বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেখা গেল তিনি তার নাবালক দুসন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো এবং সদ্য বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কিছুই রেখে যাননি। তখন ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীতে বিহারিদের অনেক পরিত্যক্ত বাড়ি-প্লট ছিল।
অনেক রাজনৈতিক নেতাই স্বাধীনতার পর এসব বাড়ি-প্লট নিজের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন। জিয়াউর রহমান যদি ইচ্ছা করতেন নিজের নামে বাড়ি/প্লট বরাদ্দ করিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এমনকি তিনি DOHS-এও কোনো প্লট নেননি। তার মৃত্যুর পরই দেশবাসী জানতে পারে তিনি একজন অসম্ভব সৎ, আগাগোড়া নির্লোভ মানুষ ছিলেন।
শেখ মুজিবের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন- সবার নামই জনগণের মুখে মুখে ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জনগণ তার কোনো আত্মীয়স্বজনের নাম জানত না। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও জিয়াউর রহমান বঙ্গভবনে না থেকে সেনাপ্রধান হিসেবে প্রাপ্ত ক্যান্টনমেন্টের সেই ছোট বাড়িতেই বসবাস করতেন।
এমতাবস্থায় পরে তৎকালীন সরকার জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী ও তার নাবালক দুই সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডে অবস্থিত জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত সেনাপ্রধানের বসবাসের জন্য নির্ধারিত যে বাড়িতে তিনি বসবাস করতেন, সেই বাড়িটিই তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। যেহেতু খালেদা জিয়ার কোনো আয়ের উৎস ছিল না, তাই গুলশানে আরেকটি চারতলা বাড়ি বরাদ্দ করা হয়, যাতে এ বাড়ির ভাড়া দিয়ে তিনি সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন।
তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং ভারতের ষড়যন্ত্রে ২০০৮ সালে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হলো। শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর খালেদা জিয়ার নামে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়িটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়। বলা হয়, এ বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া নাকি আইনসম্মত হয়নি! জনগণ কর্তৃক উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বাড়ির বরাদ্দ যে কেউ বাতিল করতে পারে-এটা খালেদা জিয়া স্বপ্নেও কল্পনা করেননি।
কেননা জাতির প্রতি জিয়ার অসামান্য অবদান ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে জনগণের সম্মতিক্রমে সরকার খালেদা জিয়াকে এ বাড়ি উপহার দিয়েছিল । উপহার কি ফেরত নেওয়া যায়? অথচ খালেদা জিয়া এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার স্বামী একাধারে দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। উপরন্তু খালেদা জিয়া নিজে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।
যে বাড়িতে চল্লিশ বছর ধরে খালেদা জিয়া নির্বিঘ্নে বসবাস করে আসছেন, সে বাড়ির বরাদ্দ বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করেন। শেখ হাসিনার অনুগত আদালত স্বভাবতই বরাদ্দ অবৈধ বলে রায় দেয়! খালেদা জিয়া এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
কিন্তু তিনি কোথাও ন্যায়বিচার পাননি। অতঃপর ২০১০ সালে আপিল শুনানির আগেই সেনা-পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে দুপুরবেলায় অভুক্ত অবস্থায় বলপূর্বক দু-দুটো দরজা ভেঙে অত্যন্ত অসৌজন্যভাবে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়!
খালেদা জিয়া কোনো সাধারণ রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। ভোটের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রী। দেশের সব এলাকায় তিনি সমানভাবে জনপ্রিয়। এ যাবৎ যত নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছেন, একটি নির্বাচনেও তিনি পরাজিত হননি।
এমনকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একাধিক জাতীয় নির্বাচনে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত ছয়টি আসনে একযোগে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে, একাধিকবার ছয়টি আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। বিশ্বের নির্বাচনের ইতিহাসে এ ধরনের কৃতিত্ব দ্বিতীয় আর কোনো রাজনীতিকের আছে বলে আমার জানা নেই।
সংসদ সার্বভৌম কিন্তু আদালত সার্বভৌম নয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিতে পারেন। তাহলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বরাদ্দ করা বাড়ি তৎকালীন আদালত কোন যুক্তিতে অবৈধ সাব্যস্ত করল, তা আমার বোধগম্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব সংসদের অনুমোদন ছাড়াই যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ড বেরুবাড়ি ভারতকে দিয়ে দিতে পারেন, তবে আরেকজন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদের সম্মতিক্রমে সরকারের একটি বাড়ি বরাদ্দ কেন অবৈধ হবে?
তখন এক ব্যক্তি বেরুবাড়ি ভারতকে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিলেন, কিন্তু আদালত সেই মামলা খারিজ করে দিয়েছিল! শেখ হাসিনা যখন এক টাকা দিয়ে গণভবন কিনে নিয়েছিলেন, তখন কিন্তু আদালত সুয়োমোটো রুল ইস্যু করেনি ।
রেলগাড়ি যেমন রেললাইনের বাইরে চলতে পারে না, তেমনি আদালতও আইনের বাইরে যেতে পারেন না। অথচ হাসিনার শাসনামলে দেশে ‘আদালতের শাসন’ জারি করা হয়েছিল। এমনকি আদালত থেকে অনুষ্ঠান শেষে ‘জয় বাংলা’ বলা বা মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বলা ইত্যাদি নির্বাহী আদেশ পর্যন্ত জারি করা হয়েছে! বিচারকরা সভা-সমাবেশ করে নিজেদের ‘শপথবদ্ধ’ রাজনীতিক আখ্যায়িত করেছেন। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে হাসিনা সরকার যা খুশি তাই করেছে।
এটা স্পষ্ট, শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে শুধু প্রতিহিংসাবশত খালেদা খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন।
স্বৈরশাসক হাসিনা সরকার কর্তৃক খালেদা জিয়া ও তার পরিবার যে পরিমাণ দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তা স্বাধীন দেশে এক কথায় নজিরবিহীন। খালেদা জিয়ার মতো দৃঢ়চেতা নেত্রীও সেদিন কান্না আটকে রাখতে পারেননি তার ওপর জুলুমের কারণে।
বিগত আমলের সব অনিয়ম-দুর্নীতি, বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার প্রতি যে অন্যায়, জুলুম করা হয়েছে, তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু অন্যায়ভাবে তার কেড়ে নেওয়া বাড়ির পরিবর্তে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একটি বাড়ি বা প্লট দেওয়া এ সরকারের নৈতিক দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা