বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি কৃষি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এলেও কৃষি এখনো জাতীয় জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষিই দেশের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে, বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে।
কিন্তু একটি কঠিন বাস্তবতা হলো কৃষকরা আজও নানা অবহেলার শিকার। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে।
অন্যদিকে দেশের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল ও অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ দুর্ভোগের মুখে পড়েন। ফলে কৃষি আজ শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ধান উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। বিশেষ করে, বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দেয়। এ কারণে কৃষি খাতের যেকোনো সংকট সরাসরি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।
বর্তমানে কৃষি উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সেচ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি কৃষকের ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই উঠে না।
উৎপাদক লোকসানে থাকলেও ভোক্তা উচ্চমূল্যে চাল কিনতে বাধ্য হন। অর্থাৎ কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন আর লাভবান হয় একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী।
সরকার প্রতিবছর ধান ও চাল কেনার ঘোষণা দিলেও অধিকাংশ কৃষক সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নিবন্ধন, কৃষি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নির্ধারিত মান পূরণের শর্ত থাকে।
গ্রামীণ এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগীরাই সরকারি ক্রয় সুবিধা ভোগ করেন।
এ সংকটের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় দেশের হাওরাঞ্চলে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা দেশের অন্যতম ধান উৎপাদন অঞ্চল। বিশেষ করে, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চল বোরো ধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর এখানকার কৃষকরা একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করে পুরো বছরের জীবিকা নির্বাহ করেন। অর্থাৎ একটি ফসল নষ্ট হলে পুরো পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে অতিবৃষ্টির ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল খুব অল্প সময়ে হাওরে প্রবেশ করে। নদী ও খালের নাব্য কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হওয়া এবং পলি জমে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার বড় কারণ।
হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও বড় সমস্যা। প্রতিবছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সময়মতো বাঁধ নির্মাণ বা মেরামত সম্পন্ন হয় না—এমন অভিযোগ প্রায়ই ওঠে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা ও অতিবৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে, যা কৃষির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষককে শুধু ভর্তুকি বা সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে দেখলে হবে না; বরং কৃষিকে লাভজনক খাতে রূপান্তর করতে হবে।
কৃষকের জন্য লাভজনক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কার্যকর করতে হবে, যা উৎপাদন ব্যয় ও যৌক্তিক মুনাফার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। শুধু মূল্য ঘোষণা নয়, বাস্তবে তা কার্যকর নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি ধান ক্রয়ব্যবস্থাকে আরো সহজ, ডিজিটাল ও কৃষকবান্ধব করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক যেন সরাসরি সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আধুনিক গুদাম ও শীতল সংরক্ষণব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।
হাওরাঞ্চলে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও বাঁধ উন্নয়ন জরুরি। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে নদী ও খাল খনন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আগাম বন্যা সতর্কীকরণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে।
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কম সময়ে ফসল কাটতে সক্ষম হারভেস্টার, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত এবং দ্রুত পরিপক্ব বোরো ধানের উন্নয়ন কৃষকদের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের জন্য স্বল্পমেয়াদি জাত সম্প্রসারণ করলে আগাম বন্যার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।
কৃষিবীমা চালু করা সময়ের দাবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন আবার উৎপাদনে ফিরতে পারেন, সেজন্য ক্ষতিপূরণভিত্তিক কৃষিবীমা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই এটি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদক নন; তিনি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। অথচ আজ সেই কৃষকই ন্যায্যমূল্যহীনতা, বাজার বৈষম্য ও জলবায়ু দুর্যোগের চাপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। বিশেষ করে, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সংকট জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। কৃষকের ঘরে হাসি ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু মৌসুমি প্রণোদনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।
লেখক : যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও কৃষি সম্পাদক
এনসিপি