হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জিয়াউর রহমানকে কেন পাঠ করতে হবে

বাছির জামাল

বাছির জামাল

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬-৩০ মে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ) জন্ম কিংবা শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছরই বিএনপি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশের ব্যবস্থা করে। এমনই এক বছর শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ক্রোড়পত্রে লেখার জন্য দলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের একজন লেখককে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই অনুরোধ জানাতে গেলে লেখকের ঢাকার বাসায় নিবন্ধকারও উপস্থিত ছিলেন। অনুরোধের জবাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে লেখা সম্ভব নয় বলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

তবে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তিনি যে কটি কথা বলেছিলেন, তা মূল্যায়নের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক বলেছিলেন, পৃথিবীর বহু দেশেই সমরবিদ থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে তাদের অবদান স্থায়ী আসন পেয়েছে এবং এসব রাষ্ট্রনায়ককে বিশ্বের মানুষ সম্মানের চোখে দেখে। বাংলাদেশেও সমরনায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা জিয়াউর রহমানের অবদান ইতিহাসে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত।

আসলে আমরা যখন বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখন দেখি এমন অনেক সেনানায়ককে, যারা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও সমানভাবে সফল। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্টের (১৫ আগস্ট ১৭৬৯-৫ মে ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দ) নামই সবার আগে আসে। তিনি একাধারে ফ্রান্সের সম্রাট ও ইতালির রাজা ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বে সর্বকালের এক অনন্য সেনানায়ক হিসেবেও পরিগণিত। সেনাবাহিনীতে তার উদ্ভাবনগুলো বর্তমানে প্রায় সব সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নেপোলিয়ন কোড প্রতিষ্ঠাও তার অন্যতম সেরা কীর্তি। কিন্তু সামরিক বাহিনীর লোক হিসেবে তার রাজনৈতিক অবদানকে কেউ অস্বীকার করেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন (২২ ফেব্রুয়ারি ১৭৩২-১৪ ডিসেম্বর ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) আমেরিকায় বিপ্লবের সময়কার কনটিনেন্টাল আর্মির কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন। তিনি জাতির প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনাও করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল (৩০ নভেম্বর ১৮৭৪-২৪ জানুয়ারি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) একজন প্রথিতযশা সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশ জাতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরও (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩-২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ) সেনাপতি ছিলেন। তার অসাধারণ সমরকুশলতায় ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের পত্তন হয় ১৫২৬ সালে। একই সঙ্গে তার দক্ষ রাজ্য পরিচালনা শুধু ভারতে কেন, বিশ্ব ইতিহাসেও মোগল সময়কালকে এক অনন্য শাসনকাল হিসেবে ধরা হয়।

আরো আগে গ্রিক রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিসও (৪৯৫-৪২৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) গ্রিক ইতিহাসের আলোচিত যুদ্ধ পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধসহ নানা যুদ্ধে অ্যাথেনিয়ান বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। একই সঙ্গে তার সময়েই গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছিল। অন্য গ্রিক রাষ্ট্রনায়ক সলোনও (৬৩৮-৫৫৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) সালামাইস বদ্বীপ দখল নিয়ে যখন অ্যাথেন্স ও ম্যাগারা নগর রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন তিনি ওই যুদ্ধে অ্যাথেনিয়ান সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রও পরিচালনা করেছিলেন। ইতিহাসের এমন আরো ভূরি ভূরি সেনানায়কের উদাহরণ দেওয়া যাবে, যারা একাধারে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কোনোটাই তাদের সফলতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও ইতিহাসের এমনই এক বরপুত্র। কিন্তু সামরিক জীবনের প্রতি বাঙালি জাতির এক ধরনের উন্মাসিকতা এবং রাজনৈতিক দলাদলির কারণে তাঁর অনন্য অবদানকে এখানকার রাজনৈতিক ও সিভিল সমাজ অনেক সময় পাশ কাটিয়ে যায় কিংবা অস্বীকার করতে চায়। এ কথা সত্য যে, জিয়াউর রহমানের অবদানকে কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, কিংবা খাটো করে দেখুক বা না দেখুক—ইতিহাসে তাঁর অবদান ইতোমধ্যেই স্থান করে নিয়েছে।

সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করার পর জিয়াউর রহমানকে একীভূত পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে চট্টগ্রামে তার অধীনের আরো অনেক সেনা অফিসার ও সৈনিককে নিয়ে ‘উই রিভোল্ট’ বলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এটাই ছিল কোনো বাঙালি সেনা অফিসারের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে প্রথম বিদ্রোহ। তার এই সিদ্ধান্ত তার জীবনকেই রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিল। (গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস, পৃষ্ঠা : ৯২)

মুক্তিযুদ্ধ সফল না হলে তার ফাঁসি ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। তিনি এমন পরিণতির কথা চিন্তা করেই ইতিহাস পাল্টানোর মতো অমোঘ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। (ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা : ২০৮) তিনি বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার সৌধে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের অজান্তে এই দুটি কাজ তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান করে দেয় এবং একই সঙ্গে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আরো এক সুযোগে তাকে এই রাষ্ট্রের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের স্টিয়ারিং-চেয়ারে বসিয়ে দেয়। এটা কে না জানে যে, তার হাত ধরেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। পরিধি বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইতিহাসে জিয়াউর রহমানই জাতির মুক্তি ও জাতি গঠনের দুটি পর্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বরং বলা চলে বাংলাদেশি জাতি গঠনের কাজটি তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। ব্যারিস্টার মওদুদের ভাষায়, ‘জিয়ার শাসনামলে প্রশাসন ভালো চলেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, চোরাচালানি কমে গিয়েছিল, গুপ্ত হত্যা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হয়েছিল, বাজার লুট, ব্যাংক লুট আর হয়নি বললেই চলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কমে গিয়েছিল, মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তাবোধ ফিরে এসেছিল, এসব অস্বীকার করার উপায় নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, জিয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। একজন সামরিক অফিসার হয়ে জিয়া এ দেশের মানুষের জন্য যে রাজনৈতিক অবদান রেখে গেছেন, সেটা আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাখতে পারেননি। (ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, চলমান ইতিহাস, জীবনের কিছু সময় কিছু কথা, ১৯৮৩-৯০, পৃষ্ঠা : ১৯৬)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করেন এভাবেÑযুবক জেনারেল জিয়া (১৯৭৫ সালে তার বয়স ছিল ৪০) নিজেকে অন্তর্জ্ঞানসম্পন্ন, স্বাপ্নিক ও উদ্যমী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তিনি আরো বলেন, তিনি (জিয়া) সেনাবাহিনীর ওপর রাজনীতির প্রাধান্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আরো দেখতে পেলেন, একটি সুস্থির বেসামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা ছিল অপেশাদার, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং বিভক্ত সেনাবাহিনী। তারপর জিয়া বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে সেনাবাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল ও গর্বিত বাহিনী হিসেবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করার কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি বাংলাদেশের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে যে বিরোধ ছিল, তা মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেন। সর্বোপরি তিনি শেখ মুজিব-প্রবর্তিত ভাষাভিত্তিক-রাষ্ট্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক-রাষ্ট্রিক-ইসলাম ধর্মসম্মত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতীয় ব্রাহ্মণবাদী প্রভাবের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়াটা জরুরি। তিনি বাস্তববাদী অর্থনৈতিক কর্মসূচি যেমনÑ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ গ্রহণ করে অপর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন, অশিক্ষা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মতো তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করেন। তিনি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একই স্থানে জড়ো করার উদ্দেশ্যে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করেন। পরে এটিকেই একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করেন। এই দলের নাম বিএনপি। পরে তিনি নির্বাচনি রাজনীতি পুনরুদ্ধার করেন। (তালুকদার মনিরুজ্জামান, পলিটিকস অ্যান্ড সিকিউরিটি অব বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা : ৭৯-৮০)

লেখক: চিফ রিপোর্টার, আমার দেশ

কুমিল্লায় লংমার্চকে স্বাগত জানাতে মহাসড়কে ১১ দলের নেতাকর্মীরা

ইডেন মহিলা কলেজে কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন

লংমার্চ ঘিরে চট্টগ্রামে ১১ দলের ব্যাপক প্রস্তুতি

বুড়িমারী স্থলবন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, কমেছে রাজস্ব আয়

হুমকি পেলেই আগাম অভিযান চালাবে ইরান

জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে ছাড় দেওয়া হবে না

ট্রাম্পের নিশানায় ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইসাকের জোড়া গোলে মৌসুমের প্রথম জয় লিভারপুলের

ঐক্যবদ্ধ বিএনপিই গড়বে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

ছয় দফা দাবিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের ‘লংমার্চ’