হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অস্ত্র আছে সৌদি আরবের, কৌশল কি আছে

আমার দেশ অনলাইন

সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে লক্ষ করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল হুথিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অবশ্য জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেই ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে ঘটনার কিছু পরেই রাজধানীর বিমানবন্দরের কাছাকাছি জায়গায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। এই গ্রীষ্মে যুদ্ধ মারাত্মক আকার নেওয়ার পর রিয়াদে এটাই প্রথম আক্রমণ।

এই এক হামলাতেই আসল সত্যটা বেরিয়ে পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও আধুনিক সব অস্ত্র আছে সৌদি আরবের হাতে। অথচ এএফপির খবর অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই হুথিরাই এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের দখল নিয়ে বসে আছে। মোখা বন্দর তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির ঠিক মাঝখানে থাকা পেরিম দ্বীপও নিজেদের বলে দাবি করছে। সামরিক শক্তি থাকলেও ক্ষমতার ওপর সৌদিদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আসেনি।

এই যুদ্ধের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ হুথিরা যাতে এডেন শহর দখল করতে না পারে, সে জন্য সৌদি আরব বিমান হামলা শুরু করেছিল। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর লড়াই কিছুটা থেমেছিল। তবে এ বছরের ২০ জুলাই হুথিরা সৌদিদের সব বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে। ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ এবং ‘ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট’-এর তথ্য বলছে, সানা শহরে যাতে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের উপদেষ্টারা নামতে না পারেন, সৌদিরা সেই চেষ্টা করছিল। আর তাতেই ক্ষেপে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয় হুথিরা।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই লড়াইয়ে নামতে চায়নি, নিজেদের দূরে রেখেছে। ‘অ্যাক্সিওস’ দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেছিলেন। তিনি হুথিদের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। ‘রয়টার্স’ নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে একই ধরনের খবর দিয়েছে। অবশ্য হোয়াইট হাউজ বা মার্কিন সৌদি দূতাবাস এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এর সত্যতাও তাই পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি।

এরপর ট্রাম্প নিজেই জানান, হুথিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ১২ সেপ্টেম্বর ডাবলিনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হুথিরা আমাদের ফোন করেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না।’ তিনি আরো বলেন, হুথিরা বেশিরভাগ জাহাজকেই শান্তিতে চলাচল করতে দিচ্ছে, তবে ‘একটি দেশের ওপর তারা খুব একটা খুশি নয়।’ সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্পের ইঙ্গিতটা ছিল সৌদি আরবের দিকেই। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক বারবারা লিফ ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘পুরোপুরি বিস্ময়কর’ বলে মন্তব্য করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কিন্তু একেবারে মিথ্যা নয়, তবে তার একটা সীমা আছে। সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সোমবার জেদ্দায় যুবরাজের সঙ্গে দেখা করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত কিছু বলেননি। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসন মূলত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে আর লক্ষ্যবস্তু ঠিক করতে সৌদিদের সাহায্য করছে। এছাড়া কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষে ১৭ সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের ৪৮টি এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে গত নভেম্বরে রয়টার্স জানিয়েছিল, এই সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে ইসরাইলের বিমানগুলোর মতো সব ধরনের ক্ষমতা থাকবে না।

সানা সেন্টারের ইয়াসমিন আল-অ্যারিয়ানি আলজাজিরাকে বলেছেন, সংঘাতের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখন মূলত ‘হুথিদের ওপরই নির্ভর করছে’। তার মতে, এই মুহূর্তে রিয়াদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে হুথিদের একেবারে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে তাদের এক জায়গায় আটকে রাখা।

তাই সৌদি আরব এখন অন্যান্য দেশের সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে। আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ‘এনটিভি’কে বলেছেন, সৌদি আরবের কিছু প্রযুক্তিগত সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি জানান, ‘তাদের এই চাহিদা মেটাতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, এই চুক্তির অধীনে কোনো সামরিক পদক্ষেপের বিষয় নিয়ে এখনো কথা হয়নি। ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসমাইল নোমান তেলসি আলজাজিরাকে জানান, কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তুরস্ক সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না।

ইরানের ভূমিকা অবশ্য স্পষ্ট করে বোঝা বেশ কঠিন। রেভল্যুশনারি গার্ডের মুখপাত্র হোসেন মোহেব্বি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের এই সাফল্যকে ‘খোদার খাস রহমত’ বলে প্রশংসা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে আটকে দিতে পারে এমন একজন সঙ্গী পেয়ে তেহরান যে বেশ লাভবান হয়েছে, তা পরিষ্কার। হুথিরা বলছে, তারা শুধু সৌদি জাহাজগুলোকেই আটকে দিচ্ছে। ট্রাম্পও বলেছেন, অন্য বেশিরভাগ জাহাজই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছে।

তবে হুথিদেরও কিছু নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা সীমিত। তা ছাড়া ওয়াশিংটন সবসময় চেষ্টা করবে, যাতে ইরান তাদের কোনো নতুন রসদ পাঠাতে না পারে। অবশ্য সেই চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। চোরাচালানের রাস্তাগুলো খুব দ্রুত বদলে যায়, আর স্থানীয়ভাবেই তারা এখন অনেক অস্ত্র বানিয়ে নিচ্ছে। অস্ত্র বা যন্ত্রাংশের সরবরাহ কিছুটা হয়তো কমানো যাবে, তবে তা পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ভেতরের রাজনীতিও থাকতে পারে। কারণ সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে যদি কোনো মার্কিন সেনা মারা যায়, কিংবা পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গিয়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি ঘটে, তবে সেটা ট্রাম্পের জন্য বাজে বিষয় হবে। হতে পারে, তিনি সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছেন, শক্তি প্রয়োগের ভাবনা মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলেননি। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন চায় আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষিত থাকুক, তবে এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।

পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। একদিকে সৌদি আরব নতুন করে অস্ত্র জমাচ্ছে, অন্যদিকে হুথিরাও এখনো সৌদির শহর ও জাহাজগুলোতে হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে। কিংস কলেজ লন্ডনের নওয়াফ ওবায়েদ বলছেন, একটি শক্তিশালী জোট গড়ে উঠছে এবং একটি ‘বিশাল’ আক্রমণের প্রস্তুতি চলছে। এই যুদ্ধ হয়তো বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ, অস্ত্র সরবরাহ আর প্রক্সি বাহিনীর লড়াইয়ের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়বে, সরাসরি হাজার হাজার সৈন্য মাঠে নামানো হবে না। ‘সিউল ইকোনমিক ডেইলি’ জানিয়েছে, সৌদিকে রক্ষা করতে সৌদি আরব তাদের মিত্রদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছিল, তবে তাতে কেউ তেমন সাড়া দেয়নি।

এখানেই সৌদি প্রতিরক্ষা নীতির মূল দুর্বলতাটা চোখে পড়ে। বিপুল সামরিক শক্তি দিয়ে শত্রুকে আঘাত করা যায় ঠিকই, তবে সবসময় তাকে পুরোপুরি হারিয়ে দেওয়া যায় না। ২০১৫ সালেই এই পাঠ পেয়েছিল রিয়াদ, এখন আবার নতুন করে সেই ধাক্কা পাচ্ছে। সামরিক শক্তির সঙ্গে যদি একটি সঠিক রাজনৈতিক কৌশল না থাকে, তবে সৌদি আরব এবং তার সঙ্গীরা জয়ের দিকে নয়, বরং আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মনে এখন একটা বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছে, এই লড়াই কি তার চেয়েও বেশি দিন ধরে চলবে? বাবেল মানদেব হয়তো শিগগিরই এমন এক যুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে, যেখানে জড়িয়ে থাকবে সৌদি নিরাপত্তা, ইরানের আধিপত্য, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব আর পুরো বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর: জুলফিকার হায়দার

সম্মানিত পদ থেকে অসম্মানিত অব্যাহতি

মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান জরুরি

তালা বদলায়, দরজা বদলায় না—আর কত!!

জলাতঙ্ক নীরব ঘাতক, কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য

মোবাইল ফোনের দাসত্ব নাকি উন্মুক্ত শৈশব

বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমানের অভিষেক ও প্রত্যাশা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: শুধু কূটনীতিই কি যথেষ্ট

‘...কিন্তু আলোর দেখা পেলাম না’

শুধু ইরান নয়, হুথিদের অভিযানের তাৎপর্য আরো বড়