১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী জেলাজুড়ে যে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তা ইতিহাসে ‘নোয়াখালী দাঙ্গা’ নামে পরিচিত। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নিজেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেছিলেন, ‘The battle for India is today being decided in East Bengal.’ অর্থাৎ, ‘ভারতের ভাগ্যযুদ্ধ আজ পূর্ববঙ্গে নির্ধারিত হচ্ছে।’ এই সংঘাত কেবল একটি স্থানীয় সংঘর্ষ ছিল না; এটি সমগ্র উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল এবং দুই দেশের একত্রীকরণ যে আর সম্ভব নয়, সেই নির্মম সত্যটি কেন্দ্রীয় নেতাদের মেনে নিতে বাধ্য করেছিল।
তবে পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের সম্ভবত অনেকেই সেই দাঙ্গার গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। দীর্ঘকাল ধরে এ নিয়ে যে চর্চা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ প্রায়ই একপেশে তথ্যে প্রভাবিত ছিল। ফলে ঘটনার প্রকৃত সত্য সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে প্রক্ষিপ্ত হয়নি। তাছাড়া দাঙ্গার কিছুদিন পরেই নোয়াখালী পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় স্থানীয় মুসলমানরা নিজেদের বিজয়ী হিসেবে ধরে নেন এবং ইতিহাসটি বস্তুনিষ্ঠভাবে নথিভুক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূর্য তখন অস্তমিত হওয়ার পথে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে বিধ্বস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে ভারত ধরে রাখা আর সম্ভব ছিল না। কিন্তু সাম্রাজ্য ছাড়ার প্রাক্কালে তারা যে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা তৈরি করছিল, তাতে পুরো উপমহাদেশে এক তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছিল। একদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে অখণ্ড ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের দাবি এবং অন্যদিকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের জোরালো দাবি—এই দুই বিপরীত মেরুর রাজনীতি পুরো দেশকে বারুদের স্তূপে পরিণত করেছিল।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী অঞ্চলটি ছিল এই রাজনৈতিক উত্তাপের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার সাধারণ মানুষ কোনো অন্ধ অনুসারী ছিল না; বরং ঐতিহাসিক ওহাবি আন্দোলন এবং হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলনের ঐতিহ্যে বলীয়ান এ অঞ্চলের মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ও সংগঠিত ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, দিল্লির দরবারে চলা ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের দরকষাকষিতে তাদের নিজস্ব ভাগ্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিক তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী, নোয়াখালীর ঘটনার পেছনে কাজ করেছিল একটি বহুমাত্রিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় সংঘটিত ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ বা কলকাতা দাঙ্গা এবং এর ধারাবাহিকতায় বিহারে মুসলমানদের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ডের রক্তক্ষয়ী প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছিল পূর্ববঙ্গে। ঠিক যেমন বর্তমান সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে, সে সময়ে বিহার থেকে মজলুম মুসলিম এবং জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের স্রোত এসে পৌঁছায় নোয়াখালীর মাটিতে। নোয়াখালী সম্পূর্ণ এককভাবে মুসলিম অধ্যুষিত না হলেও সেখানে আশ্রয় নেওয়া এসব শরণার্থীদের উপস্থিতি স্থানীয় সামাজিক ভারসাম্যে এক প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিনে রামগঞ্জের করপাড়ার প্রভাবশালী জমিদার ও হিন্দু মহাসভার নেতা রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর বাড়িতে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। এই সংঘাতকে আগুনে ঘি ঢালার মতো উসকে দিতে সে সময় কিছু গুজব রটানো হয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চরমে তোলার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব রটিয়ে দেওয়া হয় যে, পূজায় ছাগবলির বদলে কোনো মুসলমানের রক্ত বা মুসলমান শিশুকে বলি দেওয়া হবে। এই উসকানিমূলক গুজব সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনে মারাত্মক ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কট্টর অবস্থান ও বহিরাগত মুসলিম শরণার্থীদের উচ্ছেদের সশস্ত্র প্রস্তুতি, যা দাঙ্গার বারুদে সরাসরি অগ্নিসংযোগ করে।
কেন্দ্রীয় কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ নেতৃত্ব, কিংবা খোদ মোহনদাস গান্ধীর কাছে বারবার চিঠি লিখেও যখন নোয়াখালীর সচেতন নেতারা এই সংকটের কোনো সুরাহা পাননি, তখন তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পীরজাদা গোলাম সারোয়ার হুসেইনী সামপুরের দিয়ারা শরীফে মুসলিমদের এক বিশাল সমাবেশ ডাকেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ডাক দেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অঞ্চলের সব মুসলিম দলবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে। গোলাম সারোয়ারের গঠিত বাহিনী এবং স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা কাশেমের গঠিত বাহিনী একতাবদ্ধ হয়ে প্রভাবশালী জমিদার রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর বাড়ি অবরুদ্ধ করে। জমিদার সেসময় ব্রিটিশ পুলিশ, অস্ত্রশস্ত্র এবং নিজস্ব পেয়াদা বাহিনী দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও জাগ্রত জনতার স্রোতকে থামাতে পারেননি। দীর্ঘক্ষণ লড়াইয়ের পর জমিদারের পতন ঘটে এবং তিনি নিহত হন। এই জমিদার পতন ও গণপ্রতিরোধের মধ্য দিয়ে পুরো অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে পাল্টে যায়।
তৎকালীন ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহসভাপতি জওহরলাল নেহরু নোয়াখালীর সহিংসতাকে গভীর ভয়ের সঙ্গে দেখেছিলেন এবং একে তার অখণ্ড ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের লক্ষ্যের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। জনসমক্ষে তীব্র মানসিক ও মানবিক সংকটের কথা প্রকাশ করে নেহরু বলেছিলেন, ‘ভারতের অন্যান্য অংশে এবং বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যা ঘটেছে, তা এতটাই ভয়ংকর যে তা মৃত মানুষকেও জাগিয়ে তুলতে পারে।
সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই সংঘাতর পর যুক্তি দেখান, কলকাতা, নোয়াখালী ও বিহারের ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ই হলো চূড়ান্ত প্রমাণ যে, হিন্দু ও মুসলমানরা কখনোই একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। তিনি দাবি করেন, অখণ্ড ফেডারেল ভারতের জন্য ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং বাকি কেবল দুটি পরিণতি রয়েছে—‘হয় একটি বিভক্ত ভারত, নয়তো একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভারত।’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এই যুক্তি ব্রিটিশ প্রশাসন ও ক্লান্ত কংগ্রেস নেতৃত্বকে বোঝাতে সফল হয়—দেশভাগই একমাত্র অনিবার্য পথ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে মোহনদাস গান্ধী চার মাসব্যাপী শান্তি মিশন নিয়ে ৬ নভেম্বর নোয়াখালীতে উপস্থিত হন। তিনি নোয়াখালীর গ্রামে গ্রামে হেঁটে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। সেসময় স্থানীয় নেতা গোলাম সারোয়ার হুসেইনী গান্ধীকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, কলকাতা ও বিহারে দাঙ্গা বন্ধ হলে নোয়াখালী এমনিতেই শান্ত হয়ে যাবে।
নোয়াখালীর সেই ঐতিহাসিক গণপ্রতিরোধ ও রাজনৈতিক পালাবদল যদি সেদিন সংঘটিত না হতো, তবে অখণ্ড ভারতের অধীনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত। নোয়াখালীর অনমনীয় অবস্থানই প্রমাণ করেছিল, মুসলিমদের নিজস্ব অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে একটি পৃথক রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প নেই। আজ বর্তমান ভারতের দিকে তাকালে সেই আশঙ্কাই শতভাগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়, যেখানে সংখ্যালঘু মুসলিমরা প্রতিনিয়ত চরম নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে; এমনকি গোমাংস ভক্ষণ এবং পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির মতো মৌলিক ধর্মীয় অধিকার পালনেও তাদের প্রতিনিয়ত বাধা দেওয়া ও নিপীড়ন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারি চাকরিতেও মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত হতাশাজনক; বিভিন্ন সরকারি তথ্য ও সাচার কমিটির ঐতিহাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও উচ্চপদস্থ সিভিল সার্ভিস এবং সামগ্রিক সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের উপস্থিতি মাত্র তিন শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি। সুতরাং, নোয়াখালীর সেই গণপ্রতিরোধ যদি সেদিন ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের পথ সুগম না করত, তবে আজ পুরো উপমহাদেশের মুসলিম সমাজকে একই ধরনের চরম নির্যাতন, ধর্মীয় বন্দিত্ব, কাঠামোগত বৈষম্য ও তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
উভয় নেতার মন্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে বাস্তব পরিস্থিতি মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। নেহরুর অখণ্ড ভারতের আদর্শ রক্ষা করার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং জিন্নাহর পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পেছনে নোয়াখালীর এই গণপ্রতিরোধ ও রাজনৈতিক পালাবদল ছিল অন্যতম প্রধান টার্নিং পয়েন্ট, যার হাত ধরে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্র।
একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়, এটি আমাদের আত্মমর্যাদার মুকুট। নোয়াখালীর দূরদর্শী প্রতিরোধ থেকে শুরু করে একাত্তরের রণাঙ্গন পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায় আমাদের রক্তে লেখা এক অবিনাশী সত্য। আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে বঙ্গোপসাগরের বুকে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে শিকড়ের শক্তিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। যেকোনো পরাশক্তি বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে এই দেশের সুরক্ষায় তরুণ প্রজন্মকে হতে হবে আপসহীন, দূরদর্শী এবং ঐক্যে বলীয়ান। কারণ রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব আজ আমাদেরই।
লেখক: সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি
carbhuiyan@gmail.com