হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অর্থহীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের তালিকা দীর্ঘ করছেন ট্রাম্প

টম এঙ্গেলহার্ডট

এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪৪ সালের ২০ জুলাই আমার জন্ম। আমার বাবা তখন সবেমাত্র মিয়ানমারের (বার্মা) রণাঙ্গন থেকে বাড়িতে ফিরেছেন। সেখানে তিনি চীন-ভারত-বার্মা রণাঙ্গনে ‘ফার্স্ট এয়ার কমান্ডো’ ইউনিটের অপারেশনস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই যুদ্ধের কথা আমার অবশ্য কিছুই মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে যে, বাবা খুব কমই তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। অবশ্য মাঝেমধ্যে তিনি আমাকে স্থানীয় সিনেমা হলে নিয়ে গিয়ে ‘দ্য কেইন মিউটিনি’ বা ‘মেরিলস ম্যারাডার্স’-এর মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা দেখাতেন।

যে দেশটি (যুক্তরাষ্ট্র) অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, তাদের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল একমাত্র ঘটনা, যা নিয়ে আমেরিকানরা সত্যিই গর্ব করতে পারেন। কারণ এই যুদ্ধে নাৎসি জার্মানি ও সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিশ্বব্যাপী পরাজয় ঘটেছিল। এখানে আমরা এমন একটি দেশের কথা বলছি যে দেশটি ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাদের সামরিক খাতে আনুমানিক ২১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই অঙ্কটি ছিল অন্তত ১৮টি দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয়ের সমান। আর এই বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র তার আগের ৫৫ বছরের মতোই কোনো উল্লেখযোগ্য যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেনি, সত্যি বলতে জয়ের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতিও একই পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান বিপর্যয়কর যুদ্ধ কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। আমেরিকান সামরিক শক্তি যখন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তখন শেষ পর্যন্ত তারা প্রায়ই এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা একটি ‘ডেড-এন্ড’ বা চরম অচলাবস্থা, যেখানে ‘ডেড’ বা মৃত্যু শব্দটির ওপরই বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন।

একবার কল্পনা করুনÑ২০০১ সালে যদি আমেরিকান করদাতাদের বলা হতো যে, তাদের ২১ ট্রিলিয়ন ডলার এমন এক সামরিক বাহিনীতে বিনিয়োগ করতে, যারা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ করবে অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো সাফল্যই পাবে না (১৯৮৩ সালে অসহায় ক্যারিবীয় দ্বীপ গ্রেনাডা আক্রমণের ঘটনাটি ছাড়া), তবে তারা কী করতেন? ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধ কিংবা ষাট ও সত্তরের দশকের বিভীষিকাময় ভিয়েতনাম যুদ্ধ অথবা এই শতাব্দীর শুরুর দিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ (ওয়ার অন টেরর) নামের সেই বিপর্যয়কর অভিযানের অংশ হিসেবে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের কথা এখানে বলা যায়। কিংবা অতিসম্প্রতি ট্রাম্পের আমলের যুদ্ধগুলোর (সোমালিয়া থেকে শুরু করে বর্তমানের ইরান পর্যন্ত, যা একের পর এক বিপর্যয়ই বয়ে এনেছে) যেকোনো যুদ্ধ নিয়েই কথা বলা হোক না কেন, বিষয়টি একই ধরনের।

এ বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর, ইতিহাসের পাতায় এমন কোনো পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তাদের উত্থানের (এবং সম্ভাব্য পতনের) এক উল্লেখযোগ্য সময়জুড়ে কোনো যুদ্ধেই জয়লাভ করতে পারেনি। এটি নিশ্চিতভাবেই সেই পুরোনো গানÑ ‘যুদ্ধ কী কাজে আসে?’ যার উত্তর হলোÑ‘একেবারেই কোনো কাজে আসে না’। অবশ্য আপনি যদি ট্রাম্প হন এবং এমন একজন প্রেসিডেন্ট হন, যিনি কোনো যুদ্ধেই জিততে পারেন না (যা তাকে গত ৮০ বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে বেশ ভালো এক দলের অন্তর্ভুক্ত করে)। তবে ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প অন্তত যে কাজটি করতে পারেন, তা হলো, হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পত্তি বা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা।

বিশ্বাস করা কঠিন হলেও তিনি সম্প্রতি সত্যি সত্যিই এমন ঘোষণা দিয়েছেন। কী দারুণ যুক্তি, তাই না? ওয়াশিংটন ডিসি থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব ৬,৫০০ মাইলের মতো। সুতরাং, এর চেয়ে যৌক্তিক দাবি আর কী হতে পারে? অবশ্য, আমি নিশ্চিত যে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির দেওয়া জবাবে আপনি অবাক হবেন না। তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্প যা-ই ভাবুন না কেন, এই প্রণালিকে ‘টুইট করে, বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে, কোনো আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনি ভাষণ দিয়ে দখল করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেছেন, ‘এই প্রণালিটি শুধু ইরানের নির্দেশেই খোলা বা বন্ধ করা হবে আর যতক্ষণ না আপনারা পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন এবং দিবাস্বপ্ন দেখা বন্ধ করছেন, ততক্ষণ ইরান এই অবরোধ বজায় রাখবে।’

তবে, ট্রাম্প যদি মনে করেন এসবই শত্রুপক্ষের অসার বুলি, তবে আসল ঘটনা হলোÑইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘রিপার ড্রোন’-এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছে। প্রতিটি ড্রোনের মূল্য ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং সব মিলিয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এসবের বেশিরভাগই ধ্বংস হয়েছে হরমুজ প্রণালির আশপাশেই। এগুলোর অধিকাংশই ভূপাতিত করা হয়েছে ইরানের এমন সব ড্রোন দিয়ে, যার প্রতিটির মূল্য মাত্র ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার। এত বিপুলসংখ্যক ড্রোন হারানোর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন আরো অনেক কিছুই হারিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের কাছে ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ আদায়ের সেই আগের জেদ। ট্রাম্প প্রশাসন এখন আর তার আগের সেই অবস্থানে নেই বা সরে এসেছে বলেই মনে হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখে যা-ই বলুন না কেন, তিনি এখন চান ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে, যাতে বিশ্বজুড়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। অন্য কথায়, তিনি এখন তার আগের সেই পরিস্থিতিতেই ফিরে যেতে চাইছেন, যা ছয় মাস আগেÑঅর্থাৎ বিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরুর আগে বিদ্যমান ছিল। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক কথায় বলতে গেলে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন শুধু এটি নিশ্চিত করতে চায় যে, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখুক, যাতে জ্বালানির দামে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।’ একই সঙ্গে, তারা এটাও নিশ্চিত করতে চায় যে, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে।

যদিও সবার জানা মতে, ইরান এমন কোনো অস্ত্র তৈরির চেষ্টার ধারেকাছেও নেই, এমনকি তাদের হাতে এমন অস্ত্র আসার কোনো সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ইরান এখন হুমকি দিচ্ছে যে, ২০২৮ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখবে, যা ট্রাম্পের জনসমর্থনে ধস নামাবে (ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার এরই মধ্যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে)। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ ইরানের বিষয়ে তার গৃহীত পদক্ষেপ বা পরিস্থিতি সামলানোর ধরনকে সমর্থন করেন।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) কমান্ডারের একজন সিনিয়র উপদেষ্টা বলেছেনÑ‘তাদের লক্ষ্য হলো ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা এবং প্রতিপক্ষকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলা, যাতে অন্য কেউ যদি কখনো ইরানকে আক্রমণ করতে চায়, তবে তারা যেন বুঝতে পারে যে, এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। আমাদের এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে শত্রুরা আমাদের আক্রমণ করার সাহস না পায় এবং আমরা নিরাপদে বসবাস করতে পারি।’

একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ট্রাম্প এসব ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বলে যদি কেউ ভেবে থাকেন, তবে তিনি বড় ভুল করবেন। কারণ ট্রাম্প সম্প্রতি দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র ওমানকেও হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার পরিকল্পনার পথে ওমান যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তিনি দেশটিতে ‘ভয়াবহ বোমা হামলা’ চালাবেন। যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নিলে তেমন কী-ই বা আর খারাপ কিছু ঘটবে? ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যে পরিণতির দিকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে নতুন গ্লানিই শুধু যুক্ত হবে।

এশিয়া টাইমস অবলম্বনে মোতালেব জামালী

মাত্র ১৫ মিনিটেই মার্কিন হামলার জবাব দিয়েছে ইরান: জেনারেল আকরামিনিয়া

ভারি বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি নিয়ে যা জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

খাল থেকে ‘কুমির’ নয়, আসে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার

কুমিল্লা সার্কিট হাউসে কক্ষজুড়ে উইপোকা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্বাভাবিক ছন্দে আদ্-দ্বীন বাড়ছে রোগীর চাপ

বলিভিয়ায় সামরিক স্থাপনায় বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১৫

তুরস্কের বিনিয়োগ ব্যাংক ও দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

বাঁশখালীর মিষ্টি পানের চাহিদা বাড়ছে বিদেশে

তেজগাঁওয়ে রেলওয়ের পাঁচ একর জমি আবার অবৈধ দখলে

সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও জীবিকা অর্জনে যেতে পারছেন না বনজীবীরা