হোম > মতামত

আমাদের স্মৃতিভ্রম এবং ফ্যাসিবাদের ফেরার ঝুঁকি

ফজলে মিনহাজ

ফাইল ছবি

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘ভুলে যাওয়া’ যেন এক অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। একটা দমন-পীড়ন, এক ধরনের গণআন্দোলন, কিংবা কোনো জাতীয় ক্ষত—কিছুদিন আলোচনায় থাকে, তারপর নতুন ইস্যু এসে সেটিকে আড়াল করে দেয়। ফলে আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কোনো শিক্ষা দিতে পারি না, বরং ইতিহাসকে খণ্ডিত করে ফেলি। এভাবে চলতে চলতে একটি জাতি নিজের অস্তিত্ববোধই হারিয়ে ফেলে।

ভুলে যাওয়া প্রসঙ্গে অতীতের কিছু বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল, আমরা কি মনে রেখেছি? শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পেয়েছি, হিসাব খুললে সাদা পাতাই চোখে পড়ে। কিন্তু দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এতটাই উদার যে তালিকা দীর্ঘ হয়ে যায়। বেরুবাড়ি, ফারাক্কা বাঁধ, সিলেট সীমান্তের জমি দখল, ট্রানজিটের নামে করিডর, ট্রানশিপমেন্টের আড়ালে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ—সবই ভারতের পক্ষে গেছে। তিন বিঘা করিডর দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ভারত আমাদের বেরুবাড়ি নিয়ে নিল আর আমরা খালি হাতে ফিরলাম।

ফারাক্কা বাঁধের নামে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করা হলো—আমরা চুপ করে রইলাম। সিলেট সীমান্তে ভূমি দখল হয়ে গেল—আমরা প্রতিবেশীর ‘জায়গার অভাব’ বুঝে মেনে নিলাম। টিপাইমুখ বাঁধের বিপদ শিশুরাও বুঝেছিল, কিন্তু আমাদের কর্তারা সেখানে ‘রেইনি ট্যুর’ করে এসে মহাউক্তি ছাড়লেনÑ‘কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হচ্ছে না’।

সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো—তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বাস দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা কিছুই পেলাম না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করলেন আর আমাদের তৎকালীন মন্ত্রীরা ‘অধিকার’কে বিসর্জন দিয়ে ‘আবদার’ পূরণে খুশি থাকলেন।

আজ প্রশ্ন জাগে—জনগণের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কেন ভারতের সঙ্গে আওয়ামী আমলে করা সব চুক্তি জাতির সামনে প্রকাশ করছে না? কেন তারা এ বিষয়ে অপারগতা দেখাচ্ছে?

শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়—আমরা ভুলতে বসেছি ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতনের দিনগুলোও। গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, গণমাধ্যম দমন, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসÑসবই আমরা চোখের সামনে দেখেছি। অথচ আজকের দিনে এসে যেন সেসব নিয়ে আলোচনা করারও প্রয়োজন অনুভব করছি না। মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে বসেছে ফ্যাসিবাদী সব নিপীড়ন। নইলে কেন এই এক বছরে আমরা অতীতের দমন-পীড়নের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছি না? কেন আমরা আগামী দিনের নতুন ধারার বাংলাদেশ গঠনে একসঙ্গে, ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না?

আমরা ভুলতে বসেছি আওয়ামী লীগের পতনের পরে ৫-৮ আগস্টের দিনগুলো, যখন কোনো সরকার ছিল না, জনগণই অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় ছিল। আমরা ভুলতে বসেছি—কীভাবে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের তাদের সেবাদাসে পরিণত করেছিল। আর সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আমরা কোনো গভীর পর্যালোচনা করছি না ফ্যাসিবাদের দিনগুলোর ওপর এবং পতিত সরকারের সেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ওপর।

রাজনৈতিক দলগুলোয় আজ ঐক্য নেই। নেই জুলাই ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন। নেই জুলাই সনদেরও অগ্রগতি। স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এখনো তাদের শেকড় উৎপাটন করা যায়নি। এখনো তাদের ঝটিকা মিছিলসহ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা দমন করা যায়নি। বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ও পাঁচ তারকা হোটেলে তারা দেশকে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার কূটকৌশল আঁকছে।

কিছুদিন আগে একটা সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, দিল্লিতে পলাতক বাংলাদেশের স্বৈরাচারের মহারানিকে এস আলম গ্রুপ আড়াই হাজার কোটি টাকা দিয়েছে শুধু নির্বাচন বানচাল ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের জন্য। তারপরই শুরু হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হামলা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডবলীলা। সবই কার্যত মনে হচ্ছে সেই আড়াই হাজার কোটি টাকার খেল।

ফলে যে অন্যায়, যে বিশ্বাসঘাতকতা, যে দমন-পীড়ন আমাদের ওপর চাপানো হয়েছিল—সব আবার ফেরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমরা যদি এই ভোলাভাব কাটিয়ে না উঠি, যদি ফ্যাসিবাদের শাসন এবং ভারতের সঙ্গে করা অন্যায্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ হিসাব জাতির সামনে না আনি, তবে আবার আমরা একই ফাঁদে পড়ব।

আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আবার ভুলে যাব? নাকি এবার ইতিহাস আঁকড়ে ধরে নতুন ধারার বাংলাদেশ গড়তে পারব?

লেখক : রাজনীতি পর্যবেক্ষক

fajlayminhaz@gmail.com

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত