ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের ছায়ার মধ্যেই চলতি বছরের হজে ১৫ লাখের বেশি মুসলমান সমবেত হয়েছিলেন মক্কায়। তারা এমন এক সময়ে সেখানে সমবেত হন যখন ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথগুলোকে অচল, জ্বালানি বাজারকে অস্থির এবং পুরো অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক বিভেদের আশঙ্কাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামের পবিত্রতম এই ধর্মীয় স্থান কূটনীতিকে ছাপিয়ে সামনে এনেছে ধর্মের সীমাহীন প্রভাবকে। ইসলামের বৃহত্তম এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান নীরবেই যুদ্ধের দামামা থামিয়ে শান্তির বারতা বয়ে এনেছে।
এটা এমন এক যুগে ঘটেছে যখন বিশ্ব কূটনীতিকে ক্লান্ত এবং সামরিকীকৃত মনে হচ্ছে। সেখানে হজ মধ্যপ্রাচ্যের শৃঙ্খলা সম্পর্কে একটি উপেক্ষিত সত্য সামনে এনেছে। আর সেই অমোঘ সত্যটি হচ্ছে—ধর্মীয় পবিত্র বাধ্যবাধকতাগুলোর এখনো কৌশলগত গুরুত্ব আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল, তখন মক্কা হয়ে উঠেছিল সংযমের প্রতীক। ইরান এ সময়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধি থেকে বিরত ছিল। অন্যদিকে সৌদি আরবও বৈরিতা ভুলে প্রায় ৩০ হাজার ইরানি হজযাত্রীকে মক্কায় স্বাগত জানিয়েছিল। হজ উপলক্ষে এভাবেই দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর কিন্তু সুস্পষ্ট কূটনৈতিক করিডোর গড়ে উঠেছিল। এটা কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়, বরং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল।
কয়েক দশক ধরেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে ধর্মকে অস্থিতিশীলতার উৎস অথবা ‘প্রকৃত’ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আলংকারিক পটভূমি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু এ বছরের হজ সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। হজ উপলক্ষে মুসলমানদের বৃহত্তম এই সমাবেশ কার্যত ইরান যুদ্ধে একটি অনাক্রমণ চুক্তি হিসেবে কাজ করেছে, যা উপসাগর জুড়ে অস্থায়ী পবিত্র নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করেছিল। এর প্রভাব সৌদি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, তখন আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠেছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য বীমার প্রিমিয়াম বাড়ার পাশাপাশি অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমেই বাড়ছিল। বিশ্লেষকরা লেবানন থেকে ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানি প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আরো বাড়ার আশঙ্কা করেছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করে বলেছিল, সীমিত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপও উপসাগরীয় অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে। কিন্তু এই অস্থিরতার মাঝে একটি অদৃশ্য সীমারেখা টেনে দিয়েছিল হজ।
সৌদি মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, হজযাত্রীরা মক্কায় ঠিক সেই মুহূর্তে সমবেত হয়েছিলেন, যখন বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আনুগত্য, করুণা এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত কাজটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন। এই প্রতীকী তাৎপর্য বিভক্ত বিশ্বে বিপুল কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।
ইব্রাহিম (আ.) কেবল ইসলামেরই একজন নবী নন, তিনি একেশ্বরবাদী তিনটি ধর্ম ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইসলাম—সবার কাছেই অভিন্ন আদর্শ। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ছায়ায় হজ নীরবেই মুসলমানদের একটি সমাবেশের চেয়েও বৃহত্তর কিছুতে পরিণত হয়েছিল। এটি এ কথা মনে করিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটেই যুদ্ধরত সব পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে হজের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তাই হজ ও ঈদুল আজহার মিলন পারিপার্শ্বিক সহিংসতার বিপরীতে এক অসাধারণ নৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে। যখন ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি মিডিয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছিল, তখন লাখ লাখ মুসলমান ধ্বংসের বিরুদ্ধে সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে সমবেত হয়েছিলেন মক্কায়।
সেই অর্থে মক্কা এই অঞ্চলকে একটি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শক্তিশালী কূটনৈতিক রূপক উপহার দিয়েছিল, যার অর্থ এটাই যে, ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধররা সহাবস্থানে সক্ষম, এমনকি যখন তাদের সরকারগুলো সংঘাতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা অনুসন্ধানরত বিশ্ব কৌশলবিদদের জন্য এটি হয়তো উপেক্ষিত একটি শিক্ষা। আঞ্চলিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ওপরই নির্ভর করবে না, বরং যুদ্ধের রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়া অভিন্ন নৈতিক ভাষাকে আবার আবিষ্কার করার ওপরও নির্ভর করবে।
মাত্র এক দশক আগে সৌদি আরবে দেশটির প্রখ্যাত শিয়া আলেম নমর আল-নমরের মৃত্যুদণ্ড ঘিরে ইরানে সৌদি দূতাবাস ও অন্যান্য কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার পর সৌদি-ইরান সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। ২০১৫ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে শত শত ইরানি হজযাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক আরো তিক্ত হয়। কিন্তু এর বিপরীতে সহাবস্থানের একটি মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে হজ।
এ বছরের হজযাত্রা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ বার্ষিক সমাবেশ, যা মধ্যপ্রাচ্যে এই দশকের অন্যতম বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আয়োজনটি অসাধারণ শৃঙ্খলা, সহযোগিতা এবং সংযম প্রদর্শন করেছে। এই বাস্তবতা ‘সভ্যতার সংঘাত’ নামক দীর্ঘস্থায়ী ধারণার সরাসরি বিরোধিতা করে, যা এখনো পশ্চিমা চিন্তাবিদদের কিছু অংশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের গবেষণা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, হজে অংশগ্রহণ সহনশীলতা বাড়ায় এবং চরমপন্থার প্রতি সমর্থন কমায়। মক্কা থেকে ফিরে আসা হাজিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি বেশি সমর্থন এবং উগ্র মতবাদের বয়ানগুলোর প্রতি বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা গেছে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো, ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাকারী ভূ-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যখন খণ্ডিত বহুমেরুর যুগে প্রবেশ করছে, তখন এ বিষয়টি আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বর্তমানে প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। জাতিসংঘ বড় ধরনের সংঘাতে মধ্যস্থতা করতে হিমশিম খাচ্ছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমেই অচল করে দিচ্ছে। এই পরিবেশে স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী অপ্রচলিত উপাদানগুলো, যেমন ধর্মীয় বৈধতা, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও সভ্যতার প্রতীক কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করছে।
হজ এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এটা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ভঙ্গুর বলে মনে হচ্ছে। হজের সময়ে মক্কা এমন একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যা পারমাণবিক প্রতিরোধ এবং সামরিক জোটও করতে পারেনি। এর কারণ এটা নয় যে, ধর্ম রাজনীতির স্থান দখল করেছে, বরং হজের পবিত্রতা রাজনৈতিক আচরণকে এমনভাবে সংযত করেছিল, যা প্রচলিত কূটনীতি করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
এর মধ্যে আরো একটি সতর্কবাণীও নিহিত আছে। যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সাম্প্রদায়িক প্রতিশোধ বা রাষ্ট্রীয় পাল্টা আক্রমণের কারণে এবারের হজ ব্যাহত হতো, তবে এর পরিণতি সম্ভবত উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। হজযাত্রীদের প্রভাবিত করে এমন একটি সরাসরি হামলা ইন্দোনেশিয়া থেকে নাইজেরিয়া পর্যন্ত মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিতে পারত, যা ভঙ্গুর সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করে তুলত এবং বিশ্বজুড়ে পশ্চিমাবিরোধী মনোভাবকে আরো তীব্র করত।
এছাড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার টালমাটাল হয়ে যেত। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা আরো গভীর হতো। অর্থনৈতিক সংকট আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো এলোমেলো করে দিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংযমই জয়ী হয়েছে। এর মূল কারণ, পবিত্র স্থানের মর্যাদা লঙ্ঘন করলে এর জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অনেক বেশি রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতো।
চলতি বছরের হজের এটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা। প্রযুক্তিগত যুদ্ধ এবং লেনদেনের কূটনীতি প্রভাবিত এই শতাব্দীতেও প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংঘাতের ওপর নৈতিক সীমারেখা আরোপ করার ক্ষমতা এখনো ধর্মের আছে। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য গভীরভাবে বিভক্ত, কিন্তু মক্কা ক্ষণিকের জন্য বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বীরাও কখনো কখনো এমন সীমারেখা মেনে চলে, যা অতিক্রম করা যায় না।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বৈশ্বিক কূটনীতি খুব কমই জানে—কীভাবে এ ধরনের মুহূর্তগুলোর ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে হয়। তবুও মরুভূমির উত্তাপের নিচে যুদ্ধবিমান, নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক আশঙ্কার উদ্বেগের মাঝে কয়েকটি দিনের জন্য হজ এমন কিছু উপহার দিয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বহু বছর দিতে পারেনি। আর সেই উপহারটি হচ্ছে সংযম, যা ভয়ের ওপর নয়, বরং যৌথ পবিত্র দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী