চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তনের ঢেউ আসে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্ন ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। কমিশন বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরিবর্তে নতুন মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র’র কথা সুপারিশ করা হয়েছে।
১৯৭২-৭৫ ও ২০০৯-২৪ এই দুই সময়কালে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এই দুই সাংবিধানিক মূলনীতিকে এ দেশের মুসলিম আত্মপরিচয় ও ইসলামের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশকে কোণঠাসা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতিটি বেশ সমালোচিত হয়। এজন্যই জুলাই বিপ্লবের পর আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটি ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো বিতর্কিত মূলনীতিগুলোকে বাদ দিয়ে সংবিধানের জন্য নতুন কিছু মূলনীতি প্রস্তাব করে, যার মধ্যে বহুত্ববাদ অন্তর্ভুক্ত। এই মূলনীতিটি এদেশের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা বিস্তর আলোচনার জন্য অত্যন্ত স্পষ্ট দাবি রাখে।
সাধারণ অর্থে বহুত্ববাদ বলতে ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চিন্তার মানুষের পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদাসহ সহাবস্থানের ধারণাকে বোঝায়। বহুত্ববাদ ধারণাগতভাবে নতুন কিছু নয়। প্রাক-আধুনিক যুগে রোমান, প্রাচীন ভারতীয়, চৈনিক সভ্যতা, ইসলামি খেলাফত ও সালতানাতসহ বিভিন্ন সভ্যতা ও সাম্রাজ্যে বিচিত্র সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতির মানুষ কেন্দ্রীয় রাজকীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে কর প্রদান ও যুদ্ধের সময় সৈন্য সরবরাহের মাধ্যমে অনেক গোষ্ঠী নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ এবং সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও আইনি স্বাধীনতা অনেকাংশে বজায় রেখে স্ব-শাসিত হতে পারত।
আধুনিক যুগে বহুত্ববাদের আলোচনা প্রথম অনুপ্রাণিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া রিফরমেশন ও অদ্ভুত খ্রিষ্টীয় অন্তঃধর্মীয় সংঘাত দ্বারা। হাজার বছরব্যাপী ক্যাথলিক চার্চের বিভিন্ন বিশ্বাস ও প্রথাকে মার্টিন লুথার কিং (Martin Luther King), জন ক্যালভিন (John Calvin), আলরিখ জুইংলির (Huldrych Zwingli) মতো বড় বড় প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মতাত্ত্বিকরা চ্যালেঞ্জ করেন। এর দ্বারা তারা খ্রিষ্টীয় বিশ্বের ওপর ক্যাথলিক চার্চের একক কর্তৃত্বকে ভেঙে ফেলেন। এর প্রভাবে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টবাদ-সমর্থক বিভিন্ন রাজশক্তির মধ্যে শতবর্ষব্যাপী বহুমুখী ও বিভিন্ন প্রান্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি (Treaty of Westphalia), অগসবার্গ শান্তিচুক্তি (Peace of Augsburg), নন্ট-এর ফরমান (Edict of Nantes) প্রভৃতি সমঝোতা ও চুক্তির পর ধীরে ধীরে এই যুদ্ধাবস্থার ইতি ঘটে। খ্রিষ্টীয় বিভিন্ন ফেরকার সহাবস্থান একটি বাস্তবতা হয়ে ওঠে। তবে এটি শুধু ধর্মীয় বহুত্ববাদের বাস্তবায়ন ছিল না। এসব বন্দোবস্তের ফলে প্রথমত বিভিন্ন রাজশক্তি তাদের সাম্রাজ্যের মধ্যে সম্রাটের ফেরকার বাইরেও জনগণের অন্যান্য খ্রিষ্টীয় ফেরকা অনুসরণ ও সম-অধিকারকে মেনে নেয়। পরবর্তী সময়ে এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা উদ্ভূত সংঘাত এড়ানোর জন্য ধীরে ধীরে ইউরোপের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি, বৈধতা ও পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে খ্রিষ্টবাদকেই সরিয়ে দেওয়া হয়। জন লক, ভলটেয়ারসহ এনলাইটেনমেন্ট যুগের অনেক দার্শনিক রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক্করণের কথা বলেন এবং সমাজে বহুধর্মের সম্প্রদায় কোনো সংঘাত ছাড়াই সহাবস্থান করতে পারে বলে মতামত ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে রুশো, জন স্টুয়ার্ট মিলসহ অনেকে দার্শনিক ব্যক্তি-অধিকার, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতের ভিন্নতার অধিকারের কথা বলেন। এ সময়টায় যখন ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপত্তি ও বিকাশ হতে থাকে, তখন রাষ্ট্রকে একক জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির ধারক এবং সুসংহত, এককেন্দ্রিক, অনুক্রমিক (hierarchial), সহিংসতার একচেটিয়া বৈধ অধিকারী ও একক সার্বভৌম সত্তা হিসেবে কল্পনা ও তত্ত্বায়ন করার বিপরীতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের আলোচনা-প্রতিআলোচনা শুরু হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য, এ ক্ষেত্রেও বহুত্ববাদের তত্ত্বায়ন একভাবে হয়নি। তবে সব ধরনের বহুত্ববাদীরাই সাধারণত রাষ্ট্রের মধ্যকার বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর ভূমিকা এবং তাদের অধিকার প্রদানের কথা বলেছেন। ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, যেগুলোয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আদর্শকে রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করার অধিকার দেওয়া হয়। বিংশ শতাব্দীতে অভিবাসন ও বিশ্বায়নের কারণে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিতে অনেক বৈচিত্র্য আসে। এর ফলে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের বিষয়টিও উঠে আসে। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর উদ্যোগে জাতিসংঘ গড়ে ওঠে। সেখানেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানের বহুত্ববাদকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। হাল জামানায় এসে বিশ্বায়ন ও ইন্টারনেটের আবির্ভাব বহুত্ববাদকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের ধারক-বাহকরা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে। আধুনিক গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দল, স্বার্থগোষ্ঠী ও মতামতের উপস্থিতির ওপর খুব জোর দেওয়া হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে বহুত্ববাদের বয়ানে পরিচয়বাদী রাজনীতি (identity politics) কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। এই প্রবণতার ধারকরা জাতীয় ঐক্য ও সংহতিসাধনের বিরোধিতা করে এবং বর্ণ, সংস্কৃতি, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী এমনকি যৌন প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখা উচিত বলে মনে করে।
এ তো গেল বিশ্বব্যাপী সময়ের সঙ্গে বহুত্ববাদের ধারণার বিকাশ। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও এদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরাও বসবাস করে। বাংলা ভাষা এদেশের মানুষের প্রধান ভাষা হলেও উপজাতিসহ কিছু গোষ্ঠী অন্যান্য ভাষা ব্যবহার করে। আবার সংস্কৃতির দিক থেকেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বৈচিত্র্যময় এই দেশের সংবিধানে বহুত্ববাদ শব্দের উল্লেখ না থাকলেও সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় ও লিঙ্গভেদে সমান অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২নং ধারায় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। ধর্ম পালনের এই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দ্বারা সব ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য দূর করার অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়েছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতার রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ১২নং ধারায় সাম্প্রদায়িকতা ও কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়ন বিলোপ করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৪১নং ধারায় আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে যেকোনো ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে যেকোনো ধর্ম অনুশীলনকারী নাগরিকদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। এভাবে বহুত্ববাদ শব্দ উল্লেখ না থাকলেও সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এদেশের মানুষ অত্যন্ত সহনশীল ও সহিষ্ণু। এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন অবাঙালি উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারা রয়েছে। এসব সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। সংবিধানের ২৩নং ধারায় বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এদেশের মানুষের পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৯নং ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাকস্বাধীনতা ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা সাপেক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে দল বা সংঘ গঠনের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সরকারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনোরূপ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। সংবিধানের ৬৬নং ধারায় সরকারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭নং ধারায় আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ২৮ ও ২৯নং অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও নারীপুরুষভেদে সব নাগরিকের জন্য সমান নাগরিক অধিকার লাভের কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও নারীপুরুষভেদে সব বৈষম্য নিরসনের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা থেকে বলা যায়, বহুত্ববাদী নীতি বাস্তবায়নের জন্য যেসব বিষয়ের সাংবিধানিক অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন, তা এরই মধ্যে এ দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও ভাষাভেদে সব নাগরিকের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের সমতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে বৈষম্য নিরসনেও বিভিন্ন বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও পশ্চিমা কিছু প্রভাবশালী সেক্যুলার লিবারেল রাষ্ট্র বিশ্বমোড়ল সেজে এসে বাংলাদেশসহ অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশকেই গণতন্ত্রের পাশাপাশি বহুত্ববাদের সবক দিয়ে থাকে। পশ্চিমাদের ফেরীকৃত এই বিশেষ ধরনের বহুত্ববাদকে আগে ঠিকমতো বোঝা উচিত।
বহুত্ববাদের একটি মৌলিক প্রেক্ষাপট হচ্ছে একাধিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান। প্রতিটি সম্প্রদায়ই নিজ সদস্যদের জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক ক্ষেত্র দান করে, যা ওই সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষালাভ, চর্চা ও সমৃদ্ধির সুযোগ দান করে। খেলাফতসহ বিভিন্ন প্রাক-আধুনিক বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও শাসনব্যবস্থায় মূলত এমনটাই দেখা যেত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কালের শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের দমন-নিপীড়নের কারণে আধুনিক বহুত্ববাদের আলোচনা শুরু হলেও কালক্রমে বিবর্তিত বর্তমান আধুনিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী লিবারেল রাষ্ট্রগুলোয় ব্যক্তিবাদের (individualism) নামে সম্প্রদায় বোধ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কাঠামোগতভাবে লিবারেল রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে ব্যক্তিবাদের মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলে এবং রাষ্ট্র ছাড়া অন্য যেকোনো সামষ্টিকতা বা সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য ও নৈতিক দায়বোধ যতটা সম্ভব হ্রাস করার চেষ্টা করে। তাই পশ্চিমা লিবারেল প্যারাডাইম যখন বহুত্ববাদের কথা বলে, তা মূলত ব্যক্তিপর্যায়ে বিদ্যমান হরেক রকম নৈতিকতা ও আচরণের প্রতি সহিষ্ণুতার কথা বলে যতক্ষণ না তা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকি না হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ধরনের ব্যক্তিবাদ কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতাভিত্তিক বহুত্ববাদ কোনো নৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব তো করেই না, বরং তা নৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টি করে। হাল আমলে তৈরি হওয়া এলজিবিটিকিউ আন্দোলন দিয়েই ব্যাপারটি বোঝা যাক। বহুত্ববাদের নামে মানবপ্রকৃতিবিরোধী এই আন্দোলনকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোয় যে কেবল স্বীকৃতিই দেওয়া হয়েছে তা নয়, এই আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্র তাদের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এলজিবিটিকিউ আন্দোলন মূলত বিপরীত লিঙ্গের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে যারা আগ্রহী নয় তাদের আন্দোলন। এই আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে সমকামী, দ্বি-কামী, ট্রান্সজেন্ডারসহ আরো বহু ধরনের অস্বাভাবিক যৌনপ্রবণতাসম্পন্ন লোকজন রয়েছে। তাদের নিজেদের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকলেও তারা সবাই এই ব্যাপারে একমত যে, স্বাভাবিক যৌনপ্রবণতাসম্পন্ন (heterosexual) লোকদের মতো তাদেরও একই অধিকার (তাদের বিয়ে ও বিয়ে-পরবর্তী পরিবারসংশ্লিষ্ট যাবতীয় অধিকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতিপ্রদান প্রভৃতি) দিতে হবে। এখানে উল্লেখযোগ্য, এলজিবিটিকিউ অধিকারের ওপর ভিত্তি করে যে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, এটা প্রকৃত অর্থে কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক ব্যবস্থার ধারক অর্থে কোনো সম্প্রদায়ই নয়। কেবল স্বাভাবিক যৌনপ্রবণতাসম্পন্ন লোকদের মতো একই অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে এই আন্দোলনকারীরা একটি ভাসা ভাসা একতা গড়ে তুলেছে, যার নাম তারা দিয়েছে সম্প্রদায়। একই কথা নারীবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও খাটে। নারীবাদীদের মধ্যেও লিবারেলিজম, মার্ক্সিজম, পোস্টমডার্নিস্টসহ বহু আদর্শিক ধারার লোক রয়েছে। কিন্তু তাদের একতার সূত্র হচ্ছে নারীবাদিতার নামে কিছু অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত মূলনীতি কোনো ধরনের নৈতিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপিত না হওয়ায় সংবিধানে গৃহীত হলে এগুলো দ্বারা খুব সহজেই ইসলামি আইন নামে যতটুকু পারিবারিক আইন বাকি আছে, সেগুলোয়ও নারী-পুরুষের সাম্য, সামাজিক সুবিচার ও নারীর মানবিক মর্যাদার অজুহাতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পথ উন্মুক্ত হবে। বহুত্ববাদের নামে এলজিবিটিকিউ আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, যৌনকর্মীদের অধিকার আন্দোলন, ভেগান আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামবিরোধী আন্দোলন আইনগতভাবে বৈধতা ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বসবাস করে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বিদ্যমান বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। সংবিধানে বহুত্ববাদ উল্লেখ করা হলে বহুত্ববাদের নামে বিভিন্ন অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর বিষয়ে সমঝোতার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া কোনো কোনো গোষ্ঠী চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার নামে এমন কোনো কোনো বিষয়ের বৈধতা চাইতে পারে, যা ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনের জন্য হুমকিস্বরূপ। একইসঙ্গে তা সামাজিকভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন সংবিধানের মূলনীতির প্রস্তাবনায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার, দেশাত্মবোধ এবং গণতন্ত্রকে মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ মূলনীতি হিসেবে থাকলে একটি নৈতিক কাঠামো থাকে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে ব্যাখ্যা করা যাবে এবং একই সঙ্গে যেকোনো আইন প্রণয়নের সময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর তাদের মূল্যবোধকে বিবেচনায় আনার পথ উন্মুক্ত হয়। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদের বদলে ‘দেশাত্মবোধ’ মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হলে দেশের প্রতি সবারই একটি দায় ও মমতাবোধ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। জাতীয়তাবাদকে ইসলামবিরোধী (নিন্দনীয় ‘আসাবিয়্যাহ’) অর্থে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একইসঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের সংস্কৃতি অবাঙালি নৃ-তাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপানোর সুযোগ থাকবে না। আবার বহুত্ববাদের নামে পাহাড়ি বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীর স্ব-শাসন দাবি করার পথও উন্মুক্ত হবে না। এতে পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। দেশাত্মবোধের মূলনীতি জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা নির্বিশেষে সবাইকে বাংলাদেশের প্রতি নিবেদিত করে রাখবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি; সাবেক চেয়ারম্যান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়