একটি রাষ্ট্রকে বিশাল বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়Ñযে বাড়ির প্রতিটি ইট মানুষের স্বপ্ন, প্রতিটি জানালা তার স্বাধীনতার চোখ। তার ছাদে পতাকা ওড়ে, দেয়ালে সংবিধানের অক্ষর খোদাই থাকে, দরজায় আইনের নাম লেখা থাকে আর ভেতরে আদালত, সংসদ, প্রশাসন, পুলিশ, গণমাধ্যম ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য কক্ষ থাকে। কিন্তু বাড়ির স্থায়িত্ব রঙিন দেয়ালের চাকচিক্যে নয়; তা নির্ভর করে ভিত্তি কত গভীরে প্রোথিত, স্তম্ভ কত দৃঢ় এবং দরজা সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে খোলা কি না। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তার বদলে ক্ষমতার নৈকট্যকে বেছে নেয়, তখন প্রথম ফাটল ইটে নয়, মানুষের বুকের ভেতর জন্ম নেয়—আস্থার দেয়ালে। আইন তখন বইয়ের পাতায় নির্বাসিত হয় আর রাস্তায় জন্ম নেয় অঘোষিত বিধান : যার ছায়া যত দীর্ঘ, তার দায় যেন তত ক্ষীণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ফাটলের দাগ নতুন নয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর অস্থিরতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীকরণের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক পুঁজি দিয়ে অর্জিত বৈধতাও যদি জবাবদিহির বিকল্প হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের ভিত নরম হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের শেষপর্যায় এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসবিদদের নানা মূল্যায়ন আছে; তবে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ১৯৭৫-এ নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা নথিভুক্ত ইতিহাসের অংশ। ইতিহাস শুধু অতীতের ধুলো নয়; কখনো তা বর্তমানের জানালায় জমে থাকা কুয়াশা, যার ভেতর দিয়ে একটি জাতি নিজের ক্ষতবিক্ষত পুরোনো মুখ দেখতে পায়।
চাঁদাবাজি, দখল, টেন্ডারনির্ভর ক্ষমতা, দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ এবং প্রশাসনের সম্ভাব্য নিষ্ক্রিয়তা যদি একই সুতোয় বাঁধা পড়ে, তাহলে প্রশ্নটি একটি ঘটনার চার দেয়ালে আটকে থাকে না; তখন তা সেই দেয়াল ভেঙে রাষ্ট্রের গোটা স্থাপত্যের কাঁপতে থাকা ছাদে উঠে যায়Ñসেখানে নীরবতাও সাক্ষ্য দেয়। ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব, আমলাতন্ত্র এবং বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকারের ধারণা বিশ্লেষণ করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে কর্তৃত্ব যদি দলীয় বা ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে ভেঙে যায়, তাহলে আইনের চাবি এমন মানুষের হাতে চলে যেতে পারে, যারা আইন দিয়ে দরজা খোলার বদলে সাধারণ মানুষের সামনে দরজায় শিকল এঁটে দেয়।
মিরপুরের রাড্ডা MCH-FP Centre-এর সাম্প্রতিক ঘটনা এই প্রশ্নের ক্ষতকে আরো গভীর করে তুলেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় পাঁচ দশক ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটিতে মধ্যরাতে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর চালায় এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনা ধ্বংস করে। পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং জানিয়েছে, তারা অর্থের বিনিময়ে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি ও সম্ভাব্য গাফিলতি নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে পক্ষগুলোর ভিন্ন দাবি রয়েছে; স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় তদন্তেই নির্ধারিত হবে।
তবে কোনো ঘটনার আইনি সত্য এক জিনিস, আর তার সামাজিক প্রতিধ্বনি আরেক—দুটো সবসময় একই দরজায় এসে দাঁড়ায় না। হাসপাতাল শুধু ইট, কংক্রিট, কক্ষ ও যন্ত্রপাতির স্তূপ নয়; এটি সামাজিক চুক্তির দৃশ্যমান আশ্রয়, যেখানে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে রাষ্ট্রের কোলে নিরাপত্তা খোঁজে। সেই অর্থে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাকেন্দ্র যদি রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তবে ভাঙে শুধু ভবনের দেয়াল নয়; নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার অদৃশ্য সেতু থেকে একটি পাথর খসে পড়ে আর নিচে খুলে যায় অবিশ্বাসের অন্ধ খাদ। হাসপাতালের ভাঙা জানালা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জানালায় প্রতীকী ফাটল তৈরি করে। জন লকের দর্শনে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে চিকিৎসাসামগ্রীর পাশাপাশি সেই শিশুসুলভ বিশ্বাসও—বিপদের মুহূর্তে রাষ্ট্র একদিন নাগরিকের পাশে এসে দাঁড়াবে।
ক্ষমতা সম্মতি, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাসের মাটির ওপর দাঁড়ায়। মিশেল ফুকোর ‘Governmentality’ ধারণা দেখায়, ক্ষমতা নিয়ম, নজরদারি ও প্রশাসনিক আচরণের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয়। সহিংসতা ভয় জাগাতে পারে, রাত দীর্ঘ করতে পারে; কিন্তু ভয়কে কখনো স্থায়ী বৈধতার সূর্যে পরিণত করা যায় না। রাজনৈতিক শক্তির মাপকাঠি যদি নৈতিক কর্তৃত্বের বদলে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি হয়, তাহলে সংগঠন বাইরে থেকে দুর্গের মতো দেখালেও ভেতরে কাঠ পচতে শুরু করে। চাঁদাবাজিকে দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার, দখলকে রাজনৈতিক প্রভাবের ফল এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতকে বাস্তববাদ হিসেবে গ্রহণ করা হলে অপরাধ মানুষের কথাবার্তা ও সামাজিক অভ্যাসে ঢুকে যায়। মানুষ অন্যায় দেখে বিস্মিত না হয়ে হিসাব করতে শেখে—আজ কার পালা, কাল কার পালা। তখন রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয় আদালতের বাইরে নয়, মানুষের বিবেকের অন্ধকার ঘরে শুরু হয়। রাজনৈতিক পদ যদি অনানুষ্ঠানিক সম্পদ আহরণের দরজায় পরিণত হয়, তাহলে দল ও রাষ্ট্রের মধ্যকার প্রাচীর ক্ষয়ে যায়। পদ আদর্শের মঞ্চ না হয়ে প্রভাব বিস্তারের জানালা হয়ে ওঠে। নাগরিক তখন বুঝতে পারে না, সে সরকারি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি কোনো ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের ফটকে। ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠান হলো নিয়ম ও প্রণোদনার কাঠামো। সেই কাঠামো অপরাধকে ব্যয়বহুল না করে লাভজনক করলে আইন যত শক্ত লেখা থাকুক, অপরাধ তার চারপাশে রাস্তা বানিয়ে নেয়। সমস্যাটি কোনো একটি দলের শরীরে আটকে থাকা রোগ নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যা। রেমন্ড উইলিয়ামসের ‘Structure of feeling’ ধারণা বোঝায়, পুনরাবৃত্ত সামাজিক অভিজ্ঞতা কীভাবে মানুষের রাজনৈতিক অনুভূতিকে গড়ে তোলে। অবিশ্বাস তখন ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি যুগের বিষণ্ণ জলবায়ু। সংবিধান, পুলিশ, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির সংস্কারকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এই দুই বাস্তবতা দেখায়, সংস্কার বক্তৃতার অলংকার নয়; রাষ্ট্রের কোথায় ফাটল, কোথায় নতুন স্তম্ভ এবং কোথায় নতুন দরজা প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্ত।
নির্বাচনি ম্যান্ডেট যদি নির্বাহী ক্ষমতাকে সীমাহীন কর্তৃত্বের অনুমতি হিসেবে পড়া হয়, তবে নির্বাচন গণতন্ত্রের দরজা খুলে দিয়েও নিয়ন্ত্রণের জানালা বন্ধ করতে পারে। ভোট একটি দরজা খুলতে পারে; গণতন্ত্র টিকে থাকে সেই দরজার ওপাশে থাকা প্রতিষ্ঠান, আদালত, গণমাধ্যম, সংসদ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন তদন্তের ওপর। শক্তিশালী সরকার বলতে শক্তিশালী ব্যক্তি নয়; এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বোঝায়, যা শক্তিশালী ব্যক্তিকেও সীমারেখার মধ্যে রাখে। ১৯৭৫, ক্রসফায়ার রাজনীতি, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দলীয়করণ এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দেখা যায় না। ইতিহাস তখন শিক্ষক থাকে না; রাতের অন্ধকারে দূর থেকে বাজতে থাকা সতর্ক ঘণ্টা হয়ে ওঠে। জাতি একই দরজায় ফিরে এসে দেখে, তালা বদলেছে, দরজা বদলায়নি। ক্ষমতাবান ব্যক্তি বদলালেও নীতির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে এবং অপরাধীর পরিচয় তার আইনি দায় নির্ধারণ করতে পারবে না। যে দল নিজের কর্মীদের অপরাধে ছাড় দেয়, সে সাময়িক আনুগত্য কিনতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে নিজের বৈধতার মুদ্রাতেই মরিচা ধরায়। নাগরিকের আস্থা শিশিরভেজা কাচের পাত্রের মতো : ভাঙতে এক মুহূর্ত, জোড়া লাগালেও দাগের রেখা আর মুছে যায় না। সংস্কারকে ক্ষমতা কমানোর কৌশল না দেখে ক্ষমতাকে বৈধ করার কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন, কার্যকর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা এবং স্বাধীন তদন্ত সরকারকে দুর্বল করে না; সিদ্ধান্তকে ব্যক্তির ইচ্ছা থেকে প্রতিষ্ঠানের নিয়মে স্থানান্তর করে।
জেমস ম্যাডিসনের ক্ষমতার বিভাজন ও Checks and Balances-এর নীতি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে ক্ষমতার ওপর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ দরকার। রাষ্ট্রের ব্রেক দুর্বলতার প্রতীক নয়; ব্রেকই প্রমাণ করে, ক্ষমতার গতি মানুষের জীবনের কাছে জবাবদিহি করে। নিরাপত্তার নামে দায়মুক্তি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার ঘরেই আগুন ধরায়, আর ধোঁয়া ঢুকে পড়ে প্রতিটি নাগরিকের শ্বাসে।
আজকের বড় প্রশ্ন কে ক্ষমতায় থাকবে তা নয়; প্রশ্ন হলো ক্ষমতা কীভাবে সীমাবদ্ধ থাকবে। একজন প্রধানমন্ত্রী দক্ষ চালক হলেও গাড়ির ব্রেক নষ্ট থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দূর হয় না। তাই রাড্ডা হাসপাতালের ঘটনায় কে দায়ী, তা তদন্ত নির্ধারণ করবে; কিন্তু পুলিশ সময়মতো প্রতিরোধ করতে পারেনি কেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দলীয় কর্মী, এমপি, কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধে জড়িত প্রমাণিত হলে আইনের সামনে পরিচয় ঢাল হতে পারে না। আদালতের দরজায় প্রবেশের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের পোশাক খুলে রাখাই আইনের শাসনের প্রথম শর্ত।
পতন সাধারণত বজ্রপাতের মতো একদিনে নামে না; তা আসে নীরব জলধারার মতো, অদৃশ্য ক্ষয়ে। প্রথমে একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়, তারপর আরেকটি; ন্যায়বোধের আলো ম্লান হয়, নাগরিক আস্থার জানালা বন্ধ হতে থাকে। বাইরে প্রাসাদ দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরের কক্ষ ফাঁকা হয়ে যায়। ঝড় সবসময় পতনের কারণ নয়; অনেক সময় সে শুধু লুকিয়ে থাকা পতনকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করায়। তাই জুলাইয়ের স্বপ্নকে কোনো সরকারের হাতে তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেটিকে প্রতিষ্ঠান, আইন, নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ অন্ধ সমর্থন বা বিরোধিতা নয়; একই মাপকাঠি সবার জন্য প্রয়োগ করা। ক্ষমতার রঙ বদলালেও অপরাধ অপরাধই থাকে।
আখেরে স্মরণে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি দেশ চেয়েছিল, যেখানে পরিবর্তন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, রাষ্ট্রের আচরণেও দৃশ্যমান হবে। তারা চেয়েছিল পুরোনো দেয়ালের ওপর শুধু নতুন রঙ নয়, নতুন জানালা; পুরোনো তালার বদলে ন্যায়বিচারের চাবি; পুরোনো ভয়ভীতির জায়গায় নাগরিক মর্যাদার উজ্জ্বল আলো। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে সরকার জনগণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না; জনগণের কাছে জবাবদিহির দৃঢ় মাটির উপর দাঁড়াবে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন আরেকটি ক্ষমতার হাতবদল নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রের ভিত পুনর্নির্মাণ। প্রয়োজন এমন বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার কবজিতেও থাকবে সংবিধানের লাগাম।
প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাজনৈতিক দল থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত উঠান হয়ে উঠবে না। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচারের কেন্দ্র হবে। প্রয়োজন এমন একটি গণতন্ত্র, যেখানে নির্বাচনের দিন জনগণ শুধু ভোট দেবে না; প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্যেও তার নাগরিক মর্যাদা ফিরে পাবে। গণতন্ত্র তখন শুধু ব্যালট বাক্সে বন্দি কাগজ নয়; তা হবে মানুষের নিরাপদ হাঁটা, নির্ভয়ে কথা বলা এবং ন্যায়ের দরজায় সমানভাবে কড়া নাড়ার অধিকার।
কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পুলিশ নয়, অস্ত্র নয়, প্রশাসন নয়, এমনকি তার ক্ষমতাবান নেতাও নন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নাগরিকের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই রাষ্ট্রের মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা শিকড়। শিকড় শুকিয়ে গেলে গাছের সবুজ পাতা কিছুদিন হয়তো আকাশে দুলবে, পতাকাও হয়তো বাতাসে উড়বে, প্রাসাদও হয়তো দূর থেকে অটুট দেখাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্র তখন তার জীবনরস হারাতে শুরু করবে। আর যে গাছ শিকড়ের ভাষা ভুলে যায়, তার পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এ কারণেই রাষ্ট্রের গাড়ির গতি নয়, তার ব্রেকই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে সে কতটা নিরাপদে পথ পাড়ি দিতে পারবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার হাতই আইনের হাতে আবদ্ধ থাকে; যেখানে শাসকের শক্তি নাগরিকের স্বাধীনতাকে গ্রাস করে না, বরং তাকে নিরাপদ রাখে। তালা বদলানো নয়, দরজার কাঠামো বদলানোই শেষ কথা। সেই পরিবর্তনের মাপকাঠি একটাই : ক্ষমতাবান হোক বা দুর্বল, পরিচিত হোক বা অচেনা—আইনের দরজায় সবার ছায়া সমান, সবাই সমান।
লেখক: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com