতারা মাঝেমধ্যে দুটো সভ্যতার পুরোনো সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু চীনা পর্যটক আর বিনিয়োগকারীদের তার বিপরীত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এভাবে সত্যিকারের আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে পারে না। সীমান্তের অগ্রগতির জন্য একটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দরকার। জনগণ, ধারণা এবং বাণিজ্যের মধ্যে আবার সংযোগ ঘটাতে হবে। সন্দেহের চক্র থেকে বের হওয়ার এটাই আসল চাবিকাঠি।

এখন বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটছে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আর নীতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছে। ভারত আর চীন হয়তো এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। শুল্ক আসছে এখন নানাভাবে। দুই দেশের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি আগে থেকে অনুমান করাটা কঠিন। বহুপক্ষীয় গ্রুপগুলো আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এশিয়ার পরিকল্পনাও তাই বদলে গেছে। নয়াদিল্লি আর বেইজিংকে এখন শুধু একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে চলবে না। একটা উন্নত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার জন্য তারা এটাকে কাজে লাগাতে পারে। এই সম্পর্কটা আরো পরিপক্ব ও বাস্তবমুখী হওয়া উচিত। উভয় পক্ষেরই যাতে এখানে উপকার হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি আর শান্তি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করলে হয়তো উপকার হবে। সীমান্ত ইস্যু এর মাধ্যমে সমাধান হতে পারে। বাইরের সাহায্য নিয়ে অথবা না নিয়েও এই সমাধান হওয়া সম্ভব।

ভারত-চীন সম্পর্কের যে চক্র, সেটা ভাঙার জন্য শুধু আলোচনা বা হ্যান্ডশেক করলে চলবে না। এ জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রত্যেক পক্ষকেই সত্যিকারের বিশ্বাস দেখাতে হবে। দেশের ভেতরের সন্দেহের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড়াতে হবে। চীন ভারতের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করতে পারে। ভারত চীনের জনগণ ও ফার্মগুলোর জন্য দরজা খুলে দিতে পারে। রাজনীতি সৃজনশীল হলেই শুধু সন্দেহকে আলোচনায় রূপ দেওয়া সম্ভব। তা না হলে তারা একই পুরোনো বৃত্তে ঘুরপাক খাবে। একবার আশা, আরেকবার ঘৃণার মধ্যে ঘুরতে থাকবে। এই একই চক্র বারবার পুনরাবৃত্তি করে যাওয়া কোনো দেশের জন্যই ভালো হতে পারে না।

ফরেন পলিসি অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার

স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে কিছু প্রস্তাব

আসল বাউল নকল বাউল

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শঙ্কা

মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির প্রভাব

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে রাখতে চায়?

বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

প্রকৌশলীদের গল্প ও ঈশপের কাক

ভারতে সাংবাদিকতার নামে সন্ত্রাস

দেশরক্ষায় বিজিবি

ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা