গত ৩ জুলাই নেত্রকোনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অবাধে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা সরকারের একটি সময়োপযোগী ও জনস্বার্থমুখী রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জলাশয় দখলমুক্ত রাখা, প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকার। এরই মধ্যে কিছু জলাশয় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নদী, খাল, বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
মূল কথা হচ্ছে, বর্তমান জলমহালে ইজারা প্রথা মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইজারা দেওয়ার ফলে প্রভাবশালীরা হাওর, বাঁওড় বা জলাশয় দখল করে রাখে এবং সাধারণ মানুষকে জলাশয় ব্যবহারে বাধা দেয়।
সরকার আইনগতভাবে এ ধরনের সব বাধা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ ও মৎস্যজীবীরা নির্বিঘ্নে জলাশয়ে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। এই কাজটি করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই সিদ্ধান্ত বহুদিনের একটি অন্যায় বন্দোবস্ত ভাঙার সূচনা হবে।
বাংলাদেশে দু’ধরনের সরকারি জলমহাল আছে—১. প্রাকৃতিক জলমহাল, যেমন বিল, নদী ও খাল, হাওর, বাঁওড়, যার মালিকানা মূলত ভূমি মন্ত্রণালয়ের এবং যা মাঠ পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত হয়; ২. কৃত্রিম সরকারি জলমহাল, অর্থাৎ পুকুর, দিঘি, বরোপিট, খাল, হ্রদ, যার মালিকানা ভূমি, পানিসম্পদ, সড়ক ও জনপথ এবং রেল মন্ত্রণালয়ের। বলা বাহুল্য, প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে সরকারি জলমহাল। কিন্তু এই জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া হলে তা মৎস্যজীবীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, ফলে মৎস্য আহরণ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে হয় না।
বর্তমান ইজারা-ব্যবস্থার মূল সমস্যা এই ইজারা ব্যবস্থাতেই। হাওর, বাঁওড়, বিল, খাল কিংবা নদী যখন সর্বোচ্চ রাজস্বদাতার হাতে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, তখন পানি ও মাছের ওপর স্থানীয় মানুষের পুরোনো অধিকার কাগজের একটি চুক্তির নিচে চাপা পড়ে। ইজারাদার নিজে প্রকৃত মৎস্যজীবী না হয়েও জলাশয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে। জেলেকে তখন নিজের বাপ-দাদার জলায় মাছ ধরতে টাকা দিতে হয়, বাধা সহ্য করতে হয়, কখনো মারধর ও মামলা মোকাবিলা করতে হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ গোসল, গৃহস্থালির কাজ, গবাদিপশুর পানি, শাকপাতা সংগ্রহ কিংবা নৌচলাচলের অধিকারও হারায়। নারীদের হেনস্তার শিকার হতে হয়। সরকারি জলাশয় তখন জনগণের সম্পদ না থেকে ব্যক্তিগত মুনাফার এলাকায় পরিণত হয়।
ইজারা প্রদানের জন্য জলমহালগুলো আয়তনের দিক থেকে দু’ভাবে ভাগ করা হয়; ২০ একর পর্যন্ত এবং ২০ একরের ঊর্ধ্বে আয়তনবিশিষ্ট। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট সরকারি জলমহালের সংখ্যা ৩৯ হাজার ২১১টি। এর মধ্যে ২০ একর পর্যন্ত জলমহালের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৮৪১টি (৯৪ শতাংশ) এবং ২০ একরের ঊর্ধ্বে আয়তনবিশিষ্ট জলমহাল ২ হাজার ৩৭০টি (৬ শতাংশ)। ২০ একর পর্যন্ত জলমহালগুলো উপজেলা প্রশাসন এবং ২০ একরের বেশি জলমহাল জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত ইজারা দেওয়া হয়। এই সময়ে মোট ইজারাকৃত জলমহালের সংখ্যা হচ্ছে ১৫ হাজার ২৭৭টি, ২০ একর পর্যন্ত (১৩ হাজার ৬৮১টি) এবং ২০ একরের ঊর্ধ্বে ১ হাজার ৫৯৬টি। ইজারামুক্ত জলমহালের সংখ্যাও কম নয়। অনেক জলমহাল মামলাজনিত কারণে ইজারামুক্ত আছে। যদিও জলমহালের আকার, আয়তন ও সংখ্যার সঠিক তথ্য হালনাগাদ করা আছে কি না সেই বিষয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারি জলমহালের ব্যবস্থাপনা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয় এবং প্রধানত মাছচাষসহ জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারা-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করেই জলমহাল ইজারা দেয় বলে জানিয়েছে। তবে যেহেতু জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে মৎস্য কর্মকর্তার কর্মপরিধি সীমিত এবং রাজস্ব আয়ের চাহিদা প্রাধান্য পায়, তাই অনেক ক্ষেত্রেই ইজারা মৎস্যজীবীদের অনুকূলে যায় না।
প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদনের পরিবেশ রক্ষা করা এবং মৎস্যজীবীদের স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। যদিও সরকারি জলমহালগুলো মাছ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস, এই প্রাকৃতিক জলমহালের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ের, ফলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। কারণ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে মৎস্যজীবী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে কোনো দায় নেই। এই সরকারি জলমহালের মাধ্যমে দেশীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন হয়। মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ সরকারি জলমহাল থেকে আসে। কিন্তু সরকারি জলমহাল ইজারা দেওয়া হয় রাজস্বপ্রাপ্তির উৎস হিসেবে। ২০২৩-২৪ সালে ইজারা বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১৩৩ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪১ টাকা। টাকার অঙ্কে ইজারার ব্যবস্থাপনা চিন্তা করা হলে তা কখনোই মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং মৎস্যজীবী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা হবে না।
এই টাকা রাষ্ট্রের জন্য একেবারে অপ্রয়োজনীয়—এ কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই রাজস্ব অর্জনের জন্য রাষ্ট্র কত বড় সামাজিক ও প্রাকৃতিক ক্ষতি মেনে নিচ্ছে? একটি জলাশয় থেকে ইজারা বাবদ যে টাকা আসে, তার বিপরীতে মাছ, শামুক, জলজ উদ্ভিদ, পশুখাদ্য, পাখি, বন্যার পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, স্থানীয় খাদ্য, নারীদের মৎস্য সংগ্রহভিত্তিক জীবিকা এবং হাজার হাজার পরিবারের কাজের মূল্য কত? এই পূর্ণ হিসাব করা হলে পরিষ্কার হবে—সামান্য রাজস্বের জন্য আমরা বহু গুণ বড় সম্পদ নষ্ট করছি।
হাওরাঞ্চলে এই প্রশ্ন আরো গুরুতর। সিলেট বিভাগের সাত জেলায় বিস্তৃত হাওর বছরের বড় সময় পানিতে ভরা থাকে। শুকনা মৌসুমে বোরো ধান, বর্ষায় মাছ—এই দুইয়ের ওপর গোটা অঞ্চলের জীবন চলে। এখানে দেশীয় প্রজাতির মাছের অবাধ চলাচল থাকে। প্রায় ১৪৩ প্রজাতির মাছ আছে। হাওরে মাছের উৎপাদন ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৯৬ মেট্রিক টন। এসব হাওরের ওপর ৩ দশমিক ৬২ লাখ জেলের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। কাজেই হাওরে রাজস্বের জন্য ইজারা দেওয়া হলে একদিকে যেমন মৎস্যসম্পদ রক্ষা না হওয়ার আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে মৎস্যজীবী/জেলেদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তাই হাওর উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং একই সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দেশীয় মাছ রক্ষার বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। যেন প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন রক্ষা করা যায়। যখন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন যেন মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতে না যান, সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেকে মাছ ধরতে মানা করে তার পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা না করা রাষ্ট্রীয় অবিচার। এগুলো মৎস্য বিভাগের কাজ। হাওরে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভিজিএফ চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
যশোর, ঝিনাইদহ, কোটচাঁদপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাঁওড়গুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাঁওড় নদীর পুরোনো বাঁক থেকে তৈরি অশ্বখুরাকৃতির (Oxbow) স্থায়ী জলাশয়। এগুলো দেশীয় মাছ, জলজ প্রাণ এবং হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার উৎস। বাঁওড়ের মালিকানাও ভূমি মন্ত্রণালয়ের। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে দেশীয় মাছ এবং মৎস্যজীবীদের সহায়তা দেওয়ার কাজ করেছিল। কিন্তু সেই মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাঁওড় ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ২০২২ সালে। রাজস্ব আহরণের জন্য ইজারা দেওয়ার কারণে মৎস্যজীবীদের বাঁওড়ের পানি ব্যবহারেরও কোনো অধিকার থাকে না। বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলন কর্মীদের মতে, বাঁওড় ইজারা দিয়ে জেলেদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তাদের সন্তানেরা স্কুলে যেতে পারছে না। এই জেলে পরিবারগুলো বাপ-দাদার সময় থেকে এখানে আছে এবং মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। অথচ অ-মৎস্যজীবীরা বাণিজ্যিকভাবে ইজারা নেওয়ার কারণে আজ তারা তাদের পেশা থেকে উৎখাত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বাঁওড়ের মাছও শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাঁওড়ের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মৎস্যজীবী স্থায়ীভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তারা মাছ ধরা ছাড়া অন্য কাজ করতে অভ্যস্ত নন। তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এই বাঁওড়গুলো।
অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি জলমহালের জন্য নতুন আইন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষ করে ‘সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৯’ হালনাগাদ করার জন্য ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। এখন ২০২৬ সালে তৈরি সরকারি জলমহাল আইনের খসড়ায় দখল ও দূষণ ঠেকানো, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার সংরক্ষণের কথা রাখা হয়েছে। এতে মৎস্য উৎপাদন, প্রকৃত মৎস্যজীবী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। ইজারা দিতে হলে তা মৎস্যজীবীদের অনুকূলে বন্দোবস্ত প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিসহ প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। তাই মৎস্য কর্মকর্তাদের জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতেও রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
‘জাল যার, জলা তার’ কোনো বিপ্লবী স্লোগানমাত্র নয়। এটি পানির ওপর জনগণের হক, উৎপাদনের উপকরণের ওপর উৎপাদকের অধিকার এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ন্যায্য সম্পর্কের একটি নীতিগত ঘোষণা। এই নীতির মানে জলাশয় কোনো ইজারাদারের জমিদারি নয়; জলাশয় জনগণের জীবন ও দেশের প্রাণসম্পদের অংশ।
সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলেছে। এই দরজা দিয়ে সামনে যেতে হলে রাজস্বনির্ভর পুরোনো চিন্তা ছাড়তে হবে। ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের জন্য যদি কয়েকশ কোটি টাকার মাছ, প্রাণবৈচিত্র্য, খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবন ধ্বংস হয়, তাহলে সেটি আয় নয়—রাষ্ট্রের লোকসান। এতে সরকারের ভাবমূর্তিও সংকটে পড়তে বাধ্য। বর্তমান সরকার সেটা বুঝতে পারছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। তাহলে সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং তার বাস্তবায়ন জনগণের মনে অনেক আশার সঞ্চার করবে বলে বিশ্বাস করি।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা