হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গণভোটে ‘না’ ভোটের ব্যবচ্ছেদ

মন্তব্য প্রতিবেদন

মাহমুদুর রহমান

এবারের নির্বাচনে দুটি ব্যালট ছিল। একটি প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর গণভোট। অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল জয় পেয়েছে বিএনপি। আবার ওদিকে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে প্রায় একই রকম দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাধিক্যে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অঙ্ক তো ঠিকই আছে। নিশ্চয়ই জয়ীরা হ্যাঁ এবং পরাজিতরা না ভোট দিয়েছে।

কিন্তু বিষয়টি অতটা সরল নয়। আসনওয়ারি দলীয় এবং ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের খানিকটা ব্যবচ্ছেদ করলেই আমরা মোটামুটি রহস্যভেদ করে ফেলতে পারব। আজকের লেখায় আমি সেই চেষ্টাটাই করতে চাচ্ছি। গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে সিল দিয়েছেন ৩১ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি ভোটদাতা। আমি ভোটের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে সেই সব ‘না’পন্থিদের নিম্নোক্ত চার দলে ভাগ করেছি :

১. ফ্যাসিবাদ সহযোগী ও সমর্থক গোষ্ঠী : গোপালগঞ্জের উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। ফ্যাসিস্ট শেখ পরিবারের এই জমিদারিতে তিনটি আসনের সবগুলোতেই গণভোট প্রদানের সংখ্যা দলীয় ভোট প্রদানের চেয়ে ২৫ থেকে ৫০ হাজার বেশি। গোপালগঞ্জ-১, ২ এবং ৩ আসনে গণভোটে অংশ নিয়েছেন যথাক্রমে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৪, ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯২ এবং ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ জন ভোটার। অথচ বিজয়ী প্রার্থীরা মিলে তিন আসনে ভোট পেয়েছেন যথাক্রমে ১ লাখ ৩০ হাজার, ৮০ হাজার এবং ১ লাখ।

অর্থাৎ ভোটদাতাদের এক বিশাল সংখ্যা কেবল ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে সিল মারতে গিয়েছিলেন। আপনাদের কি মনে হয় ফ্যাসিবাদের কট্টর সমর্থকরা এত কষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে গেছেন? দুদিন আগে আমার দেশ পত্রিকায় ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের বিশদ পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। গোপালগঞ্জের তিন আসনেই ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। পরাজয়ের আসনওয়ারি ব্যবধান যথাক্রমে ৭৩ হাজার ৫৮২, ৭২ হাজার ৯৮৮ এবং ৫৮ হাজার ৮৭০। আরো জেনে রাখুন, গোপালগঞ্জের ৭২ শতাংশ ভোটদাতা সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আরো একটি প্রশ্ন সংগত কারণেই জাগতে পারে। বিএনপি তো তিন আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। তাহলে ধানের শীষের সমর্থকরা কোথায় ভোট দিয়েছেন? এর জবাবেও কোনো জটিলতা নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নব্য বিএনপি সমর্থকদের মধ্যেও এক উল্লেখযোগ্য অংশ ‘না’তে সিল মেরেছেন।

কাহিনি শুধু গোপালগঞ্জেই সীমাবদ্ধ নয়। বৃহত্তর ফরিদপুর এবং আওয়ামী অধ্যুষিত অঞ্চল বলে পরিচিত অধিকাংশ আসনেই ‘না’ ভোট তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে। মাদারীপুরের প্রতিটি আসনে বিপুল সংখ্যায় ‘না’ ভোট পড়েছে। মাদারীপুর-২ আসনে তো মাত্র ৪০৬ ভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতেছে। এই আসনে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর পক্ষে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৮ হাজার ৩১৭ এবং ৮৭ হাজার ৯১১। আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হারিয়ে বিএনপি জিতেছে। মাগুরার দুই আসন, নড়াইল-১, খুলনা-১ এবং খুলনা-৫ আসনে প্রচুর ‘না’ ভোট পড়েছে।

এর সবগুলোতেই বিএনপি জয়লাভ করেছে। আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগে পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে যে ১২টি আসনে ‘না’ জিতেছে, সেই আসনগুলো জানিয়ে রাখছি। ঝিনাইদহ-১, গোপালগঞ্জ-১, ২ ও ৩, সুনামগঞ্জ-২, নেত্রকোনা-৪, চট্টগ্রাম-৮, ১২ ও ১৩, পার্বত্য খাগড়াছড়ি, পার্বত্য রাঙামাটি এবং পার্বত্য বান্দরবানে ‘না’ জিতেছে। সবগুলো ‘না’ ভোট জেতা আসনে বিএনপি জয়লাভ করেছে। তিনটি পার্বত্য জেলাতেই কেন ‘না’ জিতল, এটা নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বোধহয় পৃথক আলোচনা হওয়া আবশ্যক। পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন ক্রমাগত দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে যাচ্ছে সেটা ভাবা দরকার। ফ্যাসিবাদ সমর্থক শ্রেণির মধ্যে জাতীয় পার্টি আগাম ঘোষণা দিয়ে ‘না’তে ভোট দিয়েছে। দিল্লির দুই নম্বর দালাল দলটি সারা দেশে ১ শতাংশের নিচে ভোট পেয়ে রাজনীতিতে কবরস্থ হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই গণধিকৃতরা না ভোট বেছে নিয়েছে।

২. কওমি গোষ্ঠী : পরিচিত আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকার বাইরে চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলে প্রচুর ‘না’ ভোট পড়েছে। চট্টগ্রামের তিনটি আসন এবং বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জের একটি আসনে ‘না’ ভোট জয়লাভ করেছে। কওমি গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘না’ ভোটের সম্পর্কের বিষয়ে আমি নির্বাচনের কয়েকদিন আগে জানতে পারি। আমার এক আধুনিক কিন্তু ধর্মপালনকারী বন্ধু হঠাৎ একদিন ফোন করে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে তার সংশয়ের কথা আমাকে জানিয়ে পরামর্শ চাইলেন।

তিনি কওমি আলেমদের কাছে শুনেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বাংলাদেশ সমকামীদের স্বর্গভূমিতে পরিণত হবে। এ বিষয়ে তিনি নাকি বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের খুতবাও শুনেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে খতিব সাহেবকে চিনি এবং একজন বিনয়ী, সরল ব্যক্তি হিসেবে তাকে পছন্দ করি। তিনি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নিয়ে ঠিক কী বলেছেন আমার জানা নেই। তবে পরবর্তী সময়ে আমার সহকর্মীরা জানিয়েছিলেন যে, তিনি ‘হ্যাঁ’-এর ব্যাপারে আসলেই নেতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। যাহোক, আমি বন্ধুকে বললাম, “আমাকে তো সবাই কট্টর ইসলামপন্থি বলেই জানে। আমার সমকামীদের ব্যাপারে বিশেষ প্রীতি বোধ করার কোনো কারণ নেই। কওমি আলেমদের সব কথায় বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখি না। ‘হ্যাঁ’তে ভোট না দিলে সেটা জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলে আমি মনে করি।” সেই বন্ধুটি ভোট দেওয়ার সময় আমার কথা শুনেছিল নাকি কওমি আলেম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল আমার জানা নেই। আমি চট্টগ্রামের তিন আসনে ‘না’ ভোটের জয়লাভের বিষয়ে ফিরে আসছি।

চট্টগ্রাম ৮, ১২ এবং ১৩ আসনে জয়লাভ করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ, এনামুল হক এনাম এবং সরওয়ার জামাল নিজাম। তিনজনের সঙ্গেই আমার একসময় প্রীতির সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে, এরশাদ উল্লাহকে আমি ২০০৮ সালে সেই সময়ের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের প্রবল অসম্মতি উপেক্ষা করে দলীয় মনোনয়ন পেতে সহায়তা করেছিলাম। সেই এরশাদ উল্লাহ এবার নির্বাচনি প্রচারে ‘না’ ভোটের পক্ষে ছিলেন বলে আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো আমাকে জানিয়েছিল।

আমি ধরে নিয়েছিলাম এরশাদ উল্লাহ তার দলীয় নির্দেশনা প্রতিপালন করছেন। মূল কথা হলো, আমি নিশ্চিত যে কওমি প্রচারণা চট্টগ্রামে ‘না’ ভোটের আধিক্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া, নির্বাচনি প্রচার চলাকালে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম জাতীয় বক্তব্য ‘না’ ভোটের ক্ষেত্রেও কাজে দিয়েছে। জামায়াত এবং এনসিপি জোট দৃঢ়ভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকায় কওমি প্রভাবিত চট্টগ্রামের ভোটাররা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া যেহেতু হারাম, সে কারণেই ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেওয়াও হারাম। আসলে বাংলাদেশেও ইসলামি বিশ্বের মতোই ‘উম্মাহর ঐক্য’ একটা বায়বীয় ‘মিথ’ হয়েই থাকবে। আমি কখনো কোনো আলেমের কণ্ঠে শাপলা গণহত্যাকারী, হিন্দুত্ববাদের গোলাম শেখ হাসিনাকে ভোট দেওয়া হারাম এমন কোনো ফতোয়া শুনিনি। বিতর্ক সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও ‘না’ ভোটের পেছনে আরো একটি সম্ভাবনার কথা না বলে পারছি না।

সারা দেশে চট্টগ্রামের এস আলম একজন লুটেরা ‘অলিগার্ক’ এবং হাসিনার লুটপাটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পেলেও তার এলাকায় তিনি একজন ‘বিশিষ্ট দানবীর’Ñ যে কিনা মক্তব, মসজিদ, মাদরাসায় মুক্তহস্তে দান করে থাকেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে দুর্নীতির বিষয়ে একধরনের সহনশীলতা মজ্জাগত হয়ে গেছে। সবাই নিজের লাভটা দেখতেই অধিক আগ্রহী। দেশ গোল্লায় গেলে তাদের যেন তেমন কিছু যায় আসে না। এলাকায় উদারহস্তে অর্থকড়ি ব্যয় করলেই লোকজন খুশি। সম্পদের উৎস নিয়ে দানগ্রহীতাদের মধ্যে তেমন একটা মাথাব্যথা দেখা যায় না। এস আলমের মতো দুর্নীতিবাজ ‘অলিগার্ক’রা সব সময় সংস্কারের বিপক্ষে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মেরে দেওয়া পলাতক ব্যক্তিটি সংস্কারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে তার সবটুকু প্রভাব খাটিয়েছেন বলেই আমার ধারণা। হাসিনা-রেহানার দোসর লোকটির দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের যেহেতু কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, কাজেই সেই অর্থের কিয়দংশ তিনি এবারের নির্বাচনেও প্রভাব খাটাতে ব্যয় করেছেন মনে করা যেতে পারে।

৩. বিএনপির বিভ্রান্ত নেতাকর্মীদের ভোট : গণভোটে বিএনপির প্রকৃত অবস্থান নিয়ে বরাবরই ধোঁয়াশা ছিল। জুলাই সনদ নিয়ে নানা বিষয়ে অসন্তোষ বিএনপি সর্বদলীয় আলোচনার প্রাথমিক অবস্থা থেকে কখনোই লুকায়নি। জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পলায়নের পর স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এই দুই ধারায় আবর্তিত হয়েছে। মাঝখানে এরশাদ একজন জালিয়াতের বেশি কিছু ছিল না যার দলের দাফন এবারের নির্বাচনে হয়ে গেছে। সুতরাং, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে যে বিএনপি ক্ষমতাসীন হবে তা নিয়ে সন্দেহ কেন সৃষ্টি হয়েছিল সেটাই আমার অজানা। যাহোক, আমার আজকের আলোচনা ভিন্ন। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা আছে।

গণভোটে কোথায় সিল মারবে এ নিয়ে বিএনপির উপরোক্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব নির্বাচনের দিন পর্যন্ত মেটেনি। ওইদিন সকাল থেকেই আমাদের পত্রিকা অফিসে বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘না’তে ভোট দেওয়া ফেসবুকের ছবি প্রচুর সংখ্যায় আসতে থাকে। আমার এক সিনিয়র সহকর্মী ভোট দিয়ে এসে জানালেন যে, তাকে বিএনপির কর্মীরা ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে রীতিমতো জোরাজুরি করেছে। তিনি অবশ্য ‘হ্যাঁ’তেই ভোট দিয়েছেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের কাছ থেকে শুনেছি, তাদেরকে প্রচারকালীন সময়ে এ ব্যাপারে নীরব থাকতে হাই কমান্ড থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে দলটির তৃণমূলে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, বিএনপি নীতিগতভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে। দলীয় প্রধান তারেক রহমান রংপুরের জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বললেও বিএনপির ভোটারদের দ্বিধার অবসান হয়নি। ভোটের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, তাদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ ‘না’তে ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে বিএনপি জোট, জামায়াত-এনসিপি জোট এবং অন্যান্যরা যথাক্রমে ৫০, ৩৭ ও ১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

যে ৩৭ শতাংশ ভোটার জামায়াত জোটকে পছন্দ করেছে, তারা সবাই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল বলেই যেকোনো যুক্তিসংগত মানুষের ধারণা করা উচিত। সেই ভোটের সঙ্গে আমরা যদি ধরে নিই ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ছোট দল যারা পিআর পদ্ধতির পক্ষে, তারাও ‘হ্যাঁ’তে সিল দিয়েছে তাহলে সেই ধারণাও অযৌক্তিক না হওয়ারই কথা। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, বিএনপির বাইরের মোটামুটি ৪০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। ‘হ্যাঁ’তে ভোট প্রদানের হার যেহেতু ৬৯ শতাংশের কাছাকাছি, সে ক্ষেত্রে বাদবাকি ২৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এসেছে বিএনপির ভোটারদের কাছ থেকে। পরিসংখ্যানের এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিএনপির ভোটারদের মধ্যে ৪০ শতাংশের কিছু বেশি সম্ভবত ‘না’তেই ভোট দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঝিনাইদহ-১ এবং নেত্রকোনা-৪ আসনে ‘না’ ভোটের বিজয় যথেষ্ট বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। উভয় আসনেই বিএনপির দুই অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। ঝিনাইদহে সদ্য সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮১ ভোট।

তার বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৫৭ হাজার ৫৫ ভোট। এখানে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে যথাক্রমে ৯৫ হাজার ৭৪৩ এবং ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৬২। অপরদিকে নেত্রকোনা-৪ আসনে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবর ১ লাখ ৬০ হাজার ৮০১ ভোট পেয়ে বিশাল বিজয় পেয়েছেন। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন সাকুল্যে ৩৯ হাজার ৮৪০ ভোট। এখানে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ পেয়েছে যথাক্রমে ৮২ হাজার ১২৫ এবং ১ লাখ ২ হাজার ১১৩। ঝিনাইদহ-১ এবং নেত্রকোনা-৪ আসনের বিএনপি সমর্থকরা কেন সব দল বেঁধে ‘না’ বেছে নিলেন, এই রহস্যের কিনারা হওয়া দরকার। বিশেষ করে ড. ইউনূস সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী অ্যাটর্নি জেনারেল কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তার আসনে জোরেশোরে প্রচার চালাননি, সেটা জানা গেলে আমার বিশ্লেষণ আরো পূর্ণতা পেত। আমি ব্যক্তিগতভাবে আসাদুজ্জামানকে অনেকদিন ধরে চিনি। আমরা উভয়ে উভয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী। সুযোগ পেলে তার কাছ থেকে আমি প্রকৃত তথ্য অবশ্যই জানার চেষ্টা করব।

এবারের নির্বাচনে অনেক আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন, যাদের মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৫ শতাংশের অধিক। এই ভোটারদের মধ্যে হ্যাঁ-না ভোট বিশ্লেষণ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান আমার কাছে না থাকায় কোনো মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকছি। তবে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ঢাকা এবং চারপাশে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

৪. বর্তমানে বিএনপি, গুপ্ত আওয়ামী বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-ইউটিউবার : এবারের নির্বাচনি প্রচারে বিএনপি ‘গুপ্ত’ শব্দটি বেশ জনপ্রিয় করতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকে জামায়াত ও শিবিরকে উদ্দেশ করেই ছাত্রদল এবং বিএনপির নেতারা গুপ্ত গুপ্ত বলে নিয়মিত জপেছেন। অপরদিকে বেশ কিছুদিন ধরে বিএনপিতেও পুরোনো বাম ঘরানার লোকজনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এই শ্রেণিকে বোঝাতেই বিএনপির কাছ থেকে আমি ‘গুপ্ত’ ধার নিয়েছি। এরা অনেকেই গত এক বছরে জনপ্রিয় ইউটিউব এবং টক শো স্টার হয়েছেন।

তারা অনবরত জুলাই সনদের বিরোধিতা করে গেছেন। তাদের গণভোটবিরোধী প্রচারে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা যথেষ্ট মাত্রায় বিভ্রান্ত হয়েছেন। এমনকি, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও আমি এক টক শোতে শুনছিলাম যে এই শ্রেণির বিএনপিপন্থি ইউটিউবাররা জুলাই সনদ এবং গণভোট নিয়ে রীতিমতো হাসিতামাশা করছেন। কেউ কেউ তো গণভোটকে সরাসরি অবৈধ আখ্যাও দিয়েছেন। সুতরাং, নব্য বিএনপির ‘গুপ্ত’ বুদ্ধিজীবীরা যে সবাই ‘না’তে সিল দিয়েছেন এটা নিশ্চিতভাবে ধারণা করা যেতে পারে।

শেষকথা

জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, তার অনেকগুলোই গণভোটে ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে অনুমোদিত হয়েছে। জুলাই সনদ খসড়া প্রস্তুতিতে জটিলতা তৈরি হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে যেগুলো তীব্র বিতর্কের পর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ পর্যন্ত পৌঁছেছিল তার মধ্যে অন্যতম, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি এবং কয়েকটি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের বিধান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন।

এখানে ‘স্বাক্ষরিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করতে পারেন, (১) জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যেসব ইস্যুতে দেওয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে বিএনপি আইনগতভাবে বাধ্য নয়, এবং (২) যেহেতু বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছে, কাজেই সংসদে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী সংবিধান সংশোধনের অধিকার কোনো গণভোট দ্বারা বারিত হতে পারে না। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীদের গণভোটকে অবৈধ দাবি করার মধ্যে দ্বিতীয় যুক্তির ইঙ্গিত রয়েছে।

অপরদিকে এটাও তো সত্য, যে ভোটারদের ৫০ শতাংশ বিএনপি জোটের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই ভোটারদের চেয়ে অনেক বেশি ৬৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সিল দিয়েছে। এখন আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যায় ভোটারদের ৫০ ভাগ জিতবে নাকি ৬৯ ভাগ জিতবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এই বিতর্কে ভবিষ্যতে রাজপথ উত্তপ্ত হলে আমি আশ্চর্য হব না। গতকাল সরকারি দল গণপরিষদের শপথ গ্রহণ না করার মাধ্যমে জুলাই সনদ নিয়ে ভবিষ্যৎ জটিলতার আলামত পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে।

সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর বয়ান এবং রাজনৈতিক সমঝোতা

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের শক্তি ও প্রভাব কি কমছে

বিএনপির ভূমিধস বিজয় ও ‘হলুদ সিগন্যাল’

জিয়াউর রহমানের আদলে ক্যাবিনেট গঠন করবেন তারেক রহমান

‘ভালোবাসা’ দিবস

স্বাধীন রাষ্ট্রে মানসিক পরাধীনতা

ডিজিটাল ডেটা নিয়ে নীতিমালা প্রয়োজন

বিবর্তিত বিশ্বাসঘাতকতা

ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসের বৈশ্বিক প্রভাব

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা