৭ নভেম্বর নিয়ে দেড় যুগ ধরে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে, ছড়ানো হয়েছে বিভ্রান্তি। এমনকি সাধারণ ছুটির সরকারি তালিকা থেকেও ৭ নভেম্বরকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে এ দিনটি নিয়ে কোনো কথা বা আলোচনা না হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এ দিনটি নিয়ে এত বিরাগ কেন? ৭ নভেম্বর কি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি সংখ্যা? আসলেই কি এটি সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব? ৭ নভেম্বর কি অনিবার্য ছিল? এই বিপ্লবের কতটা নির্মোহ বিশ্লেষণ হয়েছে এতদিন?
একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক। ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন। যেকোনো হত্যাকাণ্ডই মর্মান্তিক, বলাই বাহুল্য। কিন্তু দেশের জনগণ, এমনকি তার দলও সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়নি। পরদিনের পত্রিকাগুলোর শিরোনামেও অবিসংবাদিত নেতৃত্বের গুণগান তো দূরের কথা, নেহাত সাদামাটা শোকগাথাও প্রকাশিত হয়নি। বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর সরকারনিয়ন্ত্রিত দুটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি পত্রিকা মিলিয়ে তখন সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল চারটি। সেদিন ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ’। পত্রিকাটির প্রথম পাতার প্রথম কলামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। দৈনিক বাংলার শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’ আর সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। আগের দিন ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ কিংবা খবর নেই; বরং ইতিবাচক পরিবর্তনের গুণগান। সে সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ, যিনি পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংসদ সদস্য হন।
১৫ আগস্ট থেকে কার্যকর করে ২০ আগস্ট ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাক সামরিক শাসন জারি করেন। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ তখনো বহাল ছিল। সংবিধান নিয়ে কোনো কথা নেই। সব বাহিনীর প্রধান মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য ও সহযোগিতার প্রত্যয় গণমাধ্যমে ঘোষণা করেন।
আগস্ট ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে বঙ্গভবনে অবস্থান নেন। বলতে গেলে, তারা সেনা কমান্ডের বাইরে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের একান্ত সান্নিধ্যে ছিলেন। দেশে তখন চরম অনিশ্চয়তা। ১৯৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রভাব তখনো পুরোপুরি কাটেনি। রাস্তায় কঙ্কালসার, অনাহারপীড়িত মৃতদেহ পড়ে থাকত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে উধাও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল।
এর মধ্যে ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ উপপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূত করা হয়। চতুর খন্দকার মোশতাক জেনারেল জিয়াকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করলেও তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যের আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব এক উদাহরণ সৃষ্টি করে সেনাবাহিনীতে জেনারেল জিয়ার কমান্ড প্রতিষ্ঠার অন্তরায় সৃষ্টি করতে তার ওপরে বসিয়ে দেওয়া হলো আরো দুজনকে।
জেনারেল খলিলুর রহমানকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানদের নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হলো। আরো নিশ্ছিদ্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে জেনারেল ওসমানীকে দেওয়া হলো প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার পদ। এ দুজনই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেনারেল জিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে নানা অজুহাতে অসহযোগিতা করতেন। একই সময়ে সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান শাফায়াত জামিল সেনাবাহিনীতে কমান্ড ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেনাপ্রধানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেনাবাহিনীতে ভিন্ন ধারা প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনার পক্ষে জোরেশোরে মাঠে নামেন।
২ নভেম্বর রাতে ৪৬ ব্রিগেডের সহায়তায় ঢাকা সেনানিবাসে বিদ্রোহের সূচনা হয়। বন্দি হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া খালেদ মোশাররফ দিনভর চেষ্টা চালিয়ে খন্দকার মোশতাকের কাছে সেনাপ্রধান পদে নিয়োগের জন্য আবেদন জানিয়ে সফল হন ৩ নভেম্বর রাতে।
৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ ও তাদের মা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একটি মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যান। ৩ নভেম্বর রাতে সংঘটিত হয় জেলহত্যা। একই রাতে খালেদ মোশাররফদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদা, নূর, পাশা, মোসলেহ উদ্দিনরা বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ২৭ ফ্রেন্ডশিপ বিমানে সপরিবারে, ব্যক্তিগত মালামালসহ নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংককের উদ্দেশে উড়ে যান। এমনকি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে ফকার বিমানটির জ্বালানি পর্যাপ্ত না হওয়ায় চট্টগ্রামে একবার জ্বালানি ভরার ব্যবস্থাও করা হয় পরিকল্পনামাফিক।
সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত এসব কর্মকাণ্ড সাধারণ সৈনিকরা মোটেও পছন্দ করেননি। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। অন্যদিকে, খালেদ মোশাররফের তথাকথিত অভ্যুত্থান ও এর সমর্থনে উল্লসিত আওয়ামী লীগের মিছিল স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত বাংলাদেশে শান্তির নিঃশ্বাস নেওয়া দেশবাসীকে বাকশালী নির্যাতনের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কায় শঙ্কিত করে তোলে। তারাও এই অপশক্তির হাত থেকে পরিত্রাণের অপেক্ষায় ছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবির প্রচারণা। দেশের মানুষের তখন প্রত্যাশা ছিল, এমন একজন নেতার, যিনি এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে দেশকে পরিত্রাণ দিতে শক্ত হাতে হাল ধরবেন। আর সেনাবাহিনীর প্রত্যাশা ছিল তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব। খালেদ মোশাররফের হাতে জেনারেল জিয়ার বন্দিত্ব তারা সহজে মেনে নেয়নি।
ফলে সিপাহি ও জনতা—উভয়ের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন একজনই, তিনি জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমিক সৈনিকরা ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন তাদের উপযুক্ত প্রধান জেনারেল জিয়াকে। আর স্বতঃস্ফূর্ত জনতা ও দেশবাসী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের মতো আবার আশ্বস্ত হন যে দেশের ক্রান্তিকালে পরীক্ষিত ও অসমসাহসী দেশপ্রেমিক সেদিনের মেজর জিয়া ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে আবার এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ঠিক সময়ে দেশের হাল ধরেছেন।
জাসদ-সমর্থিত সৈনিকদের একটি দল কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুদের প্ররোচনায় ১২ দফা দাবির পাশাপাশি অদ্ভুত কিছু স্লোগান দিয়ে ঢাকা সেনানিবাসকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে—‘সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’। এই রক্তহোলিতে নারী চিকিৎসকসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন।
৭ নভেম্বরের পর বিশৃঙ্খল ও দিশাহীন বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন জিয়াউর রহমান। পূর্বঘোষিত সামরিক শাসনামলের প্রধান ছিলেন বিচারপতি আবু সায়েম। জিয়া ও অন্যান্য বাহিনীর প্রধানরা ছিলেন উপপ্রধান। এ ক্ষেত্রে একটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আমাদের সামনে এখনো রয়েছে।
৭ নভেম্বর না এলে বাংলাদেশের কী হতো? আমাদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা সেদিন অবশ্যই ছিল। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসার আশঙ্কাও ছিল।
একদলীয় বাকশালের নিষ্পেষণে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা হয়তো আজন্ম অধরাই থেকে যেত। এসব আশঙ্কা সত্যি হয়নি, সেটি হয়তো আমাদের অদেখা স্বস্তি। কিন্তু ৭ নভেম্বর থেকে আমাদের প্রাপ্তির তালিকা অনেক দীর্ঘ।
• ৭ নভেম্বর আমাদের মুক্তি দিয়েছে একদলীয় বাকশালের দুঃশাসন থেকে।
• দিয়েছে চারটি সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশনার পরিবর্তে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।
• দিয়েছে অভিন্ন জাতীয়তার পরিচয়—ধর্ম-বর্ণ, গোত্র-গোষ্ঠী, ভাষা-সংস্কৃতি, পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে সম-অধিকারের জাতীয়তা ‘বাংলাদেশি’।
• সমাজতন্ত্রের সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ধারণার বিপরীতে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য ও অবাধ বাজার অর্থনীতির সুযোগ।
• আমাদের বেকার যুবশক্তির জন্য উন্মুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার।
• নারীদের জন্য সৃষ্টি করেছে স্বাধীন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
• সাহায্যনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি।
• দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
• আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা অর্জন করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে।
• মুসলিম বিশ্বে পেয়েছে সম্মানের আসন। ওআইসির গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে পেয়েছে দায়িত্বপূর্ণ পদ।
আর সবকিছু ছাপিয়ে নিশ্চিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। যুগে যুগে এভাবেই ইতিহাস বীরত্বগাথা রচনা করে, আর একটি জাতি ক্রান্তিলগ্নে খুঁজে পায় তার যোগ্য সন্তানকে। ৭ নভেম্বর আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের মতোই আরেকটি অমর বীরত্বগাথা। সিপাহি-জনতার ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের এক অনন্য ইতিহাস। ঐক্যের এই স্রোতোধারা অব্যাহত থাকলে নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ, নিরাপদ থাকবে আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্ত, নিরাপদ থাকবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।
লেখক: আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল