হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাজপথ না সংসদ

আলফাজ আনাম

সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। আবার সংসদকে ব্যবহার করে অতীতে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যে সূচনা হয়েছিল, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথকে এগিয়ে নিতে পারত। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করে একনায়কতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে এ দেশের মানুষ বিরোধী দলের অংশগ্রহণমূলক সংসদ দেখেছে। ছদ্মবেশী সেনাশাসক এরশাদের শাসনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সংসদে গেলেও তা টেকসই হয়নি। বিএনপি এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ৯০-এ স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, দুই বছরের মাথায় তা হোঁচট খায়। শুরু হয় সংসদ বর্জনের রাজনীতি। এর ধারাবাহিকতা আমরা পরের সংসদগুলোতে দেখেছি। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত তার বাবার পথ অনুসরণ করে শুধু সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেননি, জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকার হরণ করেছিলেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেড় দশক পর বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। এর আগে রক্তস্নাত বর্ষা বিপ্লবে শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা এবং বিনাভোটের সংসদ সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়ে দলটি। অন্যদিকে, নিপীড়ক শেখ হাসিনার সহযোগী এরশাদের জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক মৃত্যু হয় ভোটের মাধ্যমে। দলটি ১৯৯ আসনে প্রার্থী দিয়ে কোনো আসনেই বিজয়ী হতে পারেনি। ভোট পেয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। সিপিবিসহ হাসিনার সহযোগী অন্য বাম রাজনৈতিক দলগুলোও দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছে।

ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মানুষ আশা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ইতোমধ্যে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ ছয় মাস অতিক্রম হয়েছে। সংসদে বেশিরভাগ সদস্য তরুণ এবং প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতাও এবার প্রথম সংসদে এসেছেন। নবীন সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদীয় রাজনীতির নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা এখন পর্যন্ত প্রাণবন্ত সংসদ দেখছি। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হচ্ছে। অনেক ইস্যুতে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছে, যা সংসদীয় রাজনীতির অংশ। এখন পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ কিংবা সংঘাতমূলক রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। নিঃসন্দেহে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি এই আগ্রহ আশাবাদী হওয়ার মতো।

জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের পরও দুপক্ষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি আছে। ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, তেমনি ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে কমবেশি ভয় ও শঙ্কা আছে। সংসদের তৃতীয় অধিবেশন যখন চলছে, তখন বিরোধী দল বড় আকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়েছেন। বিরোধী দলের আরেক নেতা—তরুণদের রাজনৈতিক দলের প্রধান ও চিফ হুইপ—সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, ভবিষ্যতে সংসদে তারা যাবেন কি না, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আবার একই দিন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীও বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বিরোধী দলের দিকে ইঙ্গিত করে অরাজকতা সৃষ্টি করা হলে কঠোরভাবে দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী দল যখন সংসদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তখন মাঠের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে সংসদ অকার্যকর হওয়ার মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। সংসদ কার্যকর রাখতে হলে ক্ষমতাসীন দলকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন এবং সংসদে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন আছে।

জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে বিরোধী দল যে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেবে, তা বোঝা গেছে ডেপুটি স্পিকারের পদ প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে। বিরোধী দলকে যখন ডেপুটি স্পিকারের পদ নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন অনেকে ধারণা করেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই পদটি বিরোধী দল সানন্দে গ্রহণ করবে। সে সময় বিরোধী দলের নেতাসহ একাধিক সংসদ সদস্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন তারা পদটি প্রত্যাখ্যান করলেন? তারা প্রায় সবাই জানিয়েছিলেন, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার হলে তারা তো স্বাভাবিকভাবেই ডেপুটি স্পিকারের পদ পাবেন। তারা এখন এই পদ নিয়ে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা দিতে চান না।

বিরোধী দলের এই দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের উপেক্ষা না করে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। পর্দার আড়ালে হলেও আলোচনা শুরু করা দরকার। কারণ আগামী দিনে সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ইস্যুটি প্রধান হয়ে উঠবে।

এখন পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যের নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেয়নি। এছাড়া সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ৩৬টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল তাদের আসনসংখ্যা অনুযায়ী ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে তারা এখন পর্যন্ত শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে। অতীতেও বিরোধী দলকে এই পদ দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি নতুন কিছু নয়।

এর মধ্যে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বিরোধী দল যদি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেয়, তাহলে আনুপাতিক হারে সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হবে। এই খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতে হবে, দরকষাকষির এই প্রক্রিয়া সম্ভবত ব্যর্থ হতে যাচ্ছে।

কারণ সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে বিরোধী দল এক ধরনের নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেখানে ক্যারট অ্যান্ড স্টিক পলিসি বা মুলো ঝোলানোর রাজনীতি তারা গ্রহণ নাও করতে পারে। কারণ পদের লোভ অতিক্রম করে তারা আগেই ডেপুটি স্পিকারের পদটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

আবার ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিরোধী দল ক্ষুব্ধ। ইতোমধ্যে এ নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা স্পিকারের কাছে চিঠি লিখেছেন। এছাড়া সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে। বেশ কয়েকটি স্থানে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও নারী সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে নানা ধরনের মেরূকরণ হচ্ছে। কারণ, নির্বাচনি এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অনেক ক্ষেত্রে নারী সংসদ সদস্যদের খবরদারি ভালোভাবে গ্রহণ করছেন না।

বিরোধী দলের অনেক সদস্য মনে করেন, ক্ষমতাসীন দল সংসদীয় বিতর্কের বাইরে গিয়ে তাদের নানাভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের আগ্রাসী, আবার কখনো ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। বিরোধী দলের নেতার সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তার প্রতিফলন ঘটেছে। ২৭ আগস্ট সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেননি। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সবাইকে... আমি বুঝতে পারি না; উনি নিজেকে কী মনে করেন। এমনকি, তিনি এখানে দাঁড়িয়ে সেই দুঃসাহস দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে, এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসিনি। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ, গিয়ে ভর্তি হবে। একই বক্তব্যে বিরোধীদের দুবার আক্রমণ করা হয়েছে দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি কালচারাল নয়, এটি পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটি হওয়া উচিত নয়।’

সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সংবিধান সংশোধন এবং সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে দিন দিন যে দূরত্ব বাড়ছে, তা আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল আসলে সরকারকে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া। সরকার সেই সতর্কবার্তা গ্রহণ করবে কি না, তা সামনের অধিবেশনগুলোতে স্পষ্ট হবে।

তবে দেশের মানুষ চায়, সংসদ হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এজন্য ক্ষমতাসীন দলকে যেমন উদারতার পরিচয় দিতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকে সহনশীল রাজনীতির পথ গ্রহণ করতে হবে। দুই পক্ষ যদি কোনো কারণে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যায়, তাহলে রাজনীতি আর সংসদে থাকবে না, মাঠে গড়াবে। এতে সবচেয়ে লাভবান হবে গণঅভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তি।

হরমুজে জাহাজ চলাচলে বড় ধাক্কা, এক সপ্তাহে কমেছে ২৮ শতাংশ

রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেম

স্বৈরাচার ঠেকানোর অব্যর্থ দাওয়াই

গালাগালি নয় গলাগলি জরুরি

ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলা নিষিদ্ধ আ.লীগের সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক বহিঃপ্রকাশ: এবি পার্টি

বাঁধনকে হেনস্তাকারীরা খুনিদের দালাল, নরপশু: সারজিস আলম

ইতালিতে ‘জুলাইযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলার অভিযোগ

বাবার নাম মিলে যাওয়ায় আসামি না হয়েও কারাভোগ

সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিল পাস নিয়ে ওলামা অ্যালায়েন্সের উদ্বেগ

অটোরিকশার জন্য আসছে কিউআর কোড-ডিজিটাল ট্র্যাকিং