হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পুরুষতন্ত্রের ছায়ায় নারীর রূপান্তর

শাহীদ কামরুল

নারীবাদ (Feminism) নিয়ে আমার ধারাবাহিক লেখার পথটি যেন দীর্ঘ এক অন্ধকার করিডোর। প্রতিটি লেখায় সেই করিডোরের একটি করে দরজা খুলেছি, কখনো ইতিহাসের, কখনো ধর্মের, কখনো সমাজের, কখনো আবার পুরুষতন্ত্রের সেই অদৃশ্য কুঠুরির, যেখানে নারীর কণ্ঠকে শব্দ হওয়ার আগেই স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আজ সেই করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে আরেকটি দরজা। দরজাটির ওপারে যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছে একটি পুরোনো বাড়ি, একটি বন্ধ জানালা, একটি নিঃশব্দ নারী এবং এর চারপাশে পচে যেতে থাকা একসময়ের স্মৃতি।

সেই বাড়িটির নাম মনে পড়তেই মনে হলো, নারীর ইতিহাসও কি অনেকটা এমন নয়? বাইরে থেকে যার জানালাগুলো অক্ষত, দেয়ালগুলো অটুট, অথচ ভেতরে ভেতরে যার বাতাস বহুদিন ধরে থমকে আছে। সমাজ প্রায়ই নারীর জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে, তারপর সেই ঘরের নাম দেয় নিরাপত্তা; জানালায় শিকল বসিয়ে তার নাম দেয় শালীনতা; দরজায় তালা ঝুলিয়ে তার নাম দেয় মর্যাদা; আর তার নীরবতাকে অভিহিত করে আদর্শ নারী হওয়ার লক্ষণ হিসেবে। ধীরে ধীরে সেই ঘরই হয়ে ওঠে তার পৃথিবী আর পৃথিবীর সীমানাই সংকুচিত হয়ে আসে একটি ঘরের চার দেয়ালে। এই জায়গাতেই হঠাৎ মনে পড়ে যায় আমেরিকান ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও নোবেলজয়ী সাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনারের (William Faulkner, 1897-1962) বহুলপঠিত ছোটগল্প A Rose for Emily (1930)-এর কথা।

গল্পটি পড়তে গেলে প্রথমেই মনে হয়, আমরা যেন একটি নারীর জীবন পড়ছি; কিন্তু একটু গভীরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, আসলে আমরা একটি সমাজের বিবেকের মৃত্যুও পড়ছি। এমিলি গিরসন সেই মৃতপ্রায় দক্ষিণী অভিজাত সমাজের শেষ প্রদীপ, যার আলো অনেক আগেই নিভে গেছে, অথচ যার ধোঁয়া এখনো ঘরের দেয়ালে লেগে আছে। তার জীবন যেন একটি পুরোনো বাড়ি, বাইরে থেকে যার স্থাপত্যে বংশমর্যাদার গৌরব, কিন্তু ভেতরে যার প্রতিটি কক্ষে জমে আছে একাকিত্ব, নিয়ন্ত্রণ, দমন এবং অপ্রকাশিত কান্নার ধুলো। এমিলি ধনী ও অভিজাত পরিবারের উত্তরাধিকারী; কিন্তু উত্তরাধিকার হিসেবে সে শুধু সম্পদ পায়নি, পেয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক বন্দিত্বও। তার চারপাশে ছিল শ্রেণির অহংকার, পিতার কর্তৃত্ব, দক্ষিণী সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতার অদৃশ্য প্রাচীর। সে যেন এমন একটি সোনার খাঁচায় বন্দি পাখি, যার শিকল সোনার বলে বাইরে থেকে তাকে শিকল বলে মনে হয় না। কিন্তু পাখির কাছে সোনার শিকলও শিকল।

নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে A Rose for Emily তাই শুধু প্রেম, প্রত্যাখ্যান কিংবা নিঃসঙ্গতার গল্প নয়। এটি সেই দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়ার গল্প, যার মধ্যে একটি নারীকে প্রথমে নির্দিষ্ট নারীত্বের ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হয়, তারপর সেই ছাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে তার প্রতিরোধকে অস্বাভাবিকতা, উন্মাদনা কিংবা অপরাধ হিসেবে পাঠ করা হয়। বিশেষত Radical Feminism এবং Postmodern Feminism-এর আলোকে এমিলির জীবন পড়লে দেখা যায়, পিতৃতন্ত্র শুধু নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে না; এটি তার আকাঙ্ক্ষা, পরিচয়, ভালোবাসা, স্মৃতি এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

আর Toril Moi তার প্রভাবশালী গ্রন্থ Sexual/Textual Politics (1985)-এ বলেন, Female হলো সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক বা জীববৈজ্ঞানিক বা শারীরবৃত্তীয় পরিচয়। এটি নারীর শরীরগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত। যেমন প্রজননক্ষমতা, শরীরের গঠন ইত্যাদি। Feminine হলো সামাজিকভাবে নির্মিত পরিচয়। সমাজ নারীর সঙ্গে যে চরিত্র, পোশাক, ব্যবহার, সৌন্দর্যবোধ জুড়ে দেয়, তাকেই বলা হয় Femininity। Feminine পরিচয়টি প্রাকৃতিক নয়, বরং সমাজসৃষ্ট বা সাংস্কৃতিক নারীত্ব। যেমনÑমেয়েরা কোমল, আবেগপ্রবণ, নরম স্বভাবের—এই ধারণা Feminine Stereotype, যা সমাজ তৈরি করেছে। Feminist হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি বিশ্বাস করেন যে সমাজে নারী ও পুরুষের সমতা থাকা উচিত এবং নারীর অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হন। এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিচয়, বা রাজনৈতিক চেতনায় নারী, যা জৈবিক নারী হওয়া বা Feminine আচরণ করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। একজন পুরুষও Feminist হতে পারেন, যদি তিনি নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর অধিকারকে সমর্থন করেন। যেমন—পুরুষতন্ত্রবিরোধী লেখিকা বা কর্মী, তারা Feminist, কারণ তারা নারীর স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান। Toril Moi সমালোচনা করে বলেন, এই তিনটি ধারণাকে এক করে ফেলা সমস্যার সৃষ্টি করে। যেমনÑকেউ যদি বলে, নারী মানেই আবেগপ্রবণ ও কোমল—তাহলে তারা Female পরিচয়কে Feminine পরিচয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে। আবার কেউ যদি ভাবে, ‘Feminist মানে সবসময় পুরুষবিদ্বেষী’, সেটাও ভুল বোঝাবুঝি। অর্থাৎ, নারী Female হওয়া মানেই নারীসুলভ Feminine হওয়া নয় এবং Feminist হওয়াও নয়। নারীকে বুঝতে গেলে তার শরীর, সামাজিক নির্মাণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান—তিনটিকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করতে হবে।

Toril Moi বলেন, Female, Feminine ও Feminist—এই তিনটি পরিচয় এক নয়। এমিলি প্রাকৃতিকভাবে Female, তাকে সমাজ Feminine আচরণে বাধ্য করেছে (নম্র, একা থাকা, পুরুষের অপেক্ষায় থাকা), কিন্তু শেষমেশ তার ভেতরে একধরনের Feminist প্রতিরোধ দেখা যায়, যদিও তা বিকৃত ও আত্মবিধ্বংসী। এমিলি দেখিয়ে দেয়, নারীর পক্ষে সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রতা’ এবং ‘নিয়ন্ত্রণ’ বজায় রেখে আত্মপরিচয় রক্ষা করা সম্ভব নয়।

খোদা এই দুনিয়ায় মানুষ সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীলতার বৈশিষ্ট্য দিয়ে। এখানে সবকিছুই নিরন্তর ও হরহামেশাই বদলাতে থাকে। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীলতার গুণাবলি দিয়ে, তার জন্য চিরস্থায়ী কোনো আইন সৃষ্টির নিয়মেই কন্ট্রাডিকটরি ও অসম্ভব। সময়ের পরিবর্তনে যখন নতুন নতুন ভ্যালুজ হাজির হবে, তখন আইন তার উদ্দেশ্যকে আর সার্ভ করতে পারবে না, যার কারণে খোদ ধর্মই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং একটা সময়ে অচলতায় পর্যবসিত হবে। সভ্যতার এই কন্ডিশনটা মালুম করার জন্য দাসব্যবস্থাকে ইয়াদে নেওয়া যায়। একটা সময় হাটবাজারে গরু-ছাগলের মতো মানুষ বেচাকেনা হতো। বিক্রয়ের জন্য আনা নারীদের শরীর নিজ হাতে পরখ করে যৌনতার উপযুক্ত কি না যাচাই করা যেত। সেই কালে মানবসভ্যতা যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে এবং যতটুকু ভ্যালুজ তৈরি হয়েছে, সেই বিচারে মানুষ বেচাকেনার কাজকে অনৈতিক ও অপরাধ বিবেচনা করেনি। কিন্তু আমাদের সময়ে মানুষের তেজারতি অনৈতিক ও অপরাধ। এভাবে যুগ যুগান্তরে নতুন নতুন ভ্যালুজ তৈরি হয়। সেই অনুযায়ী সেই বিষয়ে নৈতিকতা আরোপ হয়। নারী বিষয়ে মানবসভ্যতা একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড পার করছে। ফলত, নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে নতুন ভ্যালুজ হাজির হচ্ছে। পুরোনো আইন সংস্কারের দাবি উঠছে। নারীকে শুধু পুরুষের সেবক হিসেবে বিবেচনার দিন ফুরিয়ে আসছে।

ডিভোর্সের পর পুরুষের উপার্জিত সম্পদে নারীর হিস্যা আইনিভাবে অধিকার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া অনেকের কাছে পশ্চিমা সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ বলে মনে হয়, যদিও হালের পশ্চিমা দুনিয়ায় ডিভোর্স-পরবর্তী সময়ে অর্ধেক সম্পত্তি শেয়ারিংয়ের কনভেনশনও মুসলিম বিশ্ব থেকে ধার করা। এ কনভেনশন উমাইয়া শাসিত স্পেনে ছিল। মধ্যযুগে ইউরোপীয়রা তথা খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের কাছে ইউরোপের অন্তত তিনটি দেশে—ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সে—শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসত, তখন ওই অঞ্চলগুলো মুসলমানদের অধীনে ছিল। ইতিহাসের সেই সময়ে ইউরোপে বিয়ে-পরবর্তী নারীর সব সম্পদের মালিকানা স্বামীর কাছে হস্তান্তর হয়ে যেত। ডিভোর্সের পর সেসব সম্পদ ফেরত দেওয়ার কেন লাজিমি ছিল না। আজকে ইউরোপে নারীর জিম্মাদারি ও অধিকারের যে বিষয়গুলো আইনের আওতায় আসছে, তার গৌরচন্দ্রিকা মুসলিম সমাজ থেকে অনুপ্রাণিত। মানুষের কিছু সমস্যা সর্বজনীনÑএসব সমস্যার ফয়সালা কেউ যদি বেহতর পদ্ধতিতে করতে পারে, তাহলে তা আজিজির সঙ্গে কবুলিয়তে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। পাঠক ভাবুন, একজন নারী সন্তান গর্ভধারণ করে, জন্ম দেয়, লালন-পালন করে, সংসার সামলে পুরুষকে অবসর দেয় বলেই পুরুষরা উপার্জন করতে সক্ষম হন বলে উপলব্ধি করি। তার অর্থ হলোÑপুরুষের উপার্জন মূলত যৌথ। এ বিষয়টি তাদাব্বুর ও তাফাক্কুর করতে পারলেই মালুম করা মুমকিন হবে কেন, ডিভোর্সের পর জামাইয়ের সম্পদের অর্ধেক বউয়ের প্রাপ্য। পুরুষ ওই সম্পদ অর্জন করেছে নারীর সহায়তায়, মানে সন্তান জন্মদান, লালন-পালন, সংসার দেখভাল করার কারণে। কিন্তু নারী যদি সংসারের সব দায়িত্ব পালন করার পর বাড়তি উপার্জন করে, সেই উপার্জনে পুরুষের হিস্যা নেই। কারণ এই উপার্জনে পুরুষের সহায়তা তেমন নেই। পুরুষের সেক্রিফাইস নেই। নারী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেই, অতিরিক্ত কাজের দায় নিয়ে উপার্জন করে। খানিকটা ডাবল শিফটে কাজ করার মতো আরকি।

যখন ডিভোর্সের প্রশ্ন আসে, তখন নারীকে খালি হাতে বিদায় নিতে হয়। যত দিন বিবাহিত জীবনযাপন করা হবে, তত দিন নারী সন্তান জন্ম দেওয়া, লালন-পালন করা, সংসার সামলানো—এই কাজগুলোর অর্থমূল্য নির্ধারণ করা দরকার হয় না। কিন্তু ডিভোর্স হয়ে গেলে নারীর সব কাজের অর্থমূল্য নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ে। নারীর ডেডিকেশনের মূল্য দিতে হবে। কারণ সেক্রিফাইস না করলে পুরুষ উপার্জন করতে সক্ষম হতো না। ডিভোর্সের পর পুরুষের উপার্জিত সম্পদে নারীর হিস্যা না থাকলে, পুরুষ এককভাবে বেনিফিশারি থেকে যায়। আর নারী ম্যাসিভলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বিয়ের আগের স্বামীর সম্পদ ও সঞ্চয় বিবেচ্য হওয়া হবে না। সেসব সম্পদ বাদ দিয়েই বিয়ের সময় অর্জিত সম্পদ ও সঞ্চয়ের হিসাব করে নারীর হিস্যা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ সেসব সম্পদের মালিকানা স্বামীর নিকাহের আগেই ছিল।

আদতে, ইসলামে গোঁড়ামির কোনো স্থান নেই।

অর্থডক্স মুসলিম ধারা নারীকে ইসলামে দেওয়া অধিকারে বিশ্বাসী? তারা মনে করে নারীর পড়াশোনা পঞ্চম শ্রেণির ওপরে জরুরত নেই। অর্থডক্সদের সমমনা আফগান তালিবানরা নারী শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণির পর বন্ধ করে দিয়েছে, যা ইসলামেও ইজাজত দেয়নি, এসব ইসলামের খিলাফ কাজ। তারা মহিলা ফ্যাকাল্টি দিয়েও পড়াশোনা জারি রাখতে পারত, কিন্তু করল না, এটাই হলো ধর্মীয় গোঁড়ামি। ইসলাম নারীকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের সীমার মধ্যে একাকী চলাচলের স্বাধীনতা দিলেও তারা মাহরাম পুরুষ ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতাও হরণ করেছে। নারীর চাকরি করার অধিকার রদ করেছে। বাংলাদেশে নারীর সব জায়গায় হাজিরানা থাকলেও নারীর মসজিদে, ঈদগাহে প্রবেশাধিকার দিতে গোঁড়া মুসলিমরা ইচ্ছুক না অথচ ইসলামের জন্মভূমি ও অন্যান্য মুসলিম দেশে নারীরা মসজিদ ও ঈদগাহে সালাত আদায় করছে, তারা সাউথ এশিয়ান ভূমিতে নিজস্ব ব্যাখ্যা হাজির করে মহিলাদের অসূর্যম্পশ্যা বানাতে চায়।

নারীকে যেখানে ইসলামের নামে সীমিত করতে পারে না, সেখানে উরফ বা স্থানীয় কালচার বিবেচনা করতে বলে। যদিও উরফ বদলায়, কিন্তু তাদের শত বছর আগের উরফ বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া বদলায় না। আবার ইসলাম যে প্রেক্ষাপটে বিধান দিয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপট বদলে গেলেও তাদের নতুন বিবেচনা নেই। নারীর যেকোনো স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের চিরন্তন অবস্থানের কারণে ইসলাম নারীকে যতটুকু অধিকার ও নিরাপত্তা দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

আমাদের দেশের অর্থোডক্সদের সমস্যাটা হলো, তারা কোরআন এককেন্দ্রিক ট্র্যাডিশনাল ব্যাখ্যা বোঝে, কিন্তু কোরআনকে গভীরভাবে বোঝার জন্য যে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, ফিলোসফি ও সাহিত্য বোঝা দরকার, এই জ্ঞানটা তাদের নেই। কারণ কোরআন একটা অত্যন্ত উঁচু মানের একটা সাহিত্য এবং কোরআনের তথা যেকোনো ধর্মগ্রন্থের কথাগুলো ফিলোসফিক্যাল, কোরআন শরিফের মধ্যে এক হাজারের ওপরে আয়াত আছে সরাসরি বিজ্ঞান নিয়ে এবং টোটাল কোরআনের মধ্যে একটা ইতিহাস ও ভূগোল বর্ণনা করা আছে। একজন মানুষ যখন কম জানবেন, তার জ্ঞানটা যখন নির্দিষ্ট একটা পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং গোটা জগতের অন্য অনেক বিষয় সম্পর্কে যখন জানবেন না, তখন তার মধ্যে গোঁড়ামিটা অনেক বেশি কাজ করবে, কারণ কোনো মানুষ তার জ্ঞানের বাইরে সে কখনো চিন্তা করতে পারে না। এ বিষয়ে আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক ও ভাষাবিদ স্ট্যানলি ফিশ তার বই Is There a Text in This Class? The Authority of Interpretive Communities (1980)-তে বলেন, মানুষ যেকোনো বিষয়কে ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা করে তার সেই জ্ঞান দ্বারা, যা সে কমিউনিটিগুলোর কাছ থেকে ছোটবেলা থেকে পেয়ে থাকে এবং তার এই থিওরির নাম হলো ‘ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটিজ’। তাই একজন অর্থোডক্স যেভাবে চিন্তা করে বা ভাবে, একজন বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সাধারণ মুসলিম বা মুসলিম স্কলার সেভাবে কিন্তু ভাববে না। তাদের অনুভূতি, ভাবনাচিন্তার মধ্যে এক্সটেনসিভ ফারাক থাকবে। এটাকে বিখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামস বলেছেন Structure of Feeling, মানে মানুষের অনুভূতিরও কাঠামো আছে, বই The Long Revolution (1961)।

বস্তুত, এমিলির নিঃসঙ্গতা শুধু ব্যক্তিগত loneliness নয়; এটি একটি সমাজের তৈরি isolation। তার নীরবতা শুধু তার ব্যক্তিগত স্বভাব নয়; এটি সেসব নারীর দীর্ঘ নীরবতার প্রতিধ্বনি, যাদের কথা কেউ শুনতে চায়নি। আর তার শেষ বিদ্রোহ কোনো বিজয়ের পতাকা নয়; এটি একটি আহত আত্মার শেষ আর্তনাদ। এখানেই গল্পটির ভয়াবহ সৌন্দর্য। এমিলি সমাজকে পরাজিত করেছিল কি না, সে প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমাজ তাকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দিয়েছিল কি না, যেখানে তার প্রতিরোধও আর সুস্থ জীবনের ভাষা খুঁজে পায়নি।

পাঠক, A Rose for Emily-এর গোলাপ তাই নিছক প্রেমের প্রতীক নয়। গোলাপের পাপড়ি নরম, কিন্তু তার কাঁটা ধারালো। এমিলির জীবনও তেমন। তার ভেতরে ছিল ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু তার চারপাশে ছিল ক্ষমতার কাঁটা। ছিল কোমলতা, কিন্তু সেই কোমলতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সামাজিক শৃঙ্খল। ছিল জীবনের আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু তার ওপর নেমে এসেছিল পিতৃতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়া। তাই এমিলির জন্য গোলাপ যেন ফুল এবং শোকবার্তা; প্রেম এবং মৃত্যু; কোমলতা এবং প্রতিরোধ; স্মৃতি এবং পচন।

তার জীবনের ওপর একটি গোলাপ রাখা যায়, কিন্তু সেই গোলাপ তার জীবনের ক্ষত ঢাকতে পারে না।

কারণ ফুল যত সুন্দরই হোক, মাটির নিচের অন্ধকারকে মুছে দিতে পারে না।

পরিশেষে বলব, সময়ের নদী বাইরে দিয়ে বয়ে গেছে, শহর বদলেছে, মূল্যবোধ বদলেছে, পুরোনো প্রথার গায়ে নতুন রঙ লেগেছে; মুসলিম বিশ্বে সর্বত্র নারী শিক্ষা গ্রহণ করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, বিভিন্ন অফিসে কাজ করে। কায়রো, ইস্তাম্বুল, কাতার, দোহা, কুয়ালালামপুর, জাকার্তা—এসব জনপদের ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ নারীসমাজের বিকাশকে উৎসাহিত করতে পারলে বাংলাদেশে তার অন্যথা হবে কেন! মহানবী মুহাম্মদ (দা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.), প্রথম মুসলমান নারী; তিনি ছিলেন একজন স্বাবলম্বী ব্যবসা উদ্যোক্তা। সেই আত্মনির্ভর নারীর জীবনের অনুপ্রেরণায় আরব বিশ্বের নারীরা আজ স্বনির্ভর, শিক্ষিত ও কর্মজীবী। একজন সৌদি নারী নভোযাত্রী মহাকাশযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি উমিদ রাখি, আমাদের দেশের অর্থডক্সরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডায়নামিক হবেন এবং রিজিডিটি থেকে বের হয়ে আসবেন, ইসলাম যেটাকে পারমিট করেছে, সেখানে বাগড়া দেবেন না, নিজস্ব মতবাদ চাপিয়ে দেবেন না।

উপনিবেশের অসুর মুক্ত করে দ্বিতীয় জন্মে ওতপ্রোতভাবে লড়াইয়ের ময়দানে ছিল আমাদের মায়েরা। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশই সন্তানের জীবনকে সাবলাইম ও রোশনাই করে। এই গভীর বোধ পুরুষসমাজের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি জারিত হবে, তত দ্রুত বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত সকাল উপহার দিতে পারবে।

এমিলির জীবনের ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে তুলে ধরে, নারী শুধু প্রেমহীনতা বা নিঃসঙ্গতার শিকার নয়, বরং এমন এক পিতৃতান্ত্রিক গণ্ডির মধ্যে বন্দি, যেখানে সে নিজস্ব পরিচয় গড়তে গিয়ে বিভ্রান্ত, অসুস্থ, এমনকি সহিংস হয়ে ওঠে। এই গল্পে নারীর স্বাধীনতা মানে মুক্তি নয়, বরং এক গভীর যন্ত্রণা, যা র‍্যাডিক্যাল ও পোস্টমডার্ন নারীবাদের সংকট এবং সীমারেখা প্রকাশ করে। এমিলির একটি গোলাপ হয়তো সহানুভূতির প্রতীক, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা, অপমান এবং আত্মপরিচয় হারানোর ইতিহাস।

লেখক: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com

সরকার কি পথ হারাচ্ছে

‘মোদি হটাও, ভারত বাঁচাও’

আলিয়া মাদরাসা জাতীয়করণ : সময়ের দাবি

হালাল সনদ ও খাদ্যনিরাপত্তা

গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা

বিদেশে সহিংস আওয়ামী লীগ

পানির রাজনীতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা

হুথিদের হিসাব-নিকাশের পাঠ

ভূরাজনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রযুক্তি

বন্দর চুক্তি নিয়ে কিছু কথা