‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব’ কবিতাটি লিখেছিলেন কবি ও শিক্ষক রফিক আজাদ। এটি ’৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা। মূলত এটি দ্রোহের কবিতা। ব্যক্তি নয় বরং প্রত্যাশার বিপরীতে হতাশা থেকে উৎসারিত। একটু ভালোভাবেই বেঁচে থাকার নিমিত্তে গোটা জাতি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধও করেছিল; কিন্তু তার বিপরীতে দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল স্বদেশ। বাক্স্বাধীনতার অধিকারহীন এক অপরিচিত স্বদেশ হয়ে উঠেছিল নতুন পরিচয়ের ঠিকানা। ছড়াকার আবু সালেহও লিখেছিলেন, ‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না বলা যাবে না কথা।’ এসব আসলে গোটা জাতির ’৭১-পরবর্তী চিত্র, হতাশার চিত্র।
১৯৭১, ’৭৫, ’৯০ ও ২০২৪—প্রতিটি সময়ই ছিল প্রত্যাশার। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান অতীতের যেকোনো পরিবর্তনের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। সেই পরিবর্তনের সূত্র ধরে যে বাংলাদেশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবটা অবশ্যই একটু সতর্কতার সঙ্গে মেলাতে হবে। এই প্রথম বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে জনতার রোষের ভয়ে এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ফ্যাসিস্ট পালিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের পতনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যে সরকার ও সংসদ গঠিত হয়েছে, তার ছ’মাস পূর্ণ হয়েছে। কেমন কাটছে সরকার ও সংসদ—এ নিয়ে নানাভাবে দেখার চেষ্টা চলছে। ছ’মাস খুব বড় সময় নয়, আবার দেখার বিবেচনায় একেবারে নগণ্যও নয়।
সরকারের সাফল্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক। ফ্যামিলিকার্ড ও বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা প্রদানের কর্মসূচি চালু করার বিষয় অধিকতর বিবেচনায় দেখা যুক্তিসংগত। প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্যমূলক অর্থনীতির ঘোষণা সামাজিক কর্মসূচি শুভ লক্ষণ।
সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মূলত যে বিষয়গুলো সামনে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। শুরুতে যদি জ্বালানি খাত নিয়ে আলোকপাত করা যায়, তাহলে বলা যায়, সমস্যা পুরনো। সে কারণে এর ধরন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যা বলেছেন, তা অগ্রহণযোগ্য। আগামী দুবছর কিছু করার নেই, দেওয়ার নেই—এসব বলার জন্য কোনো মন্ত্রীর প্রয়োজন হয় না। মূলত এগুলো পুরোনো ফ্যাসিবাদের ভাষা।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সবচেয়ে বেশি মূল্যের ডিজেল প্লান্ট চালু করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। দেশের মানসম্মত কয়লা বাদ দিয়ে ভারতীয় কয়লা এনে প্রকল্প চালু করা হয়েছে। নেপাল ও ভুটানের কম দামের বিদ্যুৎ না কিনে ভারতের আদানির বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে মোদির পরামর্শে। সমস্যা সমাধানের পথ যদি না থাকবে তবে প্রতিবেশী দেশগুলো চলছে কীভাবে।
জ্বালানির বিষয়টি এতটাই জরুরি যে জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে সরকারের সব উন্নয়ন প্রকল্প খেই হারিয়ে ফেলবে। সবাই মিলে বসে আন্তরিকতার সঙ্গে এগোনোর পথ নির্ধারণ করা গেলে মৌলিকভাবে এর সমাধান হতে পারে।
বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে জনজীবনের অশান্তি সৃষ্টিকারী মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাস। জনজীবন এক মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। একটু পুরোনো উদাহরণে যাওয়া যেতে পারে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে যে সরকার ও যে সংসদ কায়েম হয়েছে, তাদের কাছে জনপ্রত্যাশা হচ্ছে একটু স্বস্তি ও একটু জানমালে নিরাপত্তা। ’৭২ থেকে ’৭৫-এর দুর্বৃত্তায়ন রুখে দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া। কোনো আলাদা জাদু তিনি করেননি। যারা এ সময় নাগরিকদের চোর বলে অভিহিত করেছে, সেই মানুষদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক যুগান্তকারী উন্নয়নের রোল মডেল। বেগম খালেদা জিয়া কঠোর হাতে দমন করেছেন সন্ত্রাস ও এসিড সন্ত্রাস। জনজীবনে শান্তি স্থাপনে তিনি নজির স্থাপন করেছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে যখন রাজনৈতিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়, তখন জনজীবনে নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বলা যায়, জুলাইকে ব্যর্থ করতে যারা তৎপর তারাই জনজীবনকে অশান্ত করে তুলছে। এই প্রবণতা রুখতে হলে অবশ্যই দক্ষ ও যোগ্য নিয়ন্ত্রক প্রয়োজন। যা চলছে তা চলতে থাকলে সরকার ও সংসদের সাফল্য ম্লান হতে বাধ্য। কারণ জনগণের আস্থার প্রাচীরে ফাটল ধরবে।
বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরে প্রায় ৩০ বছর কোনো না কোনোভাবে অগণতান্ত্রিক শাসন ছিল। যখনই গণতন্ত্র বা জনগণের সরকার পথ চলতে শুরু করেছে, তখনই আধিপত্যবাদের নানা চক্রান্ত স্থান করে নিয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। যেকোনো বিবেচনাতেই ’২৪-এর অভ্যুত্থান অন্যগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি পরিবর্তনে কেবল উপরি কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। গণমানুষ উপেক্ষিত থেকেছে। পুরোনো ধারায় এবারে সম্ভব নয়।
এবারে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার শেকড় অনেক গভীরে। এই প্রথম সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ফ্যাসিবাদ ঠেকানোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। ভোট দিয়েছে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এটি হচ্ছে সাধারণ ঐক্যের সূত্র। সে বিবেচনায় বলা যায়, জনগণ চায় সরকার ও সংসদের সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে ফ্যাসিবাদের আমলে নেওয়া কার্যক্রম ও কর্মসূচির বিপরীতে।
এ কথা সত্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। গতানুগতিক ধারায় তিনি দেশ চালাচ্ছেন না। তার ধারায় অন্যরা তাল মেলাতে পারছেন কি না, বাস্তবতার আলোকে তা বোঝা দায়। জনতার সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধীদের একমত হতে হবে। মনে রাখা জরুরি—গণতন্ত্র রক্ষায় পেছানোর পথ সবার জন্য রুদ্ধ এবং এগোনোর পথই অবারিত। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হলে তার মাশুল হবে মারাত্মক বিপর্যয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক