হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জলাতঙ্ক নীরব ঘাতক, কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য

মো. মামুন হাসান

একটি কুকুরের কামড়। তারপর কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতা। ক্ষতস্থান ধোয়া হলো না, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হলো নাÑকয়েক সপ্তাহ বা মাস পর শুরু হতে পারে জ্বর, অস্থিরতা, পানি দেখলে ভয়। তখন অনেক সময় আর করার কিছু থাকে না। জলাতঙ্কের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এখানেইÑউপসর্গ প্রকাশের পর রোগটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। অথচ কামড়ের পর দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, প্রয়োজনীয় টিকা ও চিকিৎসা নিলে এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।

২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘স্ট্রঙ্গার টুগেদার’-একসঙ্গে আরও শক্তিশালী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলছে, জলাতঙ্ক নির্মূল সম্ভব, তবে এর জন্য মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কুকুরের টিকাদান, রোগ নজরদারি, জনসচেতনতা এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসাÑসবগুলো একই শৃঙ্খলের অংশ।

জলাতঙ্ককে আজ আমরা প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে জানি। কিন্তু মানবসভ্যতার সঙ্গে এ রোগের পরিচয় নতুন নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এ রোগের লিখিত ও চিত্রভিত্তিক ইতিহাস ৪ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতেও উন্মত্ত প্রাণীর আচরণ ও কামড়ের ভয়াবহতার উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিক পুরাণে লিসা (Lyssa) নামের এক দেবী উন্মাদনা, ক্ষিপ্ততা ও হিংস্র আচরণের প্রতীক। গ্রিক ভাষায় ‘লিসা’ শব্দের অর্থ উন্মাদনা, ক্ষিপ্ততা বা চরম পাগলামি। আধুনিক বিজ্ঞানে জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাস যে লিসাভাইরাস (Lyssavirus) নামে পরিচিত, তার শিকড়ও এই প্রাচীন গ্রিক শব্দেই নিহিত।

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অ্যারিস্টটলের লেখায়ও উন্মত্ত কুকুরের কামড়ের বিপদ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, রোগটির কারণ ও প্রতিষেধক সম্পর্কে মানুষ না জানলেও এর লক্ষণ ও পরিণতি বহু আগেই মানুষের নজরে এসেছিল। পরে ১৮৮৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ও তার সহকর্মীদের তৈরি জলাতঙ্কের টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনে। তার প্রয়াণ দিবস ২৮ সেপ্টেম্বর স্মরণে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়।

জলাতঙ্ক ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে সাধারণত কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানে লালা লাগার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কুকুরই মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রধান উৎস; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হার হিসাবে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানব জলাতঙ্ক সংক্রমণ আক্রান্ত কুকুরের মাধ্যমে ঘটে। বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, যার ৯৫ শতাংশের বেশি মৃত্যু এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটে। শিশুদের ঝুঁকিও বেশি। তবে রোগটির ভয়াবহতার পাশাপাশি রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির জায়গা। জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য। হু বলছে, সন্দেহভাজন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনীয় পোস্ট-এক্সপোজার চিকিৎসা নিলে রোগের সূত্রপাত ঠেকানো যায়। তাই ‘দেখি কী হয়’ ধরনের অপেক্ষা এখানে বিপজ্জনক।

কোনো কুকুর, বিড়াল বা সন্দেহভাজন প্রাণীর কামড় বা আঁচড় লাগলে ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা এবং প্রয়োজন হলে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নিতে হয়। ক্ষত ছোট হলেও বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের পর চিকিৎসাসেবা নেওয়া মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ হাসপাতালে সেবা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন। একই হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগের। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয় ৪২ জনের, ২০২৪ সালে ৫৮ জনের এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ৫৯ জন জলাতঙ্ক রোগীর মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব সংখ্যা হাসপাতালভিত্তিক, তাই এগুলোকে দেশের মোট মৃত্যুর পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা যে বড়, তা এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট।

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ খাতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘পথ কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা রয়েছে।

প্রকল্পের পরিকল্পনায় প্রতি বছর ৬৫ হাজার পথকুকুরকে টিকাদান এবং প্রকল্প মেয়াদে ৬৫ হাজার পথকুকুরকে বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে সংখ্যা ব্যবস্থাপনার কথা রয়েছে। অসুস্থ পথকুকুরকে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রাণীর টিকাদান ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মানুষের চিকিৎসা ও সচেতনতা যুক্ত হলে প্রতিরোধব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০০৭ সালে প্রথম পালিত হয়। তাঁর গবেষণার মাধ্যমে জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে মানুষের হাতে কার্যকর টিকা আসে। পরে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈশ্বিক জোট (জিএআরসি) একসঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে ছড়ানো জলাতঙ্ক রোগে মানুষের মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা ‘জিরো বাই থারটি ’ লক্ষ্য সামনে নেয়। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কজনিত মৃত্যু বন্ধ করা। কিন্তু লক্ষ্যটি শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা সরকারি কর্মসূচির বিষয় নয়। একটি পাড়া বা মহল্লায় টিকা না পাওয়া কুকুর, একটি শিশুর অসতর্কভাবে প্রাণীর কাছে যাওয়া কিংবা কামড়ের পর পরিবারের ‘কিছু হবে না’ ভাবনা- প্রতিটি ছোট ঘটনাই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই প্রতিরোধ শুরু হয় ঘর থেকেই। শিশুদের শেখাতে হবে অপরিচিত বা অস্বাভাবিক আচরণ করা প্রাণীকে না ছোঁয়া, প্রাণীকে উত্ত্যক্ত না করা এবং কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা গোপন না রাখা। পোষা কুকুর-বিড়ালের নিয়মিত টিকাদানও দায়িত্বশীল মালিকানার অংশ।

পথকুকুর নিয়ে জনমনে যে দ্বিধা বা বিরক্তি থাকে, তার সঙ্গে রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও জড়িত। শুধু প্রাণী সরিয়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; টিকাদান, সংখ্যা ব্যবস্থাপনা, অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের আচরণগত সচেতনতা- সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এ সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সহাবস্থানও তত নিরাপদ হবে।

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার গুরুত্ব এখানেই। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। চিকিৎসক, ভেটেরিনারিয়ান, স্থানীয় সরকার, প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ- সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কুকুরের গণটিকাদানকে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কজনিত মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রাণীর টিকাদানের পাশাপাশি মানুষের জন্য সহজলভ্য ও দ্রুত পোস্ট-এক্সপোজার চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা চিলিকে দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম দেশ হিসেবে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত জলাতঙ্ক নির্মূলের স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা ভুটানকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্ককে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূলের স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটিতে ২০২৩ সালের জুনের পর কুকুরবাহিত মানব জলাতঙ্কে কোনো মৃত্যু রেকর্ড হয়নি। দীর্ঘদিনের টিকাদান, প্রাণীর সংখ্যা ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ-এই সমন্বিত উদ্যোগই সেখানে সাফল্যের ভিত্তি। জলাতঙ্কের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু এর বিরুদ্ধে মানুষের হাতে এখন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধের কার্যকর উপায় আছে। একটি প্রাণীর টিকা শুধু সেই প্রাণীকে সুরক্ষা দেয় না; একই সঙ্গে মানুষের জীবনও সুরক্ষিত করে। আবার একটি কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া একজন মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

‘স্ট্রঙ্গার টুগেদার’ তাই কেবল একটি দিবসের স্লোগান নয়; এটি জলাতঙ্ক প্রতিরোধের বাস্তব কর্মপদ্ধতির কথাও বলে। পথকুকুরের টিকাদান, দায়িত্বশীল প্রাণী পালন, কামড় প্রতিরোধ, দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, সময়মতো টিকা, রোগ নজরদারি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ- প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। জলাতঙ্কের ভয়াবহতা আমাদের সতর্ক করে, আর এর প্রতিরোধযোগ্যতা আমাদের আশা দেখায়। তাই আতঙ্ক নয়, সঠিক তথ্য ও দ্রুত পদক্ষেপই হতে পারে প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি প্রাণীর জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের ভিত্তি।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

তালা বদলায়, দরজা বদলায় না—আর কত!!

মোবাইল ফোনের দাসত্ব নাকি উন্মুক্ত শৈশব

বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমানের অভিষেক ও প্রত্যাশা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: শুধু কূটনীতিই কি যথেষ্ট

‘...কিন্তু আলোর দেখা পেলাম না’

শুধু ইরান নয়, হুথিদের অভিযানের তাৎপর্য আরো বড়

অসুস্থ প্রতিযোগিতার আবর্তে সন্তানের শৈশব

অর্থনীতি কতটা সইতে পারবে

ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ