হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

১৫ আগস্টের স্মৃতি

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

১৪ আগস্ট রাত গিয়ে ১৫ আগস্টের ভোর হয়েছে। কিছু দূর থেকে গোলাগুলির শব্দ শুনলাম। আসাদ গেট নিউ কলোনি মসজিদের সামনে মিরপুর রোডের পাশেই ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে আমরা যারা একটু পরে মর্নিং ওয়াকে যাব, তারা চকিত হয়ে উঠলাম। শব্দটি ৩২ নম্বর রোডের ওদিক থেকে আসছে। আমাদের পাড়া, নিউ কলোনি থেকে একটি মাত্র বাস স্টপ দূরত্বে, মধ্যে শুধু লালমাটিয়া। শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম শেখ সাহেবের (তখনকার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান) ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে আসছে। একজন বলে উঠল, ‘জামালের বিয়ের আতশবাজির পটকা!’ বা ওই রকম কিছু। শেখ সাহেব প্রতিবেশী ছিলেন, আমাদের জন্মের অনেক আগে থেকেই বাবা তার সঙ্গে একসঙ্গে বিভিন্ন সংগ্রামে সহযোদ্ধা ছিলেন। বাবার মতো আমরাও সবসময় ‘শেখ সাহেব’ই বলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি, যদিও তিনি ‘চাচা’র মতোই ছিলেন। লোকেও সাধারণত তা-ই বলত। পরে তাকে উপাধি দেওয়া হলেও সেটা খুব আনুষ্ঠানিক মনে হয়। তার জন্য আমরা আমাদের পুরোনো অভ্যাসে থেকে যাই—তাকে ‘শেখ সাহেব’ বলার!

শেখ সাহেবের মেজ ছেলে জামাল কয়েক বছর আগে, আমরা স্কুলে পড়াকালে, আমাদের পাড়ায় আমাদের ক্রিকেট ক্লাবে ক্রিকেট খেলতে আসত। তখন সে সম্ভবত তার ছোট ছেলে ছিল। তার কনিষ্ঠতমের বোধ হয় তখনো জন্ম হয়নি—হলেও আমরা জানতাম না।

সেকালে আমাদের ক্রিকেট ক্লাবের নামডাক ছিল। ‘নিউ কলোনি ক্রিকেট ক্লাব’-এর সংক্ষেপণ হিসেবে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘এনসিসি’। সেকালের বিশ্ববিখ্যাত ইংল্যান্ডের ‘এমসিসি (ম্যারিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব)’-এর মতো শোনাত। তবে শুধু নামের জন্যই নয়, আমাদের ক্রিকেটারও ভালো ছিল। আমি স্পিন বোলার হয়ে গিয়েছিলাম ঘটনাচক্রে। ছোটবেলা থেকে আমার হাতের কবজি দুর্বল—তাই বল করতে গেলে বল স্পিন হয়ে যেত। শাপে বরের মতো হয়ে তাতে স্পিন বোলার হয়ে গিয়ে আদর-কদর পেতাম। তবে আসল ভালো ক্রিকেটার ছিল বাবু, আর তার বড় ভাই খোকা। জামাল ওই লালমাটিয়া পেরিয়ে আমাদের এখানে খেলতে আসত। একবার কী নিয়ে জানি আমাদের পাড়ার কোনো এক ছেলের সঙ্গে ঝগড়া হলে ছেলেটি জামালের সাইকেলটি আটকে রাখে। আমার এটা ভালো লাগেনি।

শেখ সাহেব দেশের বড় নেতা হয়ে উঠলে, আর আরো পরে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি হলে জামালের সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ থাকেনি। একসময় জামাল সামরিক অফিসার হওয়ার ট্রেনিংয়ে বিদেশ—যতদূর মনে পড়ে মার্শাল টিটোর যুগোস্লাভিয়ায় চলে গেল। ফিরে এলে তার বিয়ের অনুষ্ঠান হলো অতি সম্প্রতিই। তাই গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের কারো মনে হলো—সেই বিয়ের খুশিতেই হয়তো সেখানে কেউ পটকা ফোটাচ্ছে।

বিয়ে তো শুধু (শেখ) জামালেরই ছিল না—আমার ব্যাচমেট (শেখ) কামালেরও। ১৯৬৭ সালে স্কুল পাস করার পর ঢাকা কলেজে পড়তে গেলে জামালের পরিবর্তে কামাল হয়ে গেল আমাদের সতীর্থ। জামালকে আর দেখিনি—কলেজে কামালকে দেখি। তার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়নি; কিন্তু ক্লাসমেট বা ব্যাচমেট তো হয়। দুষ্টু ছিল বেশ। প্রিন্সিপাল জালাল স্যারকে একবার বিরক্ত করে একেবারে নাজেহাল করে ফেলে। ঘটনাটি আর পুরো মনে নেই—যতদূর মনে পড়ে, এটা হয়তো হবে কামালের কলেজের ওপর কালো পতাকা উড়িয়ে দেওয়া নিয়ে। বাংলাদেশের প্রথম পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষার প্রথম কলেজ হিসেবে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কলেজের ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে এমন কর্ম এর আগে কেউ করেনি। এতেই বোধ হয় চটে গিয়ে প্রিন্সিপাল জালাল স্যার কামালকে তাড়া করে ধরার চেষ্টা করেন। কামাল ছুটছিল করিডোর থেকে করিডোর হয়ে, আর স্যারও ছুটছিলেন তার পেছনে, আর ব্যর্থ হচ্ছিলেন। ছিল এক মজার দৃশ্য!

আমার হাইস্কুল বয়সে আমার একটু বড় ক্লাসমেট ‘মুখতার ভাই’ কলেজে এসে কামালের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যান। তার সঙ্গে এসে একদিন কামাল একটি লেখা চায়—সে একটা সংকলন বের করবে সেজন্য। আমি লিখে দিই। একসময় তার বাবা (শেখ সাহেব) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে বন্দি হলে অনেকে তার থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে। আমার এটা খারাপই লাগত। এ রকম সময়ে তার বড় বোন শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। বেশ গরিবানা সুরতে। শেখ সাহেব জেল থেকে মাত্র একটি আংটি নাকি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। তাদের তখন খুব দুর্দিন। তার তুলনায় ১৯৭৫ সালে কামাল-জামালের বিয়ে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে রাজকীয়ভাবে হয়। রাজকীয়ই—বিয়েতে তাদের সোনার মুকুট পরানো হয়। দেশে তখন দুর্ভিক্ষ—সে অবস্থায় অনেক বেশি ভালো খাবারের ব্যবস্থাসহ মাথায় মুকুট পরিয়ে বিয়ের খবরটি পত্রিকায় দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়ার ছবিসহ প্রকাশিত হলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।

কামালের বিয়ে হয়েছিল সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রুশ ভাষা শিক্ষার আমার সহপাঠিনী, অতি সুন্দরী ও সুশীল ক্রীড়াবিদ সুলতানার সঙ্গে। এসব খুশিরই বিষয় ছিল সে বাড়িতে। তাই বিয়ের পর বেশ কদিন ধরেই এসব খুশির উৎসব—তাতে পটকা—স্বাভাবিকই মনে হওয়ার কথা। তাই ‘জামালের বিয়ের পটকা!’ যে বলে সে হয়তো ওই চিন্তা থেকেই বলে থাকবে।

কিন্তু আমার যেন কেন মনটা ধক করে উঠল; বললাম, ‘না—৩২ নম্বরে কিছু হয়ে গেছে!’

আমি তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক-সম্মান, আর রাজনীতি বিজ্ঞান ও ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতকোত্তরের পড়ুয়া। ওসব বিষয়ের আমার সহপাঠী আর দশ ছাত্রের চেয়ে ওসব নিয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করতাম। রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে ছিলাম—আব্বা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে জিন্নাহ সাহেব আর সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বাধীন শেখ সাহেবের মতো তারই সহযোদ্ধা ছিলেন, পরে হক সাহেব আর ভাসানী সাহেবসহ তাদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের বাঙালির অধিকার সংগ্রামেরও সক্রিয় ছিলেন—যদিও ১৯৫৮ সালের সেনা-অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনীতি থেকে শতভাগ দূরে থাকেন। এসবের কারণে আমার ভেতর প্রখর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল—সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নিয়মিত অতি জনপ্রিয় কলাম লিখতাম। কিছুদিন আগেই একটি কলামে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, দেশ যে দুর্বিষহ অবস্থায়—তা হয়তো শেষ হবে সামরিক হস্তক্ষেপে। হলোও তা-ই। তা যে এমন পর্যায়ের হবে, সেটি আমিও কল্পনা করতে পারিনি।

জামাল-কামালের বিয়ের আতশবাজির পটকা নয়—‘৩২ নম্বরে কিছু একটা হয়ে গেছে!’ বলে যে আশঙ্কা করেছিলাম, তা-ই হলো।

পায়ে হেঁটেই ছুটে গেলাম, ৩২ নম্বরের দিকে। ছাত্র মানুষ—রিকশা ডেকে ওঠার কোনো অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এমনিতে আমাদের ওখান থেকে ৩২ নম্বর পায়ে হেঁটে যাওয়ার মতো জায়গাই। কাছেই।

সোবহানবাগ মসজিদের সামনে পর্যন্ত যেতে পেরেছিলাম—এরপর প্রতিবন্ধক; যেতে পারলাম না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ৩ তারিখ থেকে প্রতিদিনই ৩২ নম্বরে থাকতাম অনেক রাত পর্যন্ত, দেশে যে ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছিল তা দেখে বোঝার ও স্মরণ রাখার জন্য। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৮টা বা তার একটু পর পর্যন্ত শেখ সাহেবের গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের স্বল্প আগে পর্যন্ত ওখানেই ছিলাম। তারপর তিনি পাকিস্তানে নজরবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে আমাদের বাসার পাশেরই কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে নেমে এসে ক্ষমতার চূড়ান্তে আসীন হওয়ার পরে আর কখনো যাইনি—অত্যন্ত ভয়ংকরভাবে তিনি ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। আর গিয়েছি ওভাবে সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দৌড়ে গিয়েই, বলা চলে—তার বাড়ির এলাকায়ই ঢুকতে পারিনি। ক্ষমতা ও ক্ষমতাসীন থেকে দূরে থাকাটাই আমাদের ঐতিহ্য হিসেবে ছোটবেলা থেকেই শিখেছিলাম—ওতে চাটুকারিতা আর লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে অসৎ উপার্জনের সম্ভাবনা থেকে বেঁচে থাকা যায়, যা জ্ঞান সাধকদের দায়িত্ব।

কিছুদিন আগেই নতুন খণ্ডকালীন চাকরিতে ঢুকেছিলাম রেডিওতে—শাহবাগে তখন তার অফিস। কাজে গেলাম—

বাসার কাছেই পথে শুনলাম, সৈন্যরা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শেখ সাহেব আর তার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলেছে—সবাই যার ত্রাসে কাঁপত, সেই অতি কঠোর শেখ মণিকেও নাকি! দেখি, কিছু লোক মিষ্টি বিতরণ করছে। জায়গায় জায়গায় লোকে জটলা করছে। ভাবলাম, কেউ মারা গেলে এভাবে মিষ্টি খায়—খুশি হয়? মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে, ক্লাস টেনে বোধ হয়, ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে একটি কবিতা ছিল ‘Patriot’, অর্থাৎ ‘দেশপ্রেমিক’। হেডমাস্টার সাহেব ইংরেজি পড়াতেন। কবিতাটির বিষয় ছিল দুটি দৃশ্য—একজন দেশপ্রেমিকের বীরবেশে জননন্দিত হয়ে শহরে ঢোকার; আর পরে জনধিকৃত রূপে মৃত্যুদণ্ড দিতে তাকে নিয়ে যাওয়ার।

কী নিষ্ঠুর ইতিহাসের শিক্ষাদান পদ্ধতি!

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তার দেশে ফেরার দিনের দৃশ্যটি চোখে ভেসে উঠল—কী বিশাল ভিড় তাকে স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নিতে আগত! আর মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার মৃত্যুতে তার বাসায় পর্যন্ত যেতে পারলাম না; লোকে মিষ্টি বিতরণ করছে!

একসময়কার খেলার সঙ্গী জামাল, সহপাঠী কামাল, সহপাঠিনী সুলতানা—শেখ সাহেব, কেউ নেই!

শাহবাগে চাকরিতে গিয়ে দেখি, রেডিও অফিসের সামনে একটু দূরে শ্রমিক আছেন—কর্মচারী বোধ হয় কাজে যাচ্ছেন। ঠিক বাইরে ফুটপাতে কিছু সৈন্য বসে আছেন—বন্দুক সঙ্গে। শুনলাম, ওরাই নাকি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ওসব করেছেন। তারা নাকি বলছেন, তারা ক্ষমতা চান না—দেশের যা দরকার ছিল করে দিয়েছেন, এখন দেশবাসী এসে ক্ষমতা নিক।

দেশবাসী, জনগণ কি কখনো ক্ষমতা নিতে পারে? জনগণের নামে প্রায় সবসময়ই ক্ষমতা নেয় শক্তিশালী কোনো একটি গোষ্ঠী—কখনো নগ্নভাবে, কখনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্দার আড়ালের পেছন থেকে। সব দেশেই, সব কালেই। এটাও ইতিহাসের এক রূঢ় সত্য, তার শিক্ষা। জনগণের জন্য আসলেই সর্বোচ্চ সম্ভব প্রাপ্তি যা, তা হলো, জ্ঞানবৃদ্ধ জ্ঞানর্ষি রাজর্ষিগণের সস্নেহ অভিভাবকত্বে, সৎ সাহসী তারুণ্যের সক্রিয় সুরক্ষা ও সেবার মাধ্যমে নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার নিশ্চিতি। এর জন্য দরকার জনগণমনের অবচেতনায় প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে লালিত ঐতিহ্যবাহী জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের অবিরাম সংগ্রাম।

লেখক : ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও গবেষক; ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ; সংবিধান ও মানবাধিকার-বিষয়ক আইনজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী

চিকিৎসার জন্য বিদেশ নয়, এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে চায় সরকার

ফক্স স্পোর্টস বলছে, বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ৬৯%

ইরানে হামলার জন্য ক্ষমা চাইবেন না ট্রাম্প

সকালে মেথি ভেজানো পানি: কতটা উপকারী, কী বলছে বিজ্ঞান?

প্রাণহানির পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তে ৩ কমিটি

ভারতজুড়ে বোমা হামলার হুমকি, আতঙ্কে নয়াদিল্লি

সাপের কামড়ে মৃত্যু, ঝাড়ফুঁকে জীবিত করার চেষ্টা

পোল্যান্ডে বাংলাদেশিদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে জরুরি নির্দেশনা

প্রধানমন্ত্রীর জনকল্যাণমূলক কা‌জকে স্বাগত জা‌নি‌য়ে ছাত্রদলের শোভাযাত্রা

নতুন আয়ের ব্যবস্থা আনছে এক্স