সেই ২০১৩ সালের ঘটনা। মাদকাসক্ত তরুণী ঐশী তার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও মাকে হত্যা করে। এরপর সর্বশেষ এ বছর আগস্টে রংপুরে বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় দুই মাদকাসক্ত হত্যা করে এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে। মাঝখানে দীর্ঘ এই এক যুগেরও বেশি সময়ে কত মাদকাসক্ত ছেলে হত্যা করেছে তার মা-বাবাকে, কত মাদকাসক্ত বাবা হত্যা করেছেন তার শিশুসন্তানকে, মাদকের কারণে কত পরিবার তছনছ হয়ে গেছে, কত সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীর জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, এর হিসাব কে রাখে? শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত মাদক-সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর কয়েকটি অপরাধের খবর একত্র করা হলেও যে কেউ বিচলিত হবেন।
চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের ছুরিকাঘাতে তার মা-বাবা দুজনেই নিহত হন। একই মাসে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ঘুমন্ত বাবাকে শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে তার মাদকাসক্ত ছেলে। এর আগে মে মাসে ফেনীর দাগনভূঞার সিন্দুরপুর ইউনিয়নে মাদকাসক্ত ছেলে কুপিয়ে হত্যা করে তার মাকে। জুন মাসে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে খুন হন বৃদ্ধ বাবা। ফেব্রুয়ারি মাসে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে শেফালী বেগম (৬২) নামে এক মা খুন হন।
চলতি বছর এপ্রিলে রাজধানীর বাড্ডায় মাদকাসক্ত এক বাবা তার ৩ বছর বয়সি শিশুসন্তানকে গলা টিপে হত্যা করেন। মে মাসে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদিঘী ইউনিয়নে রায়হান আলী নামের এক মাদকাসক্ত বাবা তার ৫ মাস বয়সি শিশুসন্তান আবদুল্লাহকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মৌলভীবাজারে খোকন মিয়া নামের এক মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত বাবার হাতে খুন হয় তার ৭ বছর বয়সি ছেলে মাহিদ। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বারাই গ্রামে সুভাষ চন্দ্র মহন্ত নামের এক মাদকাসক্ত বাবা তার মাত্র ২২ দিন বয়সি সন্তানকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
২০১৮ সালে আরেক ঐশীর সন্ধান মেলে সাতক্ষীরায়। ২৪ বছর বয়সি টুম্পা নামের মাদকাসক্ত ও উচ্ছৃঙ্খল এক মেয়ে পিটিয়ে হত্যা করে তার মাকে।
মাদকাসক্তের কারণে সৃষ্ট পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে যখন এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, তখন শুধু তা অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের খবর হয়। কিন্তু পরিবারের বাবা যদি মাদকাসক্ত হন, তখন সেই পরিবারে যে দুর্বিষহ অবস্থা বিরাজ করে এবং এর ফলে তাদের শিশুসন্তানদের জীবন কীভাবে বিপন্ন হয়, তা অনেকের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তাছাড়া পরিবারের কোনো সন্তান যখন মাদকাসক্ত হয়, অপার সম্ভাবনাময় সন্তানের জীবন যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তার মা-বাবার মানসিক যন্ত্রণাসহ সেই পরিবারে কী দুরবস্থা নেমে আসে, তাও বর্ণনার অতীত। মাদকের কারণে বাংলাদেশে আজ হাজার হাজার পরিবার অশান্তির আগুনে পুড়ছে। আর এর ফলে একের পর এক ঘটছে করুণ সব ট্র্যাজেডি।
মাদকের ছোবলে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীর জীবন আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাজানো অনেক পরিবার মুহূর্তেই লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। মাদকের অর্থ জোগাতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ থেকে শুরু করে ঘটছে একের পর এক খুনের ঘটনা। মাদকের কারণে আজ প্রায় প্রতিটি পরিবার চিন্তিত তার সন্তানদের নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠীদের মাধ্যমেও মাদকাসক্ত হচ্ছে অনেকে। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আজ নিরাপদ নয় সন্তানরা। মাদক, কিশোর গ্যাং, নিরাপত্তাহীনতার কারণে শহরাঞ্চলে আজ অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের অবসর সময়ে ঘরের বাইরে পর্যন্ত বের হতে দিতে চান না। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে অনেক সন্তান ঘরের মধ্যে একপ্রকার বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। স্কুল আর বাসাÑএই তাদের শৈশব-কৈশোর জীবনের গণ্ডি।
পুলিশের অপরাধচিত্র ও সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকাসক্তির কারণে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২টি ঘটনায় দুজন করে, দুটি ঘটনায় তিনজন করে এবং তিনটি ঘটনায় চারজন করে পারিবারিক সদস্য আপনজনের হাতে প্রাণ হারিয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের ৮২ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। এদের বেশিরভাগই তরুণ। মাদকাসক্তদের প্রায় ৩৩ শতাংশই কিশোর-কিশোরী। প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের নেশাদ্রব্য। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলেও মাদকের বিস্তার এখন গভীর উদ্বেগজনক পর্যায়ে ।
বস্তি এলাকা থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত, এমনকি বিরাটসংখ্যক তরুণী ও নারী আজ মাদকের ভয়াবহ ছোবলের শিকার। মাদকের ফলে শুধু ব্যক্তিজীবন নষ্ট হচ্ছে না, ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন, ধ্বংস হচ্ছে পরিবারে শিশুদের বেড়ে ওঠার সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। মাদকের কারণে পরিবারে সৃষ্ট অশান্তির ফলে সন্তানদের গ্রাস করছে গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তা। ফলে অনেক সন্তান হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন। কোরআনে মদপানকে গুরুতর পাপ ও শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিশ্বাসীদের মদ বর্জনের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। আমাদের সরকার মুসলিম। এ রকম একটি দেশে যেভাবে মাদকের বিস্তার ঘটেছে, তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই লজ্জার ।
অনেক আগে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অনেক মদের কারখানা স্থাপন করেছে। তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করা। মিয়ানমার থেকে দীর্ঘকাল ধরে আসছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। বাংলাদেশে যত ধরনের মাদক পাওয়া যায়, এর প্রায় সবই অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করছে।
নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল মাদক নির্মূল করে যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু মাদক নির্মূলে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। বরং সমাজে যেন মাদকের উৎসব চলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছেÑসরকার দেশ থেকে পুরোপুরি মাদক নির্মূল চায় কি না এবং যদি চায়, তবে তা কীভাবে। এ প্রশ্নের সঠিক সমাধান না করে, মাদক ব্যবসা ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের না ধরে, শুধু রেলস্টেশনে আর বস্তিতে কিছু ভবঘুরে মাদকাসক্তদের পেছনে পুলিশ দৌড়িয়ে মাদক নির্মূল করা যাবে না। সরকার যদি সত্যি দেশকে মাদকমুক্ত করতে চায়, তাহলে বস্তি, রেলস্টেশন থেকে শুরু করে সমাজের উঁচুতলার বৈধ-অবৈধ সব রঙিন পানীয় সেবনের ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করতে হবে। মাদককেন্দ্রিক মাফিয়াদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সিগারেট থেকে শুরু করে সব ধরনের মাদক উৎপাদন, বিপণন, আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কঠোর আইনপ্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। সীমান্ত থেকে মাদক প্রবেশ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে যা যা করার প্রয়োজন, তা করতে হবে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিনিশিল্প প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বিভিন্ন ধরনের মদ উৎপাদন করে। সরকারের নিয়ম মেনে এসব মদ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বিক্রি করা হয়। এছাড়া বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে মদ তৈরির লাইসেন্স দেওয়া আছে অনেক আগে থেকে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন অনুমতিপ্রাপ্ত হোটেল ও বারের জন্য মদ আমদানি করতে পারে। এছাড়া কোনো কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের ক্ষেত্রেও একই অনুমতি রয়েছে। বাংলাদেশের আইনে সাধারণ মুসলিম নাগরিকের মদপান নিষিদ্ধ। এছাড়া হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন, কেনাবেচা ও বহন নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর সব নেশাদ্রব্য।
একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় কোম্পানি কর্তৃক মদ তৈরি ও বেসরকারিভাবে উৎপাদনের লাইসেন্স বাতিল করা অবশ্য কর্তব্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে কারো জন্য কোনো ধরনের মদ আমদানির অনুমতিও বন্ধ করা একইভাবে অবশ্য কর্তব্য। শুধু অমুসলিম কোনো পর্যটক বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো ফাইভ স্টার হোটেলকেও মদ রাখা ও সার্ভ করার অনুমতি দেওয়া সঠিক হতে পারে না।
রাষ্ট্র নিজে মদ উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে জড়িত থেকে এবং উপরতলার লোকদের জন্য মদপানের অনুমতি দিয়ে বস্তি এবং রেলস্টেশনের মাদকাসক্তদের শাস্তি দেওয়া স্ববিরোধী, বৈষম্য ও অনৈতিক। উপরতলার লোকদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে মদপানের ব্যবস্থা খোলা রেখে সমাজকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব নয়। তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় এবং মাদককেন্দ্রিক অপরাধ ও একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দমনে দেশ থেকে সব মাদক দূর করার কোনো বিকল্প নেই। যেভাবে মাদকের বিস্তার ঘটছে, মাদকের কারণে যেভাবে তরুণ সমাজ ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে, তাতে এখনো যদি সরকারের হুঁশ না হয়, তবে শিগগির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
সমাজকে মাদকমুক্ত করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের দায়িত্বও কম নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিসহ তাদের উচিত শহর থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের একেবারে ওয়ার্ডপর্যায় পর্যন্ত মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে এর বিরুদ্ধে গণজাগরণ তৈরি করা। তারা অন্তত তাদের সংসদীয় আসনগুলো মাদকমুক্ত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
লেখক: সহকারী সম্পাদক