হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ডিজিটাল দাসত্ব: ২১ শতকের নতুন ঔপনিবেশিকতা

ইলিয়াজ হোসেন রানা

ইলিয়াজ হোসেন রানা ইতিহাসে প্রতিটি অত্যাচারী শক্তি অস্ত্র, অর্থ কিংবা ধর্মকে ব্যবহার করে শাসন করেছে। কিন্তু আজ একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ানক উপকরণ হয়ে উঠছে তথ্য ও প্রযুক্তি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের এই চূড়ান্ত পর্বে আমরা প্রবেশ করছি এক কৃত্রিম সাম্রাজ্যে, যার রূপ বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে; তার ওপর সমগ্র বিশ্ব প্রবেশ করছে এক নতুন দানবীয় ভবিষ্যতে, যার নাম ডিজিটাল দাসত্ব। এআই, চ্যাটজিপিটি, কিংবা নিউরালিংক প্যালান্টির টেকনোলজিস এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বলা যেতে পারে মানুষের চিন্তা, পছন্দ, বিবেক ও আচরণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম যন্ত্র। আজকের সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা প্রতিটি মানুষের ওপর নজর রাখছে আন্তর্জালিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। এআই এখন যুদ্ধ চালায়, বিচারের রায় দেয়, এমনকি শরীরের কোষ নিয়ন্ত্রণেও কাজ শুরু করছে। চায়না-এর ‘সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম’ তার বাস্তব রূপ, যা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। প্রযুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র হলোÑমানুষের আত্মাকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কৃত্রিম জগতে আটকে ফেলা। মেটাভার্স আমাদের এক ভার্চুয়াল জগতে বন্দি করতে চায়, সেখানে বাস্তবতা নেই, কিন্তু সবকিছুই মস্তিষ্কে অনুভূত হবে। নিউরালিংক (ইলন মাস্কের প্রকল্প) মস্তিষ্কে চিপ বসিয়ে চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এভাবে এক ভবিষ্যতের রোবোটিক জনগণ তৈরি হবে, যারা ভাববে তারা স্বাধীন অথচ চিন্তা করার ক্ষমতাটুকু থাকবে না। এটি শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি হলো মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা হরণকারী এক ষড়যন্ত্রকারী চুম্বক।

অতীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বড় অনুষঙ্গ ছিল মারণাস্ত্র। ভবিষ্যতে এই মারণাস্ত্রের যুদ্ধ নাও হতে পারে। প্রযুক্তি, মিসাইল, পারমাণবিকÑঅর্থাৎ নিউক্লিয়াসসহ নানা রাসায়নিক অস্ত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আরো আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তির উৎকর্ষ হিসেবে সামনে আসবে। একটা বাটন চাপ দিয়ে তছনছ করে দেওয়া হবে একটা বৃহৎ অঞ্চল। এআই যোদ্ধা থাকবে ময়দানে, পরিচালিত করবে তারা। সে এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের বাস্তবতা। তখন মানুষের সামনে থাকবে এক চোখে দেখার অপশন এআর গগলস, ভিআর হেলমেট, ফেস রিকগনিশন দিয়ে শাসিত নগররাষ্ট্র, আর এআই দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে মানব আচরণ। বাস্তবতা হবে তার মস্তিষ্কে প্রোগ্রামড। তখন সত্য-মিথ্যার বিভাজন বিলুপ্ত হবেÑএটাই প্রযুক্তির আসল শক্তি। এআই, বিগ ডেটা, মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, ধর্মবিশ্বাস এবং সামাজিক গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যা একদিন কল্পকাহিনির বিষয় ছিল। আজ তা রিয়েলটাইম প্রোফাইলিং। আজ এআই চ্যাটবট, ডিজিটাল অ্যাভাটার এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটার যে গতিতে মানুষকে প্রভাবিত করছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক চেতনা পর্যন্ত বিধ্বস্ত করছে। নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, স্পটিফাই-এর অ্যালগরিদম আর যেকোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আহ্বান প্রচারে যথেষ্ট।

নিউরালিংক, ক্রিসপার এবং ট্রান্সহিউম্যানিজম নামের প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষকে ঈশ্বরতুল্য করে গড়ে তোলার এক ভয়ংকর প্রয়াস চলছে। ইলন মাস্ক, হারারির মতো ব্যক্তিরা বলেন, ‘মানবজাতির ভবিষ্যৎ তাদের হাতে নয়, যাদের বিশ্বাস আছেÑবরং আমাদের হাতে, যারা কোড লিখতে পারে।’ এমন একসময় আসবে, যখন বায়োচিপ ছাড়া কেউ চিকিৎসা পাবে না, ডিজিটাল আইডি ছাড়া শিক্ষা পাবে না আর ইথারনেট ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করা হবে না। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, গুগল ডিপমাইন্ড, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসÑসবই মানবজাতির এক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এদের কোনো একজন বলেছিলেন, ‘কোনো মুদ্রা বা রাষ্ট্রের নেতাকে নিয়ন্ত্রণের দরকার নেইÑযদি আমি তার তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।’ তথ্য এখন অস্ত্র এবং সেই অস্ত্রের কারখানাগুলো হলোÑডব্লিউইএফ (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম), ইউএন ২০৩০ অ্যাজেন্ডা, হু প্যান্ডেমিক অ্যাকর্ড, আইএসও ডিজিটাল আইডি ফ্রেমওয়ার্ক প্রভৃতি। পোপ ফ্রান্সিসের আমলে ভ্যাটিক্যান খোলাখুলি বলেছিলÑ‘এআই ও প্রযুক্তি মানবতার অংশ, একে কল্যাণ বিবেচনা করতে কোনো আপত্তি নেই।’ ২০২০ সালে, ভ্যাটিক্যান পোপ ফ্রান্সিসের উপস্থিতিতে ‘রোম কল ফর এআই এথিক্স’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে। এই উদ্যোগে মূলত তিনটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট, আইবিএম ও গুগলের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন। কিছু তথ্য বলছে, আমাজনও ছিল। সবাই পোপের ডেটা এথিক্স সেমিনারে অংশ নেয়। এ যেন ‘সাইবার ঈশ্বরের অভিষেক’।

আধুনিক যুগে তথ্যই শক্তি। তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করলেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব মানুষ ও সমাজের গতিপথ। টেম্পলার ও তাদের উত্তরসূরি গোপন সংঘগুলো এখনো শক্তিশালী। কারণ তারা বিশাল ডিজিটাল নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, তথ্য ফাঁস থেকে শুরু করে তথ্য রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বিশ্ব-অর্থনীতি ও রাজনীতির গোপন ডেটা হাতিয়ে নেয় এবং বৃহৎ তত্ত্ব সংগ্রহ ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে। টেম্পলারদের আধিপত্য শুধু নজরদারি বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধ নয়, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনমত গঠন করে। বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। বিশ্বের ক্ষমতার মঞ্চে যারা এই প্রযুক্ত প্রযুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই বর্তমান যুগের সিংহাসনের অধিকারী। ঐতিহাসিকভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান গোপনবিদ্যার অধিকারী ছিল, তারা আজ আধুনিক প্রযুক্তির কারিগর। ভ্যাটিক্যান সিটির প্রাচীন লাইব্রেরির মতো গোপনীয়তা আজ ডিজিটাল সিকিউরিটির মাধ্যমে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে, গোপন তথ্য নিরাপদ রাখার জন্য উন্নত প্রযুক্তি; তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করছে। টেম্পলার নেটওয়ার্ক আজ গভীর রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তারা বিভিন্ন দেশের সরকার ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে, সংকট সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক গোপন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে। এমনকি বিশ্বের বড়-বড় অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ বা শান্তির ঘটনাও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। টেম্পলার নেটওয়ার্কের আধিপত্য আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো সময়ে প্রকাশ পেতে পারে। তাদের গোপন বিদ্যা ও আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণই আজ বিশ্ব রাজনীতির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি।

তুরস্কের বিনিয়োগ ব্যাংক ও দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

বাঁশখালীর মিষ্টি পানের চাহিদা বাড়ছে বিদেশে

তেজগাঁওয়ে রেলওয়ের পাঁচ একর জমি আবার অবৈধ দখলে

সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও জীবিকা অর্জনে যেতে পারছেন না বনজীবীরা

‘কম খাইয়াও তো চলতে পারতাছি না’

যুদ্ধ ইরানকে আরো আত্মবিশ্বাসী করেছে: মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনা

দুই ম্যাচে পরাজয় ঠেকানো পিএসজি এবার হার মানল

শাহজালালে পরিত্যক্ত ১২ উড়োজাহাজ এখন গলার কাঁটা

ইরান যুদ্ধের তথ্য ফাঁস, ৫০ মার্কিন সেনার ‘পলিগ্রাফ’ পরীক্ষা করল ট্রাম্প প্রশাসন

পরশুরামে কাজ করতে এসে নেত্রকোনার শ্রমিকের মৃত্যু