চট্টগ্রামের নিউ মুরিং কনটেইনার পোর্ট হ্যান্ডলিংয়ের চুক্তিকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো রাজনৈতিক মহলের মারমুখী প্রতিবাদ দেখে একটু বিস্মিত হয়েছি। কারণ বিদেশি কোম্পানি দ্বারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বন্দর পরিচালনার ঘটনা নতুন কিছু নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এটি প্রচলিত আছে বহু আগে থেকেই। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরো সহজ এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য অতি দক্ষ লজিস্টিক কোম্পানিগুলোকে বন্দরগুলো ইজারা দেওয়া হয়। এমনকি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বহু দেশের বড় বড় বন্দর বিদেশি কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে থাকে। এমনকি ভারত পর্যন্ত। এতে কোনো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার সামান্যতম কারণ আছে বলে মনে হয় না।
অন্যদিকে যে মহলটি এই প্রতিবাদ করছে, তারা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভারতের সঙ্গে করা ট্রানজিটসহ ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরের ব্যাপারে টুঁ শব্দ করেনি কখনো। এই একই মহল ১৯৭৪ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির বিরোধিতা করেনি, বরং স্বাগত জানিয়েছিল। অথচ ওই চুক্তিকে তৎকালীন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো গোলামি চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিল। সেই গোলামি চুক্তির অন্যতম একটি ধারায় উল্লেখ করা হয়েছিল, এক দেশ অন্য দেশ কর্তৃক আক্রান্ত হলে এক দেশ অন্য দেশকে সাহায্য করবে। অর্থাৎ, ভারত আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ ভারতকে সহায়তা করবে; আর বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে ভারত সাহায্য করবে। তাই সে সময় রাজনীতিবিদরা মজা করে বলতেন, বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে ভারত সীমান্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত—পূর্ব দিকে সামান্য সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের হাঙর-কুমির। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে ভারত আক্রমণ না করলে কি বঙ্গোপসাগরের হাঙর-কুমির আক্রমণ করবে? অথচ এ রকম একটি চুক্তিকেও ওই একই তথাকথিত প্রগতিশীল মহল অভিনন্দন জানিয়েছিল। আজ আবার তারাই বন্দর নিয়ে হইচই করছে।
বর্তমানে যে চুক্তিটি নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটা একটা অভিসন্ধি থেকে যে করা হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বাংলাদেশ সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক যে কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি করেছে, সেটি বিশ্বের প্রায় ৭৭টি দেশের বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে থাকে। এমনকি ‘দেশ গেল গেল’ বলে যেসব প্রগতিবাদী সংগঠন আন্দোলন করছে, তারা হয়তো জানেই না—এই কোম্পানি তাদের প্রিয় দেশ ভারতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করে। বলা যায়, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় তিন দশক ধরে ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এতে ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে কোনো আন্দোলনের কথা আমার জানা নেই। সম্ভবত কোনো আন্দোলন কখনো হয়নি। অথচ সেখানে খুব শক্তিশালী বন্দর শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিকরা লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে। এসব অজ্ঞতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো মদতদাতা আছে?
এদিকে সব মহলের সন্দেহ মোচন করতে এ ব্যাপারে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার। কারণ আমরা কথায় কথায় ‘দেশ গেল গেল’ বলে হইচই করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে বেশ পারঙ্গম। একবার ভেবে দেখুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা। এই দেশটি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি; সামরিক, অর্থনীতি, প্রযুক্তি—সব দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে। অথচ এই দেশটির ১৫টির মতো বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করে থাকে বিদেশি কোম্পানিগুলো।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ১৫টি বড় বন্দরের প্রায় ১০০টির মতো আলাদাভাবে পরিচালিত টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি টার্মিনাল চীন, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং লাইন বা লজিস্টিক কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে থাকে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে পড়েছে, তা কখনো শুনিনি।
মূলত বৈশ্বিক মেরিটাইম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং আধুনিক লজিস্টিক নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কনটেইনার বন্দরগুলো দীর্ঘমেয়াদিভাবে বিদেশি কোম্পানিগুলিকে ইজারা দিয়ে থাকে। এবার আরো ভেবে দেখুন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও সেই চীনের কোম্পানিও সেখানে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং করছে। এ ব্যাপারে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানি কাজ করলে জনগণের বিশাল একটি অংশের মধ্যে কেন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে? এর কারণ হচ্ছে ভারতের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং দুর্বল ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি তার আগ্রাসী মনোভাব।
প্রতিবেশী দেশগুলো ভালো করে জানে, ভারত কীভাবে করদ রাজ্য হায়দরাবাদ ও জুনাগড় গিলে খেয়েছিল, অন্তর্ভুক্ত করেছিল জম্মু ও কাশ্মীর। কিংবা কীভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র মণিপুর ও সিকিম দখল করেছিল। এসব কারো অজানা নেই। এ কারণেই প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণ সবসময় ভারতকে সন্দেহের চোখে দেখে।
সবশেষে এ প্রশ্ন আসতে পারে যে, কেন কনটেইনার বন্দর হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটোমেশন ইত্যাদি খাতে বিশাল বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিশ্বব্যাপী তাদের নেটওয়ার্কিং সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য বিস্তারের সুযোগ পেতে বিভিন্ন দেশ ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো কোম্পানিকে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দিয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে, সেটা হচ্ছে—আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশের কথা না হয় বাদ দিলাম; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো কেন বিদেশি কোম্পানিকে কনটেইনার বন্দর হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব প্রদান করে থাকে। সেই একই কথা—এসব কোম্পানির যেমন রয়েছে দক্ষতা, তেমনি রয়েছে বিশাল বিনিয়োগের সক্ষমতা। সেই সঙ্গে তাদের রয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজবহর। আর রয়েছে সারা বিশ্বে বিশাল নেটওয়ার্কিং। এর ফলে এসব কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই এ ধরনের কোম্পানিকে হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এসব সুবিধা সত্ত্বেও সমালোচকরা কিছু ঝুঁকির কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকেন। যেমন বিদেশি কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও বন্দর চার্জ বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞ জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও বলে থাকেন। যেমন, তারা মনে করেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিলে ভূরাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এটা জানা যায়, দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ব্যবস্থা, বন্দরের অন্যান্য উন্নয়ন প্রভৃতি খাতে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো কোম্পানিগুলো সহজে বহন করতে সক্ষম। সেইসঙ্গে এ ধরনের কোম্পানির বিশ্বব্যাপী যে নেটওয়ার্কিং রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুবই সহায়ক। এ ছাড়া তাদের রয়েছে এমন বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজবহর, যা গন্তব্যে দ্রুত পণ্য পৌঁছাতে খুবই কার্যকর।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক