উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ক্রমান্বয়ে দলীয় প্রভাব প্রকট আকার ধারণ করছে। বিষয়টি সরকারের জনপ্রিয়তা, শিক্ষার প্রসার বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণÑকোনোদিক দিয়েই ভালো হচ্ছে না। সরকারের উচিত তাদের কার্যকলাপের ওপর জনমনে আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করা। তবে উচ্চশিক্ষাঙ্গন, বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে সাম্প্রতিক কার্যক্রম লক্ষ করলে সরকার উল্লিখিত লক্ষ্যে কাজ করছে বলে প্রতীয়মান হয় না। কর্তৃত্ববাদী সরকার আমলের দেড় দশকে শিক্ষাঙ্গনে চরম নৈরাজ্য প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছিল। অথচ ওই সরকারের পতনের পর এ ক্ষেত্রটি অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগ পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ডজনাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করলেও জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন না করে ভুল করেছিল। নির্বাচিত সরকারের উচিত ছিল ওই ভুল সংশোধন করে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিন্তু সরকার তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শিক্ষা সংস্কার কমিশন বা উচ্চশিক্ষা সংস্কার কমিশন বলে কোনো কিছু গঠনের কোনো ঘোষণাও আমরা এ সরকারের কাছ থেকে এখনো শুনিনি। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাজিত নৈরাজ্যের অবসান হয়নি। শিক্ষা জগতের সব এলাকার সমস্যা একত্রে ছোট পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। এখানে উচ্চশিক্ষাঙ্গন, তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডের ওপর কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক প্রধান। তিনি যদি সৎ, সচ্চরিত্র, যোগ্য, শিক্ষার্থীবান্ধব, মানবিক এবং প্রকৃত অভিভাবকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন না হন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ভালো চলে না। তাকে হতে হয় সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছে একজন আদর্শ, ন্যায়পরায়ণ এবং অনুকরণীয় আইকন প্রকৃতির ব্যক্তিত্ব।
কর্তৃত্ববাদী সরকার আমলে এমন উপাচার্যের দৃষ্টান্ত বিরল হয়ে উঠেছিল। পরিবর্তে, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের চেয়ারে দেখা গিয়েছিল নতজানু, স্তাবক, দলবাজ, তেলবাজ, মেরুদণ্ড-দুর্বল এবং সরকারের অঘোষিত ডিকটেশন অনুযায়ী কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার মতো ব্যক্তিত্ব। তাদের অনেককে সরকারি দলের দলীয় সভার প্রথম সারিতে বসে থাকতে দেখা যেত। এমনকি রাজধানীর একটি বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে এমনও বলতে শোনা গিয়েছিল, তিনি সরকারি দলের যুব সংগঠনের চেয়ারম্যান পদ পেলে উপাচার্যের পদ ছেড়ে দেবেন। এর চেয়ে অপেশাদার এবং নন-একাডেমিক উদাহরণ আর কী হতে পারে!
কর্তৃত্ববাদী সরকারের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভিসি নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে ওই সরকার রাজনৈতিক বলয়ে জড়িত নন—এমন শিক্ষক ব্যক্তিত্ব খুঁজে তাদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দিয়েছিল। তবে এমন শিক্ষক ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কম হওয়ায় ওই সরকারকে একাডেমিক যোগ্যতার দিকে লক্ষ্য রেখে ভিসি-প্রো-ভিসি নিয়োগ দিতে দেখা গিয়েছে। ওই সরকার যাদের এসব পদে নিয়োগ দিয়েছিল, তাদের প্রায় সবাই একাডেমিকভাবে সুযোগ্য ছিলেন। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে আবারও দলবাজি বেড়েছে। যদিও নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, উচ্চশিক্ষাঙ্গন হবে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত। কিন্তু সরকারের শিক্ষাঙ্গনের কাজের সঙ্গে এর সামান্যতম মিল নেই।
সরকার এখন উচ্চশিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি ম্রিয়মাণ করার পরিবর্তে কঠোরভাবে নিজদলীয় লোকজন নিয়োগ দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে দলবাজি অধিকতর সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, তাদের সবাই কি অযোগ্য ছিলেন? দুর্নীতিবাজ ছিলেন? তা তো না। তাদের মধ্যে যারা ভালো ছিলেন, যাদের অনেকেই এক-দেড় বছরে কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে অব্যাহতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি ঘটাচ্ছিলেন, এ সরকার তাদের তো না সরালেও পারত। কিন্তু না, সরকার শিক্ষাঙ্গণকেও দলীয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে উদ্যোগী হন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করার পর সবকিছু বুঝেশুনে কাজ শুরু করতে সময় লাগে। অন্তর্বর্তী সরকারামলে নিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কেউ দেড় বছর বা কেউ তার একটু কম বা বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে তদবিরের প্রভাবে সেসব উপাচার্য বদল করে নতুন দলীয় শিক্ষক ব্যক্তিত্বদের উপাচার্যের পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একজন উপাচার্য চার বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরে তিনি ভালো কাজ করলে তাকে আরো এক মেয়াদের জন্য নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজও আছে। এ রকম হলে বিশ্ববিদ্যালয় অভিজ্ঞ উপাচার্যদের সেবা পায়। কিন্তু না, কোনো অভিযোগ যাচাই-বাছাই না করেই এ সরকার অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রায় সব উপাচার্যকে সরিয়ে দেন। তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা না করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এতে অনেক পরিশ্রমী উপাচার্য, যারা প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছিলেন, তারা অসম্মানিত বোধ করেন।
উপাচার্যের পদটি খুবই সম্মানিত পদ। এ পদে নিযুক্ত শিক্ষক ব্যক্তিত্বরা যুগপৎ একাডেমিয়া এবং শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজে সম্মান পান। কাজেই এমন গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ নিয়ে হঠকারিতা, অনিয়ম বা খামখেয়ালিপনা কাম্য নয়। কিন্তু সরকারি কার্যক্রম দেখে মনে হয়, সরকার এ ক্ষেত্রে ‘আমরা যা খুশি তাই করব’ নীতি গ্রহণ করেছে। এমন নীতি গ্রহণ করা হলে একাডেমিয়ায় সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাবে। অতি সম্প্রতি চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সরকারের খামখেয়ালিপনা সবার নজর কেড়েছে। উল্লেখ্য, নবগঠিত বিএনপি সরকার ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগদান করে। এ নিয়োগের পর চুয়েটের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা সবাই খুশি ছিলেন এবং তারা সবাই মিলে নতুন উপাচার্যকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। নতুন ভিসির নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় ভালোভাবে চলছিল এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। অথচ চার বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া এ উপাচার্য যখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যস্ত, তখন জানতে পারেন তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
কী অভিযোগে বা কী কারণে ড. সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্যের পদ থেকে নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিন পর অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শেখ শরীফুল আলমকে ওই পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো, সে বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ ঘটনা চুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তারা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং শত শত শিক্ষার্থী হল থেকে বেরিয়ে এর প্রতিবাদে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত করে তোলেন। শিক্ষার্থীরা ভিসি ভবনে তালা লাগিয়ে ক্যাম্পাসে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষকরাও কর্মবিরতি পালন করায় চুয়েটে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এ বিক্ষোভ ও আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে।
সরকারের কাজ হবে এখন শিক্ষাঙ্গনে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু এমন সময়ে সরকার কেন কোনো ঘোষিত অভিযোগ বা কারণ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তা বোধগম্য নয়। সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ নিয়ে বিরাজিত খামখেয়ালিপনা বন্ধ করা। সরকারের উচিত হবে, কেন চুয়েটে উপাচার্যের মতো সম্মানিত পদে নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিন পর চুয়েট উপাচার্য প্রফেসর সায়েমকে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই অশালীন প্রক্রিয়ায় অব্যাহতি দেওয়া হলো, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা। সরকারকে অবশ্যই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার আগে ভেবেচিন্তে সুযোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক ব্যক্তিত্ব বেছে বের করে তাদের নিয়োগ দিতে হবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই কাউকে নিয়োগ দেওয়ার আগে পছন্দ করা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অনেকের পর্যবেক্ষণ এমন দাবি করে, কিছু বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার আগে নিয়োগদাতারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিয়োগ করা ব্যক্তিদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন মনে করেননি। তবে একবার কাউকে উপাচার্যের মতো একটি সম্মানিত পদে নিয়োগদান করার পর কোনো কারণ ছাড়া তাকে অপসারণ করা শালীনতার পর্যায়ে পড়ে না। এমন কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে ছন্দপতন ঘটায়।
সম্মানিত পদাধিকারী যেকোনো একজন উপাচার্যকে চুয়েট উপাচার্যের মতো অসম্মানিত ভঙ্গিমায় অপসারণ করে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করা অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয়। কলুষিত বর্ণ রাজনীতির উসকানিতে প্রভাবিত না হয়ে, অথবা গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি বা চরিত্রগত কেলেঙ্কারি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে কাউকে উপাচার্যের পদ থেকে অপসারণ না করাই উত্তম। তা ছাড়া সরকারের উচিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের নৈমিত্তিক কার্যক্রমের ওপর অব্যাহতভাবে নজরদারি জারি রাখা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং পরিবহন ও প্রকৌশল দপ্তরের কার্যকলাপের ওপর বিশেষ নজরদারি করা।
চুয়েট ভিসির অপসারণের মতো ঘটনা ঘটতে থাকলে উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ভবিষ্যতে কোনো আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন অধ্যাপক দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত চুয়েটের বিষয়টির গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করে ওই প্রতিষ্ঠানে বিরাজিত উত্তেজনা প্রশমিত করা। সেই সঙ্গে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনিশ্চিত কারণের ভিত্তিতে কোনো উপাচার্যকে অব্যাহতি দিতে চাইলে তা বারবার পর্যবেক্ষণের পর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে তারপর এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কাগুজে অভিযোগ, রাজনৈতিক তদবির বা কলুষিত বর্ণ রাজনীতির প্রভাবে কোনো উপাচার্যকে নিয়োগদান বা ওই পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত না নেওয়াই উত্তম। উপাচার্যের মতো সম্মানিত পদে নতুন নিয়োগদান এবং অব্যাহতি প্রদান অসম্মানিত ভঙ্গিমায় হওয়া কাম্য নয়।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com