হোম > মতামত

আমার দেশ-এ আমার স্মৃতি

আবু রূশদ

২০০৭ সালে যখন ওয়ান-ইলেভেন সংঘটিত হয়, তখন আমি দৈনিক যায়যায়দিন-এ বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করছি। সেখানে যোগ দিয়েছিলাম ২০০৫ সালে সেল চিফ হিসেবে। রিপোর্টিং টিমের সিনিয়র মোস্ট সদস্য হলেও ওই দৈনিকে হাস্যকর কারণে কোনো চিফ রিপোর্টারের পদ রাখা হয়নি। তবে সেই কাজটাই আমাকে করতে হতো। সেনা-সমর্থিত ফখরুল সরকারের সময় সংগত কারণেই রিপোর্টারদের বেশ ব্যস্ত সময় যাচ্ছিল। এর ওপর প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত রিপোর্ট আমার এক্তিয়ার বলে রাতদিন অ্যান্টেনা খাড়া করে রাখতে হতো কখন কী হয় তা জানার জন্য।

এর মাঝে একদিন বাসা থেকে বের হবো, শুনি দৈনিক আমার দেশ-এর বিল্ডিংয়ে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। সেদিন ও রাতটা কাটল ওই-সংক্রান্ত রিপোর্টগুলো জড়ো করতে। জানতে পারলাম আমার দেশ-এর সব পুড়ে গেছে। তাদের আর অফিসে বসে কাজ করার উপায় নেই। পত্রিকাটির প্রেস ছিল তেজগাঁর লাভ রোডে দৈনিক যায়যায়দিন-এর অফিসের ঠিক পাশে। যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান ঘোষণা করে দিলেন যতদিন ব্যবস্থা না হয় ততদিন আমার দেশ-এর সাংবাদিকরা এসে দৈনিক যায়যায়দিন-এ বসে কাজ করতে পারবেন। আমার দেশ-এর সম্পাদক প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর ভাই তার অফিস স্থাপন করলেন ছাপাখানায়। নিউজ ডেস্ক ও রিপোর্টারদের একটা অংশ এসে বসলেন যায়যায়দিন-এ। সেসময় লক্ষ করলাম প্রতিষ্ঠালগ্নে ‘নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখতে ভিন্ন ঘরাণার যাদের বড় বড় পদে নেওয়া হয়েছিল তাদের বেশিরভাগই আমার দেশ ছেড়ে তাদের আদর্শগত নিজ ডেরায় ফেরত চলে গেলেন। পুড়ে গেছে পত্রিকা, তার ওপর সরকারের চাপ—ওসব ঝামেলা তারা কেন ঘাড়ে নেবেন? বেশ খারাপই লাগল।

দুটি বড় পত্রিকা পাশাপাশি চলছে। হঠাৎ একদিন আমার দেশ সম্পাদক আমানুল্লাহ কবির ভাই ফোন করে ডেকে পাঠালেন। সরাসরি বললেন, ‘রূশ্দ, আপনি এখানে চিফ রিপোর্টার সৈয়দ আবদাল আহমদ ছাড়া অন্যদের চেয়ে সিনিয়র। কিন্তু আমার দেশ রক্ষা করতে হবে। অনেকে চলে গেছেন। আমার হেল্পিং হ্যান্ড দরকার। আপনি কি এখানে যোগ দেবেন আমার অনুরোধে? আমি যায়যায়দিন-এ যে বেতন-ভাতা পেতাম, সেখান থেকে ইনক্রিমেন্ট পুরোটাই বাদ দিয়ে গ্রেড ওয়ান স্কেলের কেবল বেসিক ধাপের বেতনে যোগ দিতে হবে। তারপরও কোনো দিক না ভেবে সম্মতি জানালাম তৎক্ষণাৎ। এর কারণ ছিল কয়েকটি।

দৈনিক আমার দেশ যখন যাত্রা শুরু করে তখন আমি দৈনিক ইনকিলাব-এ। কিন্তু ওই পত্রিকাটি থেকে তখন অনেকেই দৈনিক নয়া দিগন্ত ও আমার দেশে-এ চলে গেছেন। আর পত্রিকা কর্তৃপক্ষ হঠাৎ কথিত নিরপেক্ষতার নামে ওয়ান-ইলেভেনের অ্যাডভান্সড পার্টির সহায়ক ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর আমরা ভালো করে ওটা বুঝতে পেরেছি। আমিসহ অনেকেই এই রং পরিবর্তন মেনে নিতে পারছিলেন না। ড. আব্দুল হাই সিদ্দিকী ভাই তাই চলে গেলেন বাংলা ভিশন-এ, মঞ্জুরুল ইসলাম, মাসুমুর রহমান খলিলীসহ অনেকে গেলেন নয়াদিগন্ত-এ। আমি আমার দেশ-এ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম আমানুল্লাহ কবির ভাইয়ের কাছে। তিনি তিন-চার দিন পর জানালেন, রশিদুন নবী বাবু ভাই, যিনি আবার বিএনপির বড় পদে ছিলেন, তিনি আমাকে ভারতবিরোধী ও মারদাঙ্গা সাংবাদিক হিসেবে মনে করেন! ‘নিরপেক্ষতার’ স্বার্থে তাই আমাকে নেওয়া বিব্রতকর। আমি যেহেতু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ নিয়ে সাড়াজাগানো একটা বই লিখেছি, সেটা তো অবশ্যই আমার অপরাধ বটে! বেশ! দৈনিক যায়যায়দিন-এ চলে গেলাম। ওখানেও দেখি সব অতিনিরপেক্ষদের কাজ-কারবার। বাইরে সব ভয়াবহ জাতীয়তাবাদী! ভেতরে সব বাম, অতি বাম, মস্কোপন্থি বাম!

বাবু ভাইয়ের ওই কথা মনে পড়ল কবির ভাইয়ের অনুরোধে। সম্পাদক হয়তো বাবু ভাইকে দেখাতে চাচ্ছিলেন, তিনি (বাবু ভাই) যাদের নিরপেক্ষ হিসেবে নিয়েছিলেন তাদের সবাই বিপদে চলে গেছে, আর যাকে নিতে চাননি সে বিপদে কম বেতনে আসতে চাইছে। অন্যদিকে আমার একসময়কার স্নেহধন্য জুনিয়র সহকর্মী অলিউল্লাহ নোমান ও শ্রদ্ধেয় সিনিয়র সৈয়দ আবদাল ভাই চাচ্ছিলেন আমি যেন আমার দেশ-এ যোগ দিই। কারণ তারাও ওইসব নিরপেক্ষতার বয়ান নিয়ে বিরক্ত ছিলেন। এর ওপর সরাসরি আমার দেশ-এ যোগ না দিলেও ২০০৬ সালের শেষ দিকে আমার একটা সাড়াজাগানো রিপোর্ট আমার দেশ-এর প্রথম পাতায় কয়েক দিন ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। ওটা ছিল ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি-সংক্রান্ত সেসময়কার পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের গোপন এফিডেভিট নিয়ে। আমি সেসময় অতি নিরপেক্ষতাবাদী ও চুপাহুয়া বামদের কায়কারবারে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু সময়ের জন্য যায়যায়দিন ছেড়ে এসেছিলাম। ওইসব সাংবাদিকের মারাত্মক এলার্জি ছিল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে, যা আমি সহ্য করতে পারিনি। যাহোক, ইয়াহিয়া খানের ওই গোপন দলিল আমি চুরি করেছিলাম পাকিস্তান থেকে। ওটা আরেক ইতিহাস। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চমকপ্রদ সব তথ্যের ভাণ্ডার হলো এফিডেভিটটি। আবদাল ভাইকে প্রেস ক্লাবে দেখানোর পর তিনি কবির ভাইকে বলে ওটা ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। তিন দিন প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহ দৈনিক আমার দেশ-এ ওই গোপন দলিল-সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, যা ছিল সেসময় দেশের সবচেয়ে সাড়াজাগানো প্রতিবেদন। এই বিষয়টি ছিল আমার জন্য আবেগের।

এছাড়া আমার দেশ-এ যেসব সাংবাদিক কাজ করতেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন। কাজী হাফিজ, জাহেদ চৌধুরি, ইলিয়াস খান, হাসান হাফিজ, বশির আহমেদসহ বেশিরভাগই ছিলেন অতি প্রিয়জন। তাদের সঙ্গে বসে কাজ করতে পারব, সেটা ছিল আত্মিক এক প্রশান্তির ব্যাপার। সবকিছু বিবেচনায় তাই রাজি হয়ে গেলাম। কেউ কি চলতি বেতন ছেড়ে কম বেতনে কোথাও যোগ দেয়? দিয়েছি। আমার সাবেক সহকর্মী এম আব্দুল্লাহও তাই করেছেন; লক্ষ্য—আমার দেশ-এর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া বিপদের সময়, সুখের সময় নয়। যোগ দিয়ে মনে হলো পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে এসেছি।

ওয়ান-ইলেভেনের সরকার দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতি প্রথম থেকেই ছিল খড়্‌গহস্ত। এই পত্রিকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে রেখেছিল তারা। তাই বিজ্ঞাপনের জমা হওয়া টাকাসহ আগের টাকাও তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন শুধু চমৎকার রিপোর্টিংয়ের কারণে আমার দেশ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। হকাররা প্রতিদিন দুপুরের মধ্যে সেদিনকার টাকা দিয়ে যেতেন। ওই টাকা দিয়ে কাগজ কেনা ও আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক খরচ উঠে যেত। কিন্তু পত্রিকার মূল আয় বিজ্ঞাপনের টাকা যেহেতু অ্যাকাউন্টে যেত, তাই সেটা আর তোলা যেত না। এতে বেতন-ভাতা পরিশোধে মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি হয়। যারা মালিক ছিলেন তারাও ছিলেন সরকারের হাতে অত্যাচারিত। পুরো প্রতিষ্ঠানটি চালাতে গিয়ে তাই আমানুল্লাহ কবির ও উপদেষ্টা সম্পাদক আতাউস সামাদকে হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখেছি, শত অসুবিধার মধ্যেও আমার দেশ-এর সাংবাদিক-কর্মকর্তারা অসীম ধৈর্য ধারণ করেছেন।

আমানুল্লাহ কবির ভাই ছিলেন জাত সাংবাদিক। সেনাসমর্থিত একটি নিবর্তনবাদী সরকারের সময় কীভাবে রিপোর্ট করতে হয়, তিনি তা জানতেন। ‘সাপ মরবে, কিন্তু লাঠি ভাঙবে না’ এটা তিনি আমাকে প্রথমেই বলেছিলেন। আমরা রিপোর্টাররা কবির ভাইয়ের নির্দেশনায় খুব ভালোভাবেই এমন সব রিপোর্ট করতাম যে, সরকার যেমন না পারত সহ্য করতে, তেমনি প্রকাশ্যে কিছু বলতেও পারত না। তবে গোয়েন্দা সংস্থা খুব ডিস্টার্ব করত পর্দার আড়ালে। আমি যেহেতু সেনা অফিসার ছিলাম, তাই তাদের কথায় আমাকে ডিজিএফআইতে যেতে হতো নানা কিসিমের কথা শুনতে। কোনো কোনো সময় সম্পাদককেও যেতে হয়েছে আমার সঙ্গে। একদিন দুপুরবেলা ডিজিএফআই অফিস থেকে ফেরার পথে কবির ভাই গাড়িতে একটা কথা বললেন, ‘রূশ্দ, শোনেন, আপনার ভাইয়েরা যা শুরু করেছে, তাতে তারা অচিরেই বিপদে পড়ে যাবেন। দেশটাও বিপদে পড়বে, যা থেকে বের হতে অনেক সময় লাগবে। জাতীয়তাবাদীরা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার বেস। এটা নষ্ট করে দিলে প্রতিরক্ষা বাহিনীও দুর্বল হয়ে যাবে। আমি জেনারেল জিয়া ও এরশাদের শাসনামলেও সেনাদের সঙ্গে মিশেছি। তারা ছিলেন যথেষ্ট প্রফেশনাল। আমাদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতেন। কোনো কিছু বলতে হলে চায়ের দাওয়াত দিতেন। খোলা মনে কথা বলতেন। কিন্তু এবার এরা যে আচরণ করছেন, তা আমি এ বয়সে কল্পনাও করতে পারছি না।’

কী বলব কবির ভাইকে? আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না, তারা অমন করছেন কেন? এত হাইহ্যান্ডেডনেস কি ভালো? তিনটি উদাহরণ দিই।

আমি আমার সোর্সের মাধ্যমে দুটো সিডি পেলাম, যাতে ছিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলসহ শেখ সেলিম, ওবায়দুল কাদের ও বিএনপির আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে গোয়েন্দা হেফাজতে জেরার কথোপকথন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সিডিগুলো পেতে হয়েছিল। কবির ভাই পুরোটা শুনলেন। তারপর আমাকে সিরিজ রিপোর্ট করতে বললেন। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমাকে তো ধরে নিয়ে যাবে। তিনি আশ্বস্ত করে সাহস দিলেন। রিপোর্টগুলো প্রকাশিত হলো লিড হিসেবে পরপর কয়েক দিন। মার-মার কাট-কাট অবস্থা। দিনে কয়েকবার আমার দেশ ছাপাতে হতো হকারদের চাপে। চারদিকে ওই রিপোর্ট নিয়ে হৈচৈ।

ঠিকই আমি বিপদে পড়লাম। এবার অবশ্য গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি ডেকে নিয়ে গেল না। তবে কে বা কারা জানি ওই সিডিগুলোর কপি নীলক্ষেতে ছেড়ে দিল বিক্রির জন্য। আমার মাথা খারাপ। সোর্স ভয় পেয়ে গেল। খুঁজে বের করলাম গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্তা তার বিশ্বস্ত এক সাংবাদিককে ওগুলো দিয়েছেন আমার দেশ-এ রিপোর্ট প্রকাশের পর জাস্ট শোনার জন্য। আর ওই সাংবাদিক সাহেব তা বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতি সিডি পাঁচশ’ টাকা! একটু আশ্বস্ত হলাম। কিন্তু এটা নিয়ে ঝামেলা করতে চেয়েছিল অপর এক কর্তাব্যক্তি। অবশ্য অন্যদের বাধায় তা আর পারেননি।

আরেকটি ঘটনা হলো একদিন গুরুতর অপরাধ দমন কমিটির শীর্ষ কর্তা লে. জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরী জাতীয়তাবাদী ঘরানার সব সম্পাদককে দাওয়াত দিলেন সেনা সদর দপ্তরের পাশে ভিআইপি মেসে অবস্থিত তার কার্যালয়ে। কবির ভাই আমাকে ছাড়া যাবেন না। গেলাম সঙ্গে। আলমগীর মহিউদ্দিনসহ অনেক সিনিয়র সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত। জে. মাসুদ যেসব কথা বললেন, তাতে মনে হলো দেশে খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসন কায়েম হয়ে গেছে। কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আছে শুধু রেটরিক। কয়েকজন সম্পাদক বেশ কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন জেনারেল সাহেবকে। তারা স্পষ্ট করেই বললেন, আপনারা যদি বিএনপিসহ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করতেই মাঠে নেমে থাকেন, তাহলে সেটা বলে ফেলুন, রাখঢাক করে সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চেপে এসব করছেন কেন? জে. মাসুদ আমতা-আমতা করলেন। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও এরশাদের মার্শাল ল’ দেখা ওইসব সাংবাদিকের সঙ্গে পেরে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়! ফিরে আসার পথে কবির ভাই ক্ষোভের সুরে বলেই ফেললেন, ‘রূশ্দ এসব কী করছেন আপনার সাবেক সহকর্মীরা? তারা পুরো সেনাবাহিনীকে চরম বিপদে ফেলে দিচ্ছেন। দেশ, দুনিয়া ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা—কিছুই তো তারা ধর্তব্যে নিচ্ছেন না। কেউ কি নেই এসব থামানোর?’ কী বলার ছিল? চুপ করে থাকলাম।

আরেকটি ঘটনা ঘটল সৈয়দ আবদাল আহমদ ভাইকে নিয়ে। একদিন তার লেখা একটি চমৎকার মন্তব্য প্রতিবেদন লিড হিসেবে প্রকাশিত হলো। পরদিন তাকে যাওয়ার জন্য ফোন এলো গোয়েন্দা সংস্থা থেকে। আবদাল ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন তার সঙ্গে যেতে। সেদিন বেলা ১টায় আমার পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল এ্যাপোলো হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ডাক্তার আলিম আক্তার ভুইয়ার সঙ্গে। তারপরও সকাল সাড়ে ১১টায় আবদাল ভাইকে পৌঁছে দিয়ে আমি চলে গেলাম হাসপাতালে। ৩টার দিকে এসে দুপুরের খাবার খাচ্ছি, তখন প্রেস ক্লাব থেকে শওকত মাহমুদ ভাই ফোন করে জানালেন, আবদাল ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ। আবদাল ভাই যাওয়ার আগে প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে গিয়েছিলেন, তার সাক্ষাতের সময় দুপুর ১২টায়। যদি তিনি ২টার মধ্যে না ফেরেন তাহলে যেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ খোঁজ নেন। শওকত ভাইয়ের ফোন রাখতে রাখতেই সম্পাদক ফোন করে একই কথা বললেন। আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। উপদেষ্টা মেজর জেনারেল এমএ মতিন, বীর প্রতীক আমার পরিচিত ছিলেন, স্নেহ করতেন। তাকে সরাসরি ফোন করে বসলাম। তিনি শুনলেন। কবির ভাইকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। বললেন, ‘দাঁড়াও, দেখি কী করতে পারি।’ এরপর আমি গোয়েন্দা সংস্থায় পরিচিত এক পরিচালককে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে বললাম, ‘আবদাল ভাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের জয়েন্ট সেক্রেটারি ও সিনিয়র সাংবাদিক। আপনারা কি তাকে আটকে রেখে আন্তর্জাতিক রিপারকাশন নিশ্চিত করতে চান? তাকে এখনই না ছাড়লে প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ মাঠে নামবে।’ যাহোক, আধা ঘণ্টার মধ্যে কাজ হলো। আবদাল ভাইকে ছেড়ে দিল সংস্থাটি। এই ছিল ওয়ান-ইলেভেনে জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকদের অবস্থা।

এদিকে উল্লিখিত সিডির কথকতা ফাঁস করে দেওয়ার পর থেকে আমার ওপর ঝড় নেমে এলো। তবে প্রকাশ্যে নয়। বাইরে কিছু দেখা গেল না। শুধু আমি জানলাম কীসের ওপর দিয়ে যাচ্ছি। ফোনে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ঠাণ্ডা স্বরেই জানালেন, ‘হয় দৈনিক থেকে চলে যাব, না হয় দেখে নেওয়া হবে।’ তাদের অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি আমি। কাউকে বললে অসুবিধা হবে। বুঝতে পারলাম ওই সিডি হাতে আসাই আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি গোয়েন্দা সংস্থা চিনি। এভাবে প্রাইভেট নম্বর থেকে ফোন করা তাদেরই কাজ। কবির ভাইকে একদিন না পেরে বললাম, আমার পত্রিকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। কেন? ব্যক্তিগত কারণ। আর কিছু জানালাম না তাকে। তবে তিনি চোখের দিকে তাকিয়ে সুস্পষ্ট করেই বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে। তবে সাংবাদিকতার মধ্যে থাকার চেষ্টা করবেন।’ ছোট দুটো বাচ্চা আমার। আমি সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পানিতে নেমে তো কুমিরের সঙ্গে অনন্ত যুদ্ধ করা যায় না। আবদাল ভাইকে শুধু কাজ করতে অপারগতার কথা বললাম। বাসায় গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আর দৈনিকে কাজ নয়। এবার নিজের একটা পত্রিকা খুলব, যাতে কোনো রাজনীতি থাকবে না। প্রতিষ্ঠা করলাম বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল। আব্বার রেখে যাওয়া গ্রামের বাড়ির একটি জমি বিক্রি করে শুরু করলাম কাজ। সে থেকে চলছে। তবে নির্যাতন থেমে থাকেনি গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় বাংলাদেশের জাতিসত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে দৈনিক আমার দেশ-এর মতো কোনো পত্রিকা লড়াই করেনি। বেশিরভাগ বড় পত্রিকা যখন স্বৈরাচারের পদলেহন করেছে, মিউ-মিউ করেছে, তখন হাজারো সমস্যায় থেকেও আমার দেশ রুখে দাঁড়িয়েছে, সাংবাদিকতা করেছে। সেসময়কার আর্কাইভ নিশ্চিতভাবেই এর সাক্ষ্য দেবে।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল-এর সম্পাদক

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত