হোম > মতামত

তুরস্ক-পাকিস্তান সহযোগিতা বাড়ছে ভারত মহাসাগরেও

ইশাল জেহরা

ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ইসলামাবাদের সঙ্গে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তুরস্কের কোম্পানি টার্কিশ পেট্রোলিয়াম (টিপিএও)। এগুলোর মধ্যে তিনটি অফশোর বা সাগরে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক জলসীমার তিনটি ব্লকে এবং দুটি অনশোর বা সাগরের উপকূলবর্তী দুটি ব্লকে অনুসন্ধানকাজ চালাবে তুর্কি প্রতিষ্ঠানটি। ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের এই চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে সেভাবে না এলেও পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয় দেশের জন্যই এই চুক্তি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস ও ইন্দোনেশিয়ার পের্টামিনার পর পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এই খাতে তুরস্কের আরো এগিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সামনে নতুন কিছু সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করে দিচ্ছে পাকিস্তান। এগুলোর মধ্যে শুধু ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনাই নয়, বরং ভারত মহাসাগরে তুরস্কের উপস্থিতি, নৌ মহড়ার সুযোগ, জাহাজ নির্মাণ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতির মাধ্যমে তুরস্কের আরো সক্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

পাকিস্তানের অফশোর সেক্টরে যুক্ত হওয়ার পর আঙ্কারার সিদ্ধান্ত শুধু তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দুই দেশের প্রয়োজনীয়তার সম্মিলনের প্রতিফলন। এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে—একদিকে তুরস্কের জ্বালানি অনুসন্ধান সক্ষমতার মানচিত্রকে বৈচিত্র্যময় করা, অন্যদিকে পাকিস্তানের দীর্ঘদিন অবহেলিত গভীর সমুদ্রে খনিজসম্পদ অনুসন্ধান প্রচেষ্টাকে পুনরুজ্জীবিত করা। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই চুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে মাঝারি আকারের দেশ বা শক্তিগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং জ্বালানি করিডরগুলো দ্রুত পুনর্গঠিত হচ্ছে বা নতুন রূপ নিচ্ছে।

তুরস্কের পরিকল্পিত সম্প্রসারণ

পাকিস্তানের অফশোর অববাহিকা—সিন্ধু ও মাকরান এলাকা—দীর্ঘদিন ধরেই তেল-গ্যাস মজুতের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হলেও এতদিন তা বাস্তব রূপ পায়নি। গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলে অল্প কয়েকটি কূপ খনন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি এক্সনমোবিলের নেতৃত্বে পাকিস্তানের জলসীমার আওতাধীন গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কিছু কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। তবে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সেসব উদ্যোগ সফল হয়নি।

এই চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে তুরস্কের যুক্ত হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। টিপিএও পূর্ব অফশোর সিন্ধু-সি ব্লকের পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং আগামী বছর পাকিস্তানের জলসীমায় তাদের সিসমিক বহর মোতায়েনের পাশাপাশি ইসলামাবাদে একটি স্থায়ী অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি সংস্থাগুলোর সঙ্গে টিপিএওকে যুক্ত করে কনসোর্টিয়াম গঠনের কাঠামো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জোটবদ্ধতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়, যা পাকিস্তানের অনিশ্চয়তায় জর্জরিত এই খাতকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে।

ইসলামাবাদের জন্য সময়টি অত্যন্ত অনুকূল। পাকিস্তানের ২০২৫ সালের অফশোর বিডিং, যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অনুসন্ধান উদ্যোগ—আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই খাতে তুরস্কের অংশগ্রহণ একটি বড় অগ্রগতি, যা পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণের চেষ্টা করে আসছিল। বহু বছর স্থবিরতার পর পাকিস্তানের অফশোর সেক্টর এখন ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাচ্ছে।

পাকিস্তানের উপকূলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তুরস্কের যুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে দেশটির ক্রমবর্ধমান জ্বালানি কৌশল। গত দুই দশকে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তন ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে তুরস্ক আমদানি করা জ্বালানিতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। সেই ব্যয় কমাতেই পাকিস্তানের সঙ্গে জ্বালানি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এই উদ্যোগ প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকারের। তুরস্ক রাশিয়া, ইরান ও আজারবাইজানের জ্বালানি সরবরাহ করিডোরের সঙ্গেও যুক্ত। কৃষ্ণ সাগরে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান সাফল্য আরো দূরবর্তী অঞ্চলে এই সক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আঙ্কারার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের জলসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান তারই প্রতিফলন।

পাকিস্তানের জলসীমা তুরস্ককে এমন এক অঞ্চলে জ্বালানি মানচিত্র সম্প্রসারণের সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক জ্বালানি ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভারত মহাসাগর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে পরিণত হওয়ায় সেখানে তুরস্কের উপস্থিতি জ্বালানি সরবরাহ লাইন বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও বাড়াবে।

বৃহত্তর কৌশলগত সমন্বয়

পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দুই দশক ধরে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, ড্রোন উন্নয়ন, নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং গোয়েন্দা সহযোগিতায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্ক এখন অর্থনৈতিক ও সম্পদ খাতেও বিস্তৃত হচ্ছে।

তেল-গ্যাসের বাইরে তুরস্কের আগ্রহ পাকিস্তানের খনিজসম্পদ খাতেও প্রসারিত হয়েছে। তুরস্কের একটি বড় খনি কোম্পানি পাকিস্তানের রেকো ডিক অঞ্চলের তামা ও স্বর্ণসমৃদ্ধ এলাকায় বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক মনোযোগ কেড়েছে।

এছাড়া তুরস্ক তার যুদ্ধ ড্রোন সংযোজনের জন্য পাকিস্তানে একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে। এই উদ্যোগ তুরস্কের স্টিলথ ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন রপ্তানি বৃদ্ধির কৌশলের অংশ। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দুই দেশ একটি পরিপক্ব অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার পাশাপাশি নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করবে।

দুই দেশের এই অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের পথে যৌথভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি বহন করে। তবে পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির এবং অফশোর খনন কার্যক্রম স্বভাবতই অনিশ্চিত। এতে সফলতা আসতেও পারে, আবার নাও আসতে পারে।

তা সত্ত্বেও ভূকম্পন জরিপ থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রে খনন পর্যন্ত বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় তুরস্কের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষ্ণ সাগরে অফশোর অনুসন্ধানে সাম্প্রতিক সাফল্য তার একটি উদাহরণ। এই দক্ষতা তুরস্ককে প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম সীমিত কয়েকটি দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে।

ভারত মহাসাগরের পরিবর্তনশীল পরিবেশ

এই অগ্রগতিগুলো এমন একসময়ে ঘটছে, যখন ভারত মহাসাগর জ্বালানি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। বৈশ্বিক ব্যবস্থা দ্রুত বদলাচ্ছে—উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় হচ্ছে, চীন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে, পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল পুনর্গঠন করছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের জ্বালানি ও নিরাপত্তা কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে।

এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের প্রবেশ ভারত মহাসাগরকে আরো বহুমুখী করে তুলছে। যদিও নিকট ভবিষ্যতে আঙ্কারার উপস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা কম, তবু তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো যে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

ভারত মহাসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তুরস্ক-পাকিস্তান অংশীদারত্ব শুধু একটি জ্বালানি চুক্তি নয়; এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরে প্রভাব বিস্তারের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার প্রতিফলন। পাকিস্তানের জন্য এটি দীর্ঘদিন অবহেলিত বিপুল খনিজসম্পদ আহরণের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে।

তুরস্কের অনুসন্ধান কার্যক্রম সফল হোক বা ব্যর্থ—এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। পাকিস্তান-তুরস্ক সম্পর্ক সামুদ্রিক কৌশল, জ্বালানি বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক রূপান্তরের মাধ্যমে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যেখানে পুরোনো জোট ম্লান হয়ে নতুন প্রতিযোগীরা উঠে আসছে, সেখানে আঙ্কারা-ইসলামাবাদের অফশোর জ্বালানি সহযোগিতা আগামী দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ড থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

যেভাবে হতে পারে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং

ওসমান হাদির সাংস্কৃতিক আন্দোলন

ইউজিসির গবেষণা ফান্ড বরাদ্দে বৈষম্য কেন?

ক্যাম্পাস থেকে ক্ষমতার করিডর

শোকের আড়ালে জয়শঙ্করের বার্তা

ফিরে দেখা পিলখানা হত্যাকাণ্ড

একটি কফিনকে ঘিরে বাংলাদেশ

বিএনপির বিবর্তন

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন থাবা

রাষ্ট্র ও টেলিভিশনের আলো