হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের আপত্তি কেন

আবদুল আউয়াল ঠাকুর

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসিনা। ছবি: বাসস

লেখার শুরুতেই আমি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলের কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিজের নিরাপত্তার জন্য গোপনে ভারতে গিয়ে অন্য নামে দেশটির নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে একদিন সকালে কলকাতা পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পথে ভারতীয় গোয়েন্দারা তাকে আটকের পর বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে হস্তান্তর করেছিল। দ্বিতীয়ত, জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে ঢাকার হাইকোর্ট এলাকা থেকে অপহরণের পর ভারতে নিয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে দেশের বিশিষ্ট আলেম ও রাজনৈতিক নেতা মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের পর আলেমসমাজ বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, তাকে যেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিদেশি গোয়েন্দাদের কাছে দেওয়া না হয়।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এ তিনটি ঘটনার উল্লেখ করলাম প্রাসঙ্গিক বিবেচনায়। ক্যাপ্টেন মাজেদকে হস্তান্তরের জন্য কোনো আইনের প্রয়োজন হয়নি। সুখরঞ্জন বালীকে গুম করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কোন আইনে? অথবা বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জড়িত রাজনৈতিক নেতাদের ভারতীয় গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কোন আইনে?

ভারতের অনুগত শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্য যা করা প্রয়োজন, তাই করেছেন, সেভাবেই আইন করা হয়েছিল। নিজের সুবিধার জন্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে তার বিন্দুমাত্র চিন্তা করতে হয়নি। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বিতাড়িত সেই ফ্যাসিস্টকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর ঢাকা যখন তাকে ফেরত চাইছে, তখন ভারত তাকে ফিরিয়ে দিতে টালবাহানা করছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছেÑনরেন্দ্র মোদির সরকার কেন এমন করছে?

বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনার টেবিলে শেখ হাসিনার সঙ্গে শরীফ ওসমান হাদির খুনিদেরও হস্তান্তরের জন্য ঢাকা দাবি জানালেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আইন আদালতের দোহাই দেওয়াসহ নানা কথা বলছেন। অন্যদিকে, দেশটির কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক তারেক রহমান ভারত সফরে না গেলে নিজের গর্ত নিজেই খুঁড়বেন বলে হুমকি দিয়ে কথা বলছেন। ভারত কেন শেখ হাসিনা ও হাদির খুনিদের প্রত্যর্পণে রাজি না হয়ে উল্টো ঢাকাকে হুমকি দিয়ে কথা বলছে, সে বিষয়টি বাংলাদেশকে বিবেচনায় রেখে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ এলে অনেকেই সিকিমের লেন্দুপ দরজির কথা টানেন। স্বাধীন সিকিমকে তিনি তুলে দিয়েছিলেন ভারতের হাতে। বিনিময়ে কি পেয়েছিলেন, তার বিবরণ নানাভাবে রয়েছে। সোজা ভাষায় বলতে গেলে, কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল ভারত। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ শেখ হাসিনা লেন্দুপ হওয়ার মুখেই তাকে ছুড়ে ফেলেছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মনোনীত ব্যক্তিদের শেখ হাসিনার কথিত সংসদে বসিয়ে যে সার্কাস শুরু করা হয়েছিল, তা যদি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকত, তাহলে এখনো স্বাধীন বাংলাদেশ টিকে থাকত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। শেখ হাসিনা এবং তিব্বতের দালাইলামার মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। দুজনই একইভাবে নিরাপদে ভারতে পৌঁছেছেন এবং নিরাপদে সেখানে আছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুদেশের আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্ট করে বলেছে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ ও হাদির ঘাতকদের ফেরত দিতে হবে। ভারত এ ব্যাপারে সায় দেয়নি, দেওয়ার কোনো লক্ষণও নেই।

বিবিসি বলেছে, ভারত মনে করে, শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখেই দুদেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আলোচনা হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের গল্প আছে, এর একটি হচ্ছে মানবিক, আরেকটি হচ্ছে দাসত্বমূলক। ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে ফ্রান্স আশ্রয় দিয়েছিল মানবিক কারণে। চলমান ইরান মার্কিন যুদ্ধের ফ্রান্স ইরানকেই সমর্থন করেছে।

তারেক রহমানকে ১/১১ সরকারের সময় যখন হত্যার চক্রান্ত করা হয়েছিল, তখন ব্রিটেন তার পাশে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কেউ কেউ বলেছেন, তারেক রহমান যখন লন্ডনে ছিলেন, তখন তো শেখ হাসিনা একবারও বলেননি তারেক রহমানকে ফিরিয়ে না দিলে ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনা হবে না। এরা ভুলে গেছেন যে, তারেক রহমান সেখানে গিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে কেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা কারো পক্ষে ভারত সফর সংগত নয়, গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারত শেখ হাসিনাকে দিয়ে কোন কার্ড খেলাবে, তা নিশ্চিত নয়। শেখ হাসিনা নাকি তাদের মেহমান। ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীনা সিক্রি যখন শেখ হাসিনার বিকল্প হিসেবে তারেক রহমানের কথা বলেন, তখন বলতে হয়, একজন পাতানো নির্বাচনে ভুয়া ভোটের প্রধানমন্ত্রী এবং গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যাখ্যাত, আরেকজন স্বচ্ছ ও বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে দেখে, তা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতেই সামনে এসেছে।

৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা বিদেশে ছিলেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই তাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সুযোগ করে দেন। কিন্তু শেখ হাসিনা দেশে আসার কয়েক দিন পরই জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এরপর ১৯৮৩ সালে নির্বাচিত সাত্তার সরকারকে সরিয়ে এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে শেখ হাসিনা এরশাদকে নিঃশর্ত সমর্থন দেন। ৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদকে সমর্থন করা নিয়ে ভারত থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছিল, জিয়ার হত্যাকারী হওয়ার কারণেই শেখ হাসিনা এরশাদকে সমর্থন করছেন এবং নির্বাচনে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ তার মতো চলুক তা কখনোই চায় না ভারত। বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করার জন্যই এ দেশের শেয়ারবাজার লুট থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াসহ সবকিছুই করেছে ভারত। বাংলাদেশ যখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, তখনই হায়েনার ছোবল দিয়েছে ভারত। আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়েছে ভারতের এ দেশীয় কিছু তাঁবেদার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক আওয়ামী নেতা বলেছেন, ভারতের উচিত বাংলাদেশ আক্রমণ করা। তিনি বোধহয় ভুলে গেছেন, সময়টা আগের জায়গায় নেই।

প্রশ্ন হচ্ছেÑশেখ হাসিনাকে ভারত প্রত্যর্পণ করতে সম্মত নয় কেন? ভারত যদি তার নিজের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিত, তাহলে তারা ক্যাপ্টেন মাজেদের বেলায় যা করেছে, তা এ ক্ষেত্রেও করতে পারত। তাছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারত শেখ হাসিনার ব্যাপারে এতটা স্পর্শকাতর কেন? ভারত তো এমন কোনো গণতান্ত্রিক দেশ নয় যে, তাদের গণতন্ত্রচর্চা বিশ্বে মডেল হয়ে উঠেছে। বরং ভারতে মুসলিম নির্যাতন বিশ্বে নিন্দিত হচ্ছে। মসজিদ ভাঙা থেকে শুরু করে সেখানে মুসলিমবিরোধী যে ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটছে, তাতে বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত।

বাংলাদেশ মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখানোর পর থেকে ভারতের আলোচনায় নতুন বাহানা উঠেছে। যদিও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, মক্কা জোট মুসলিম দেশগুলোর নিজস্ব ব্যাপার। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী দেশে পরিণত হোক, তা যেমন ভারত চায় না, তেমনি শেখ হাাসিনাও চান না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ইসলামি চেতনা ধ্বংস করার জন্য ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এজন্য যে ধরনের ঘৃণ্য আইন দরকার, তা করেছেন। গুম-খুনের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিধন করা হয়েছে। এই নীলনকশা ছিল ভারতের। সে কারণেই শেখ হাসিনাকে ভারত পুষতে চায় তাদের বিশ্বস্ত তাঁবেদার হিসেবে। এসব ঘটনা থেকে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ীদের শিখতে হবেÑকাকে রুখতে হবে, কাকে পুষতে হবে? সব ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে, তা আগে বিবেচনা করতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

৪১ দেশে চালু হচ্ছে প্রবাসীদের এনআইডি সেবা

ইরান যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যা বলছেন ট্রাম্প: মার্কিন সিনেটর

মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমেছে ৩৩ শতাংশ

বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি, ১৪ জেলে জীবিত উদ্ধার

রেকর্ড উৎপাদনের পথে চা, ন্যায্য দাম নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ

হরমুজে মার্কিন নজরদারি নৌযানে ইরানের হামলা, ২ জাহাজে আঘাত

২০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত মোহনগঞ্জবাসী

রাজধানীতে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

মেধার অবমূল্যায়ন ও দলীয়করণের শঙ্কা

ডনের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে, তবু ‘হত্যা’ বলছে না তদন্ত সংস্থা