জাতীয় স্বাধীনতার প্রথম শর্ত, আর মৌলিক উপাদান হলো, জাতীয় স্বকীয়তার বোধ, ও তার রক্ষা। সব জাতিই মূলতঃ একই মানব জাতি থেকে উদ্ভূত। তাই, তাদের সকলেরই এমন বহু দিক থাকবে যা জগতের অন্যান্য জাতি, বিশেষ করে প্রতিবেশী জাতি বা জাতি সমূহের সঙ্গে অভিন্ন।
দুনিয়ার অন্যান্য জাতি, বিশেষতঃ প্রতিবেশী জাতি সমূহের সঙ্গে নিজের অভিন্নতার দিক গুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির বোধ জাগরুক রাখবার সঙ্গে সঙ্গে, তাদের - বিশেষ করে প্রতিবেশী জাতি থেকে নিজেদের - ভিন্নতা-জ্ঞাপক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বকীয়তার চেতণাকে সার্বক্ষণিক লালন করা জরূরী । তা’ না করলে, অভিন্নতার দোহাই দিয়ে অন্যরা জাতীয় স্বাধীনতাকেই খর্ব, ও হরণ করতে উদ্যোগী হবে অলক্ষ্যে।
এ জন্য হলেও, জাতি হিসেবে বাংলার স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বাংলার প্রত্যেকটি মানুষকেই জাতি হিসেবে, প্রতিবেশী অন্যান্য জাতি – ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, নেপাল, চীন, শ্রীলঙ্কার - থেকে বাংলার জনসংখ্যার বিশালতর অংশের সাংকৃতিক স্বকীয়তা জ্ঞাপক সব কিছুকেই অবচেতণায় গভীরতরে প্রোথিত করে সদাই সচেতণে জাগরুক রাখবার জন্য যা কিছু দরকার, তা’ই করণীয় । নিজের ব্যক্তিগত, বা সংকীর্ণতার সাংস্কৃতিক বা ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠী-গত পরিচয় বা চর্চার সাধারণতঃ তা অংশ যদি না’ও হয় । জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে ব্যক্তি, সম্প্রদায়, ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠী-সহ সারা বাংলার সমগ্র জনসংখ্যার সকলেরই স্বাচ্ছন্দ্য, সম্পদ, জীবিকা, সম্মান ও সম্ভ্রম, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তাই শুধু নয়, জীবনও বিপন্ন হবে।
সম্ভতঃ এরকম বিবেচণা প্রসূত প্রজ্ঞা থেকেই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নিজে মুসলমান না হয়েও, ব্যাপকতর বাংলার বিশালতর সংখ্যা গরিষ্ঠ জনসাধারণের অতি প্রিয় পার্বণ, মুসলমানদের নবীর জন্মোপলক্ষ, ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন অনুষ্ঠাণে গিয়ে নবী প্রশস্তিমূলক বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
বিশ্বাস-জাত সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার প্রতীক-পার্বণ
জাতীয় সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা জ্ঞাপক বিষয়ের একটি প্রধান হলো, দেশবাসীর বিশালতর জনসংখ্যার পালিত ও উদযাপিত পার্বণ সমূহ – বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, যথা, ঈদ, মহররম, মীলাদুন্নবী, শবে’ মে’রাজ-শবে’ বরাত, ইত্যাদি।
ঐতিহাসিক আর্থ-সামাজিক বিবর্তন-পর্যায়-গত অবচেতন সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিক কারণে, প্রায়ই এ সব পার্বণ হয়ে থাকে মূলতঃ ধর্মোতসারিত । আর তাই বিশ্বাসনির্ভর।
তবে যে বিশ্বাস থেকে একটি সাংস্কৃতিক বিষয়ের উদ্ভব ও উন্মেষ মূলতঃ, তা’তে নিজে বিশ্বাস না করেও বিষয়টির সাংস্কৃতিক দিকটি মাত্র আপন করে নেয়া সম্ভব । স্বজাতির বৃহত্তর জনসংখ্যার সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মতার জন্য এই আচরণ খুবই জরূরী।
বিষয়টির বিশ্বাসগত ভিত্তি বা মূলটাতে বিশ্বাসের ভিত্তিতে হলে সেই একাত্মতা হয় দৃঢ়তর।
এই দৃষ্টিভঙ্গী লালনে, বাঙ্গালীর নিজেরই আপন প্রবাদের শিক্ষা খুবই যুতসই – “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর” ।
এই প্রবাদের অর্থ তবে এই নয় যে কুসংসকারাচ্ছন্ন অন্ধ বিশ্বাসে তর্কনির্ভর বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধানের আগ্রহের বিরুদ্ধাচারণ। মোটেও নয়। বরং, তার অর্থ হলো সত্যানুসন্ধানের চূড়ান্ত আগ্রহে আগ্রহী সত্যসাধকদের সত্য দর্শন নির্ভর ধর্ম প্রবুদ্ধ বোধে যে সত্য উদ্ভাসিত, তারই অনুধাবণে বিজ্ঞানের দিশানির্ধারণ । এমন দিশা ছাড়া, বিজ্ঞানের দশা হবে অন্ধের অন্ধকার মনে হওয়া মহাবিশ্বে আলোর আশায় হাতড়ে মরার মত।
বৈজ্ঞানিক সাময়িক সম্ভাব্য “সত্য“
বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধানের পদ্ধতিই হলো, সত্য বলে ধারণা করে নেয়া একটি বক্তব্যকে “অনুসিদ্ধান্ত” (“Hypothesis” ) হিসেবে সাময়িকভাবে “সম্ভবতঃ সত্য” ধরে নেয়া। তার সঙ্গে সঙ্গেই, সেই “সম্ভাব্য সত্যের” সত্যাসত্য নিয়ে বাস্তব প্রমাণাদি বা বুদ্ধিনির্ভর যুক্তি তর্কের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া। তাকে অসত্য প্রমাণে সফল না হলে তাকে আপাততঃ “খুব সম্ভব সত্য” বলে মেনে নিয়ে বক্তব্যটিকে একটি বৈজ্ঞানিক “তত্ব” (“Theory”)বলে স্বীকৃতিদান ।
বিশ্বের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, এমাইটি-তে পড়নো, বিজ্ঞান-তাত্বিক কার্ল পপারের, The Logic of Scientific Discovery-এর প্রধান প্রতিপাদ্য, তাঁর “Scientific Revolution” (“বৈজ্ঞানিক বিপ্লব” ) তত্বে তা’ই বলা হয় । ১৯৫৯ সনে দাঁড় করানো তাঁর এই বৈজ্ঞানিক তত্ব এখনও পর্যন্ত কেউ ভুল প্রমাণ করতে না পারায়, বৈজ্ঞানিক তত্ব হিসেবে তা এখনও বহাল রয়েছে। আর এম|আইটি-এর মত সর্বোচ্চ বিজ্ঞান গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী , গবেষণা, ও শিক্ষার্থী, ও তাদের মত বিশ্বের সকল বড় বড় বিজ্ঞানীরাই এই সত্য মতেই বিজ্ঞান চর্চা করেন।
এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান পদ্ধতিতে তার সূচনাতেই, “অনুসিদ্ধান্ত” রূপে ব্যবহারের জন্য উপস্থাপ্য বক্তব্যের জন্য “সত্য” বলে মনে হওয়া কোন এক বক্তব্যের দরকার হয়। এর জন্য বিজ্ঞানীরা হয় নিজের, নয় অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আন্দাজ প্রসূত কোন কথা, বা “আপাততঃ সত্য” বলে ধরে নেয়া কোন এক তত্বকথাকে বেছে নে’ন সাধারনতঃ।
কিন্তু, বাস্তবে এমন আচরণ হয়ে থাকে অন্ধকারে অন্ধের প্রদীপ খুঁজতে হাতড়ে বেড়ানোর মত।
এমতাবস্থায়, চিরন্তনই সত্যবাদী বলে শত্রু মিত্র সকলের কাছেই পরিচিত সত্যসন্ধানী ধর্মসাধকের, বোধি-প্রবুদ্ধ প্রজ্ঞানে, সত্য বলে বলা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যকেই বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্ত (“Hypothesis”) হিসেবে নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অগ্রসর হওয়াটাই সবচেয়ে বেশী যুক্তিযুক্ত। এই রূপ যুক্তি সঙ্গত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে সতাসত্য দেখা বিজ্ঞানী কুসংস্কারমুক্ত ধর্ম-সাধকের বোধি-প্রবুদ্ধ দৃষ্টিতে সত্য বলে দেখা বক্তব্যকে উপরোক্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মিথ্যা প্রমাণ করতে না পেরেও স্রেফ তর্কাতর্কী দিয়ে “বাতিল” বলবার বাতিকে না ভুগে - বিশ্বস্ত বলে সর্বদাই সর্ব জন স্বীকৃত সত্য সাধকের বলার ভিত্তিতেই বিশ্বাস করে নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে তাকে বরং সত্য বলে বুঝবার চেষ্টায় নিয়োজিত হ’ন। যদি না বিজ্ঞানী নিজে, বা অন্য কেউ তা ভুল বলে প্রমাণ না করতে পারে। এটাই যথার্থ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী।
মহাযাত্রা ‘মে’রাজ’
বাংলার বিশালতর জনসংখ্যার মতই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের, ঐতিহাসিক বাস্তব তথ্য সমর্থিত বিশ্বাস মতে, নবী হজরত মোহাম্মদ (দঃ) ছিলেন ১০০% সত্যবাদী । তাঁর নিজের যুগের শত্রু মিত্র যাঁরাই তাঁকে চিনতেন, তারা কেউই এর বিপরীত বলেন নি । জিজ্ঞাসিত হলেও।
তাঁর শিক্ষা বা বক্তব্যের ঘোর বিরোধীতাকারী শত্রুরা তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করেছে। দেশ ছাড়া করেছে । ১০ বছর ধরে তাঁর ইহধাম ত্যাগের আগে, প্রায় শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত তাঁর প্রবাসেও তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাঁকে “পাগল” , “জ্বিন-গ্রস্ত”, “যাদুকর”, এ সব নানা কিছু বলেছে। কিন্তু, কখোনো মিথ্যাবাদী বলে নি
এমন কি মক্কা শরীফ মুক্তির পূর্ব পর্যন্ত তাঁর শত্রুতাকারীদের প্রধান ও সেনাপতি, আরবের প্রধান শাসক, কোরেশ-গোত্র প্রধান, আবু সুফিয়ানকেও যখন রোমক সম্রাট নবীজ্বী (দঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন -তখনো তিনি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেন নি। বরং, নির্দ্বিধায়, তিনিও তাঁকে চির সত্যবাদীই বলেছেন। তাঁকে চেনা শত্রু- মিত্র সকলের মতই।
বিশ্বের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, এমাইটি-তে পড়ানো, বিজ্ঞান-তাত্ত্বিক কার্ল পপারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির তত্ত্ব, যা ওপরে বর্ণিত তত্ব মোতাবেক, কোন একটি সম্ভাব্য বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ না করতে পারলে তা সত্য বলেই, বৈজ্ঞানিক ভাবেই, গ্রহণ করতে হবে। এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ীই, তা’ হলে, নবীজ্বী হজরত মোহাম্মদ (দঃ) যা বলেন, তার সবটাই সন্দেহাতীত ভাবে, সত্য। শুধু ধর্মীয়ই নয়, বৈজ্ঞানিক সত্যও।
বিশ্বাসী গণ তবে, কোন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবেই, তাঁর সব কথাকেই সত্য জানেন । বাদ বাকীদের জন্য, তাঁর সত্যবাদী হবার জন্য এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিই যথেষ্ট।
আর তাঁরই কথা মতে, আল্লাহ পাক তাঁকে এক অসাধারণ ভাবে, অতি দ্রুত গতিতে এক অসাধারণ যাত্রায় নিয়ে গিয়ে পার্থিব সময় হিসেবে মূহূর্তের ভেতরই আবার মক্কা সরীফে ফিরিয়ে আনেন । তাঁর মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফে চলে গিয়ে তাঁর ধর্ম রক্ষা, শিক্ষা ও প্রচারের নিরাপত্তার জন্য চলে যেত বাধ্য হবার পূর্বে, এক রজব মাসের ২৭ তম রাতে । এই অসাধারণ যাত্রারই নাম, “মে’রাজ”, আর যে রাত (“আরবীতে “লায়ল”, ফারসীতে “শব”, হিন্দীতে, “রজনী”) । দু’ শব্দ মিলে হয়েছে, “শবে’ মে’রাজ”।
যাত্রাটি হয়েছিল সজাগ সশরীরে, যদিও তার প্রস্তুতি স্বরূপ মে’রাজের পূর্বে একবার স্বপ্নেও নবীজ্বীকে (দঃ) এই যাত্রাটি দেখানো হয় বলে প্রতীয়মান । এমন তাঁর (দঃ) জীবণে অন্যান্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটণা ঘটবার পূর্বে নবীজ্বীকে স্বপ্নে ঘটণাটি দেখান হয়। উদাহরণ স্বরূপ, সাধারণতঃ কিছুটা ভুল-ভাবেই “মক্কা-বিজয়” বলে আখ্যাত, মক্কা-মুক্তির মহা ঘটণার সময়ও, ঘটণার পূর্বে, নবীজ্বীকে তা স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল। তাই বলে মক্কা-মুক্তি বা “মক্কা-বিজয়” স্রেফ স্বপ্নই ছিল, বাস্তবে, সজাগ সশরীরে ঘটনি যেমন বলা যাবে না । ঠিক সেভাবেই “মে’রাজ” শুধু স্বপ্নে হয়েছিল, সজাগ সশরীরে না, তা’ও বলা যাবে না। কেননা নবীজ্বী নিজেই বলেছেন বলে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি, বা মধ্যবর্তী অন্যান্য বিশ্বস্ত বলে নিযুক্ত বর্ণাকারীদের সাক্ষ্য-মূলক বর্ণনা থেকে তা’ই জানা যায় । বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি বিশ্বাসীরাও তাঁর (দঃ) যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তা’ই জেনে, ও বিশ্বাস করে এসেছে।
কিন্তু, তুলনামূলক অতি সাম্প্রতিক কালে, প্রধানতঃ বৃটিশ সহ বিভিন্ন ইয়ূরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা দখল করা দেশ সমূহে জনসধারণের ভেতর প্রচার করায় যে “মে’রাজ” ঘটেছিল স্রেফ স্বপ্নে । ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের ভেতর গন্ডগোল বাঁধিয়ে রেখে, দুর্বল করে দেশ শাসন ও লুট পাট করে যাবার জন্য বিভিন্ন নীতি দিয়ে তৈরী করা অতি ক্ষুদ্র স্থানীয় কিছু “আলেম” বা “স্কলার” সাজাদের দল দিয়ে, ছড়ানো অন্যান্য নানা ভ্রান্ত ধারণার মতই । যেখানে “মে’রাজ ছিল, শুধুই স্বপ্নে”, এই কথাটি গেলাতে পারেনি, সেখান কখনো কখনো এটা প্রচার করেছে যে যাত্রাটি ছিল শুধু “ইস্রা”, তথা, ইহলোকের মক্কা শরীফ থেকে যেরূসালেম পর্যন্ত শুধু।
সাধারন বিশ্বাসীদের এসব বিভেদ ও গন্ডগোল সৃষ্টি কারী ধারণা গেলানোর জন্য এরা, পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদ (Orientalist)-দের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে দুই পথের দু’টিই, বা যে কোন একটি অবলম্বন করে। এক দিকে, কোরান-হাদীসের সংশ্লিষ্ট আয়াত বা হাদীসের কথার খন্ডিত, আংশিক, বা প্রেক্ষিত-বিচ্ছিন্ন উপস্থাপনা দিয়ে বিভ্রান্ত করে।
অন্যদিকে, “বিজ্ঞান”-এর কথা বলে, “বৈজ্ঞানিক” শোনানো উল্টাপাল্টা মলম-বিক্রী মার্কা কথা বার্তা বলে । যা বৈজ্ঞানিক সত্যাসত্য নির্ধারণের বিজ্ঞান-সম্মত পদ্ধতির নিয়ম-নীতির লংঘনমূলক, মূলতঃ অবৈজ্ঞানিক।
এই সবের ধারা সৃষ্টির অন্যতম “পথীকৃত” ছিলেন, মোটামুটি গন্ডমূর্খ, বৃটিশ ঈষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বেতনভুক এক নিম্ন পর্যায়ের কেরানী। স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় সিপাহী বিপ্লবের সময় বৃটিশের দালালী করে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নৃশংস ব্যাপক গণহত্যার পর, বৃটিশদের যথাযত গোলামীর পুরষ্কার হিসেবে “স্যর” উপাধি সহ নানা ইনাম পাওয়া এক বিশ্বাসঘাতক। স্যর সৈয়দ আহমদ খান ।
বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাঁকে বিলাতে অক্সফোর্ডে নিয়ে পাশ্চাত্য- প্রতীচ্যবিদদের দিয়ে তার মগজ ধোলাই করে। ঘুরিয়ে এনে ভারতবর্ষে “স্কলার” সাজিয়ে তার উদ্যোগে শিক্ষা প্রসার, বিজ্ঞান, উন্নয়ণ ইত্যাদি মুখরোচক, মধুর-শ্রবনীয় কথাবার্তার আড়ালে জাতীয় সংস্কৃতি বিধ্বংসী নানা কর্ম কান্ডের ধারা সূচিত করায়।
এই স্যর সৈয়দ আহমদ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের খুশী করার মত একটি “বড়” ন্যাক্কারজনক কাজ করে।একটি তথাকথিত “বৈজ্ঞানিক” তথাকথিত “তফসীর” লেখে। তাতে কোরান শরীফে বর্ণিত সব অলৌকিক ঘটণার অলৌকিকতাকে অস্বীকার করে। তার জায়গায়, তাঁর নিজের মন মত, সেকালে “বৈজ্ঞানিক” বলে যে সব ধারনা প্রচলিত ছিল – তার কথা বলে, ও সব অলৌকিক ঘটণার অন্য, মিথ্যা ব্যাখ্যা দেয় ।
এই ধারাটি সাক্ষাত মূল ছিল সে সময় আমেরিকার বোস্টনে সূচিত ইতিমধ্যে হাজারো ফের্কায় বিভক্ত হয়ে পড়া খৃষ্টধর্মে “ক্রিশ্চান সাইন্স”, অর্থাত “খৃষ্টীয় বিজ্ঞান” নামে সূচিত আরেকটি নতুন ফের্কার অনুকরণে শুরু করা এই তথাকথিত “বৈজ্ঞানিক ইসলাম”-এর ধারণা । “ইসলাম” বলে চালানো, প্রকৃত প্রস্তাবে, এই ইসলামের পরিভাষার মোড়কে উপস্থাপিত নতুন একটি ধর্মে সব কিছুর স্রস্টা ও নিয়ামক হিসেবে “প্রকৃতি”, তথা, “ন্যাচার”-কেই ধরা হয়। তাই, আলেম ওলামা আর সাধারণ জনগণ এই নতুন ধর্মকে “ন্যাচারী” ফের্কা বলতে শুরু করে। আজকে যারা মে’রাজ শরীফের অলৌকিক ঘটণাবলিকে তাদের নিজেদের “বিজ্ঞান”-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার সঙ্গে মেলে না বলে সম্পূর্ণই বা আংশিক অস্বীকার করে - তারা ঐ উনবিংশ শতাব্দীর “ন্যাচারী” ফের্কার অনুসারী। সজ্ঞানে বা নিজেরই অজ্ঞাতে।
খোদার সাক্ষাত
ব্যাপকতর অর্থে, “মে’রাজ”-এর প্রথমাংশ, “ইস্রা” হয় মক্কা শরীফের কা’বা শরীফের মসজিদ, “মসজিদু’ল-হারাম”-এ কা’বা শরীফের “হিজর” নামক জায়গা থেকে। বুরাক নামক অতি দ্রুত উড়ানে সক্ষম একটি অশ্ব-সদৃশ প্রাণীর ওপর চড়ে, দু’পাশে উড়ে চলা জিব্রাঈল (আঃ) আর মীকাঈল (আঃ) ফেরেশতা সহ নবীজ্বী (দঃ) পথে ভবিষ্যতের মদীনা শরীফ সহ কয়েকটি জায়গায় নেমে নামাজ পড়ে, অবশেষে যেরূসালেমে বায়তুল মুক্বাদ্দস বা মসজিদুল আক্বসাতে পৌঁছান। জিব্রাঈল (আঃ)-এর আজানের পরে, সেখানে জমায়েত তাঁর পূর্বের সকল নবীদের (আঃ) জামাতে নামাজের ইমামতী করেন। সেখান থেকে তাঁর যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়, সংকীর্ণতর অর্থের “মে’রাজ”, উর্ধলোকের যাত্রায় রওনা হ’ন।
এই উর্ধলকের যাত্রায়, নবীজ্বী (দঃ) একে একে সাত আসমানে, তার বাশিন্দা কিছু নবীর (আঃ) সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তার পর, ইহলোকের শেষ সীমা জ্ঞাপক “সিদ্রাতুল-মুন্তাহা”, তথা “শেষ সীমার কুল বৃক্ষ” বলে আখ্যাত একটি অসাধারণ ও অতি সুন্দর আলোকোজ্জ্বল বৃক্ষ পর্যন্ত জিব্রাঈল (আঃ) সমভিব্যাহারে, নিজে বুরাকে চড় এসে পৌঁছান। এর পরে আরো উর্ধের উর্ধোলোকে খোদার আলোর আলো এতি তীব্র যে সেখানে যেতে, জিব্রাঈল আর বুরাক, দু’জনেরি আর ক্ষমতা ছিল না । যাবার চেষ্টা করলে তীব্র আলো দিয়ে সৃষ্ট জিব্রাঈল (আঃ)-এর ডানাও পুড়ে যাবে বলে, তিনি নবীজ্বীকে জানান। এর পর তঁকে একলাই যেতে বলেন।
তার পর খোদার তরফ থেকে আলোর একটি আবরণ এসে নবীজ্বীকে (দঃ) ঢেকে ফেললে, তাতে করেই তিনি উর্ধলোকে যাত্রা বজায় রাখেন। অবশেষে, নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে “খোদার আসন” বলে বলা হয়েছে যেই সুউচ্চ অবস্থানকে, তার পাদদেশ বলে বলা যাকে, “আরশ” নামক সে অবস্থানের ওপর গিয়ে পৌঁছান। সেখানে, কোরানের বর্ণনায় খোদার দুই ধনুক দূরত্ব, বা তার চেয়েও কম দূরত্বের সান্নিধ্য লাভ করে – খোদার দর্শন লাভ করেন।
তা জানা যায়, কোরান-ব্যাখ্যাকারী “মুফাসসির”-দের নেতা হিসেবে তাঁর দ্বারাই নিযুক্ত হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা. ) বর্ণিত হাদীস থেকে।
হজরত আয়শা (রা. )-এর এক বর্ণনা মতে তিনি নাকি বলেছেন, হজরত মোহাম্মদ (দঃ) নাকি মে’রাজের সময়ও খোদাকে দেখেন নি । তাই, কেউ কেউ মনে করেন যে হজরত মোহাম্মদের (দঃ) মে’রাজ সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী হিসেবে হজরত আয়শার (রাঃ)-ই বেশী জানবার কথা - তাই তাঁর কথিত বর্ণনা মতেই এটাই মনে করা যায়, যে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) মে’রাজের সময়ও খোদাকে দেখেন নি।
কিন্তু এটা ঠিক নয়, কেননা মে’রাজের সময় হজরত আয়শা তখনও বড় জোর ৬/৭ বছরের নাবালিকা, তখনও স্ত্রী রূপে নবীজ্বীর সঙ্গিনী হন নি। আর স্ত্রী হলেই যে স্বামীর সব জ্ঞান এক জনে জানবেন – এমন ত’ নয়। ডাক্তারের বউ হলেই কেউ ডাক্তার হয়ে যান না । হজরত আয়শা (রাঃ) অসাধারণ মহীয়সী, প্রাজ্ঞ ও জ্ঞানী হলেও, তিনি যে সব বিষয়ে নবীজ্বী (দঃ) জ্ঞানের উত্তরাধিকারী হবেন, এমন নয়। বরং, হজরত মোহাম্মদ, কোরান শরীফ ব্যাখ্যার জন্য নিজেরই বংশের, প্রায় সার্বক্ষণিক সেবক-সঙ্গী, হজ্রত আলীর মতই চাচাত ভাই, আব্দুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ)-কে কোরন-ব্যাখ্যা-কারীদের নেতা হিসেবে নিয়োগ দেন। আর মে’রাজের জ্ঞান মূলতঃ কোরান শরীফের র মে’রাজ শরীফ-সংক্রান্ত আয়াতের বিষয় । তাই, যদি দু’জনের বর্ণনায় পার্থক্য আসলেই দেখা যায়, তা’হলে, এ ক্ষেত্রে আব্দুল্লাহ বিন ‘আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনাই অনুসরণ করতে হবে। হজরত ওমর (রাঃ) ও, কোরান শরীফের ব্যাখ্যার বিষয়ে বড় বড় সাহাবীদের বর্ণণা র সঙ্গে হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের বর্ণণার পার্থক্য হলে, তাঁর ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেন।
বিজ্ঞানের কথা
পূর্বেই দেখেছি, বিশ্বের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো বিজ্ঞান-তাত্বিক কার্ল পপার-বর্ণিত বিজ্ঞান তত্ব মতে, কোন বক্তব্য অসত্য বলে প্রমান না হওয়া পর্যন্ত তাকে বৈজ্ঞানিক বিচারেই, সাময়িকক ভাবে হলেও, সত্য বলেই মেনে নিতে হবে । দেড় হাজার বছর অতিবাহিত হলেও, হজরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর বর্ণিত তাঁর মে’রাজ যাত্রার বর্ণণাকে আজ পর্যন্ত কেউ মিথ্যা বলে প্রমাণ করতে পারে নি।
বরং, উল্টোটাই হয়েছে। বিশেষ করে গত শতাব্দী ধরে ।
গত শতাব্দীর প্রথম দিকে, বিজ্ঞানী এলবার্ট আইন্সটাইনের বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ব (Theory of Relativity)- এর উপস্থাপণা, ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক-এর কণা পদার্থ বিজ্ঞান(Quantum Physics)-এর তত্ব, ও তারই মত অন্যান্য তত্ব মতে - মানুষ সহ সৃষ্ট জগতের সব সৃষ্টিই মূলতঃ আলোক কণিকা (“Photon”) দিয়ে সৃষ্ট। আর যথার্থ ব্যবস্থা হলে, একটি সৃষ্ট বস্তু বা একজন সৃষ্ট জীব, আলোর গতিতে ভ্রমণ করতে সক্ষম হতে পারেন। আর তা’ হলে, এমন ভ্রমণে ভ্রমণকারী, কোটি কোটি মাইলের দূরত্বও মূহূর্তে অতিক্রম করতে পারেন । পরন্তু, মহাকাশের ব্যাপ্তিতে স্থান-কালের আপেক্ষিকতার ভিত্তিতে, সময় থমকে যেতে পারে।
এ সব আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, মে’রাজ সফরের যা কিছু বর্ণনা জানা যায়, তার সব কিছুকে বৈজ্ঞানিক বিচারেও একেবারেই সম্ভব বলে দেখায়। যদিও সাধারণত তা ঘটে না।
ঐতিহাসিক দলীলাদি থেকে তার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত ত আছেই।
কিন্তু বিশ্বাসীর বিশ্বাস এ সবের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁরা চির সত্যবাদী বলে প্রমাণিত নবীজ্বীর (দঃ) বর্ণণার ভিত্তিতে বিশ্বাস করেন।যেমনটি এই প্রবন্ধের ইতিপূর্বে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
মে’রাজের শিক্ষা
সম্ভবতঃ মানুষ হজরত মোহাম্মদের (দঃ) মানুষ রূপেই, স্রষ্টার নৈকট্যগুণে সৃষ্ট জগতের এমন উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছানোর এই অসাধারণ গৌরবেই অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম “মোসলেম ভারত”-এ প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত “বিদ্রোহী” কবিতায় লেখেন,
“ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!"
তাঁর স্থান -কাল অনুযায়ী যে কাব্যিক ভাষা তিনি ব্যবহার করেন, তার প্রেক্ষিতানুযায়ী অর্থ না বুঝতে পেরে কেউ কেউ কবির এখানে বলা এ কথাকে খোদ খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক মনে করেছেন। আসলে তা মোটেই এমন নয়। বরং কথাটির অর্থ তার উল্টো। কবিতাটি যদি আসলেই খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক হতো, তা’হলে এক শতাব্দী পূর্বের চরম রক্ষণশীল বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য পত্রিকা “মোসলেম ভারত”-এর দাড়ি-টুপী ওয়ালা এক পর্যায়ের মাদ্রাসা শিক্ষক, সম্পাদক, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মলাটে মসজিদ আঁকা তাঁর ঐ “মোসলেম” পত্রিকায় তা প্রকাশ করতেন না।
বাংলার জাতীয় কবির ঐ কথার অর্থ হলো, প্রায় নিশ্চিতই, “বিধাতৃ”, “খোদার” “চির-বিস্ময়” সৃষ্টি - তাঁর সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, “আশরাফুল মখলূকাত”, হিসেবে সৃষ্ট - মানুষ, খোদারই আমন্ত্রণ তথা তাঁর ইচ্ছায়, খোদার নৈকট্যে সৃষ্ট জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়েরও ওপরে উঠে, খোদার সাক্ষাত সস্নেহ সান্নিধ্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম।
“মে’রাজের” কাহিনীর এটিই সর্বোচ্চ শিক্ষা, সম্ভবতঃ।
স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রূপ মানবের সৃষ্ট জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়েরও ওপরে উঠে খোদার ঐ সাক্ষাত সপ্রেম সান্নিধ্যে পৌঁছে সৃষ্ট জগতে তার সর্বোচ্চ স্থান অধিকার ও রক্ষার অন্তরায় হয় যা কিছু – স্রষ্টারই অভিপ্রায়ের প্রতিপক্ষে - সৃষ্টির সৃষ্ট অন্যায়, অবিচার, শ্রেণী ও বর্ণভেদ, জুলুম অত্যাচার, শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ, স্বৈরাচার – সে সব কিছুরই প্রতিপক্ষে বিদ্রোহও সে শিক্ষার অংশ।
বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহও সম্ভবতঃ মে’রাজের ঐ শিক্ষায়ই অনুপ্রাণিত। মে’রাজের ঘটণা ও শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই জর্মন জাতীয় কবি, “মোহাম্মদ” নামক তাঁর বিখ্যাত কাব্য, আর জর্মন দার্শণিক তাঁর বিশ্ববিখ্যাত “সুপারম্যান”-এর ধারণা রচণা করেন বলে প্রতীয়মান।
নিজেদেরই বার্ষিক উদযাপনের পার্বণ হিসেবে আপন করে নেয়া, এই মহাপার্বণে বাংলা জাতি সেই শিক্ষায়ই পুণর্বার অনুপ্রাণিত হোক।
লেখক : ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণা এবং পাশ্চাত্যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সমাজবিশ্লেষক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বসহ বিবিধ বিষয়ে গবেষণাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন।