হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর বয়ান এবং রাজনৈতিক সমঝোতা

ড. ইউসুফ জারিফ

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজ কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া দুটি রাজনৈতিক প্রত্যয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করে থাকে। এ প্রত্যয় দুটি হচ্ছে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’। ইসলামবিদ্বেষই যেন প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতার নির্ণায়ক। এ সরলীকরণ সমাজে শুধু ঘৃণার চাষকে উৎসাহিত করেনি, বরং সমাজ থেকে যুক্তিকে বিদূরিত করেছে। শিক্ষিত, মার্জিত, সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ হলেও কেন কোনো মুসলমান প্রগতিশীল হতে পারবে না, তার কোনো ব্যাখ্যা সেক্যুলার-মিলিট্যান্ট বুদ্ধিজীবীরা দিতে নারাজ। সমাজের সব প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্বের কারণে তাদের কেউ জবাবদিহিতার আওতায়ও আনতে পারছে না। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি একপক্ষীয় ও অসংগত আচরণ করলেও তারা প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক। এ শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের এমন মানসিকতার কারণে মুসলমানবিদ্বেষকে তারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, ইউরোপে তো বটে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইসলামের ওপর সভা-সেমিনার করা গেলেও মুসলমানদের রক্ত, অর্থ, ত্যাগ ও সম্পত্তির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলাম নিয়ে সভা-সেমিনার করা প্রায় অসম্ভব। যদিও ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে পরিস্থিতির কিছুটা বদল হয়েছে, তারপরও কাঠামোগত বিদ্বেষ ও বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। মুসলমানদের এ অধিকারহীনতার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজ দিতে রাজি নয়। তারা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বয়ান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সব প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বৈষম্যের ন্যায্যতা হাজির করতে চান। ১৯৭১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও তারা এ বিষয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে কোনো বিচার বা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে নারাজ। এটিকে তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চান। ইসলামবিদ্বেষী বৈশ্বিক নলেজ-ইকোসিস্টেম এ-দেশীয় সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের শঠ, স্বার্থবাদী ও মানবতাহীন কৌশল ও কর্মকে নির্লজ্জভাবে সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি সমাজের অন্য পেশার ইসলামবিদ্বেষী এলিটদের সঙ্গে একটি কোয়ালিশন প্রতিষ্ঠা করে সমাজে ইসলামবিদ্বেষের বৃহত্তর একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইসলামবিদ্বেষী অনুল্লেখযোগ্য ব্যক্তিকে নানা উপায়ে সমাজের প্রধান বুদ্ধিজীবী হিসেবে উপস্থাপন করতে ইসলামবিদ্বেষী গণমাধ্যম নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এসব গণমাধ্যম রাজনৈতিক প্রকল্প হলেও তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আড়ালে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানোকে প্রধান এজেন্ডা বানিয়েছে। পাশ্চাত্য আর্থিক সহায়তাপুষ্ট সিভিল সোসাইটি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর মালিকানা এবং পৃষ্ঠাপোষকদের শ্রেণি ও আদর্শিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এ কোয়ালিশন সম্পর্কে মোটাদাগে কিছু ধারণা পাওয়া যায়।

২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশ যখন নতুন করে সুশাসন ও ইনসাফের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন এ এলিট কোয়ালিশন সব সংস্কার প্রচেষ্টাকে রাজনৈতিকভাবে অবনমনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং প্রথাগত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যেখানে ব্যক্তিপূজাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়, এমন মডেলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে বিনাশ করতে চাচ্ছে। অথচ আমাদের মতো দুর্বৃত্তবান্ধব রাজনৈতিক বন্দোবস্তে মূল্যবোধভিত্তিক এবং ইনসাফের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা ও প্রভাব সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা রাজনীতিতে পরিশীলতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে অন্যতম প্রধান শর্ত।

মুসলিম সমাজ ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামি রাজনৈতিক নেতারা হীনম্মন্যভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এর প্রভার সমাজমানস গঠন ও রাজনৈতিক উন্নয়নেও পড়ে। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিকাশ একটি অরগানিক পদ্ধতিতে হয়েছে বলে ইসলাম এখানে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। ইসলাম ধর্মীয় বিধিবিধানের চর্চা বেশি না থাকলেও বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হিসেবে ইসলামের প্রভাব অনেক গভীরে। কিন্তু সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের কারণে সৃষ্ট ইসলামবিদ্বেষ সমাজে হিংসা এবং অপরায়ণের রাজনীতিকে দৃঢ় করেছে। শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রের বল প্রয়োগকারী শক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

ইসলাম সব মুসলিমপ্রধান দেশে মূল্যবোধের মূল সূত্র এবং নীতি-নৈতিকতার প্রধান উৎস। ইসলামে উম্মাহ ধারণা একটি রাজনৈতিক প্রত্যয়, যা মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরতে উৎসাহিত করে। অপরদিকে হারাম-হালালের বিধান সব মুসলমানকে জীবনযাপনে এবং মূল্যবোধ নির্ধারণে সবসময় সতর্ক ও জাগ্রত রাখে। ইসলামি শরিয়াহ মুসলমানদের জন্য একটি নৈতিক পাটাতন, যার ওপর দাঁড়িয়ে মুসলমানরা নিজস্ব স্বপ্ন ও রাজনৈতিক প্রকল্প বিনির্মাণ করে। ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক লক্ষ্য হচ্ছে তৌহিদ প্রতিষ্ঠা; পাশাপাশি ইনসাফ ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিছু ভয়ংকর ফৌজদারি অপরাধের শাস্তিকে সামনে এনে শরিয়াহকে অবমূল্যায়ন করার সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লাহ সব ন্যায্যতার প্রধান শক্তি। তাই তিনি ভয়ংকর ফৌজদারি অপরাধগুলোর শাস্তি মানুষের কল্যাণে দিয়েছেন। ইসলামের আরেকটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর কর্তৃত্ব পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া। অর্ধেক মানা আর অর্ধেক না মানাকে ইসলাম সমর্থন করে না।

তাই ইসলামি সমাজে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ইসলামবিষয়ক ডিসকোর্সকে মেনে নিতে হবে। কিছু কৌশলগত পার্থক্য সত্ত্বেও সব ইসলামপন্থি দল ও ব্যক্তি আল্লাহর কর্তৃত্ব মেনে তাদের রাজনৈতিক পথনকশা তৈরি করে। ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে সেক্যুলার চিন্তাতত্ত্ব গ্রহণের সুযোগ নেই। ইসলাম অন্যের মত ও পথকে সম্মান করে, তবে আল্লাহর কর্তৃত্বের বিষয়ে কোনো সমঝোতা করে না। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা যদি তাদের ব্যাখ্যার আলোকে ইসলামকে সমাজে উপস্থাপন করতে চান, তাহলে সমঝোতার সুযোগ কম।

অপরদিকে ইসলামের একটি বৈশ্বিক রূপ ও অবস্থান আছে। সব দেশের ইসলামি আন্দোলন বা দলগুলো চেতনাগতভাবে একে অপরের সঙ্গে অরগানিক্যালি সংশ্লিষ্ট। প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও এটি হতে পারে। গাজার গণহত্যা এ সংযোগকে আরো নিকটবর্তী করেছে। বিভিন্ন দেশের জনগণ বৈশ্বিক ইসলামিক স্কলারদের কাছ থেকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জ্ঞান নিচ্ছেন। এ পরিবর্তন মুসলিম দেশগুলোয় ইসলামের রাজনৈতিক প্রকাশকে আরো উৎসাহিত করেছে। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা ১৯৭১ সালের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সামনে এনে ইসলামের রাজনৈতিক ভূমিকাকে নিষ্ক্রিয়, গৌণ বা বিরোধিতা করার চেষ্টা করলে রাজনৈতিক সংঘাত অনিবার্য হবে। ১৯৭১ সালের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কিন্তু একে ওসিলা করে রাজনৈতিক অধিকারকে খারিজ করা যাবে না।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা নাগরিক পরিচয়ের একটি উপাদান হতে পারে, কিন্তু পূর্ণ পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। পূর্ণ পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে নৈতিকতা ও আদর্শের সূত্র থাকতে হবে। ইসলাম মুসলমানদের জন্য নৈতিকতা ও আদর্শের সূত্র নির্মাণের প্রধান উৎস। তাই নাগরিক পরিচয় নির্ধারণে ইসলামের প্রভাব ও অবস্থান শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং মৌলিক উপাদান, যা নন-নেগোশিয়েবল। ইসলামের বৈশিষ্ট্য ও উপাদান উপেক্ষা করে কোনো মুসলমান তার নাগরিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। জাতীয় রাজনৈতিক ডিসকোর্স নির্মাণে ইসলামের এ অবস্থা বিবেচনা না করলে সমাজে স্থিতিশীলতা আশা করা কঠিন।

শহীদ ওসমান হাদির শাহাদাত ও ইতিহাসের ডিফাইনিং মোমেন্ট

ওসমান হাদি ২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের পরে একটি প্রপঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি একটি মুসলিমপ্রধান দেশের রাজনীতির যথার্থ বয়ান নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি সমাজবাস্তবতা ও মানসকে বুঝতে পেরে ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে ইনসাফভিত্তিক রাজনৈতিক ট্রেজেক্টরি তৈরির জন্য কাজ করছিলেন। এ ট্রেজেক্টরির নৈতিক পাটাতন ইসলাম হলেও সমাজের অন্যান্য উপাদান, যেমন ভাষা, স্থানিক সংস্কৃতি প্রভৃতির সংমিশ্রণ ছিল, যার কারণে খুব অল্প সময়ে তিনি জনগণের ভাষা ও আশা হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের জনগণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান তার মধ্যে নিজেদের আজাদি তালাশ করছিলেন।

ওসমান হাদির শাহাদাতের পর জানাজায় লাখ লাখ জনতার অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক বয়ান ও পদ্ধতির পক্ষে বৈধতা দান করে। ওসমান হাদির মাধ্যমে জনগণ স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো নন-অ্যাপোলেজিকভাবে নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রকাশ হতে দেখে। সেক্যুলার মিলিট্যান্ট বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ওসমান হাদির আত্মবিশ্বাস ও বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস ও হিম্মত না পেলেও পছন্দ করতে পারেনি। এর প্রমাণ হলো লাখ লাখ জনতা জানাজায় অংশ নিলেও এ শ্রেণির লোকজনকে জানাজায় তেমন দেখা যায়নি।

ওসমান হাদির রাজনৈতিক বিকাশ, বয়ান, শাহাদাত ও জানাজা—সবকিছুই এখন বাংলাদেশের জন্য একটি ডিফাইনিং মোমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বছরের পর বছর বাংলাদেশকে করদ রাজ্যে পরিণত করা এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও চেতনাকে নাশ করার চেষ্টা করেছে, ১৯৭১ সালের চেতনাকে অবলম্বন করে এ সর্বনাশা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু অকুতোভয় ওসমান হাদি দেখিয়েছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসস্থল হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলন, ব্রিটিশ ভারতে এলিট শ্রেণির মুসলিমবিরোধী নীতি প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা না করে ১৯৭১ এবং বাংলাদেশের আজাদির প্রেক্ষাপট ও আজাদির সুরক্ষা বোঝা সম্ভব নয়। ১৯৭১-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-কৌশলগত বাস্তবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল রাজনীতির আলোকে বাংলাদেশের আজাদির সুরক্ষা কৌশল নিতে হবে। এ কৌশলের প্রধান নৈতিক অবস্থান হবে ইসলামি মূল্যবোধ ও পরিচয়ের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করা। ইসলাম বাদ দিয়ে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল নির্ণয় করা সম্ভব নয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কৌশলের সীমাবদ্ধতা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তাই একই ভুলের পুনরাবৃত্তির দায় বহন করা জাতির পক্ষে সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক সমঝোতা আদৌ কি সম্ভব

আগের আলোচনায় এটি স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গোড়ায় আছে আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশের জনগণের মুসলিম পরিচয়কে লঘু করতে চায়। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হলে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। মুসলিম পরিচয়কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জাতীয়তার প্রধান উপাদান করতে হবে; রাজনৈতিক এজেন্সির মৌলিক সূত্রে রূপান্তর করতে হবে। সাংস্কৃতিক সংকটকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়। বিগত সরকার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং দেশকে করদ রাজ্যে পরিণত করে।

সাংস্কৃতিক সমঝোতার পর ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য কিছু মৌলিক অঙ্গীকার প্রয়োজন হবে এবং এসব অঙ্গীকারের আলোকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে হবে। সুশাসন, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা, ব্যক্তিপূজার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বৃহত্তর জনগণের স্বার্থের আলোকে জননীতি ও উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ এবং স্বাধীন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মৌলিক অঙ্গীকার নির্ধারণ করতে হবে। যেসব দল বা ব্যক্তি এসব মূল্যবোধ ও অঙ্গীকারের সঙ্গে একাত্মবোধ করবে, তাদের নিয়ে বৃহত্তর অ্যালায়েন্স করতে হবে এবং এ অ্যালায়েন্সের মধ্য দিয়ে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরির সামাজিক চুক্তি তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক স্লোগানগুলো, যেমন ‘আজাদি না গোলামি’ অথবা ‘ক্ষমতা না জনতা’—এগুলোর রাজনৈতিক মর্মার্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হতে হবে। এসব স্লোগানে জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। এর মৌলিক অর্থ হলো বাংলাদেশকে কোনো আঞ্চলিক কলোনি নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত করতে হবে। এসব অঙ্গীকার ও আদর্শ রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির প্রধান শর্ত হবে। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ে কতটুকু এগিয়ে আসে।

লেখক : পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ ও ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড গবেষক

গণভোটে ‘না’ ভোটের ব্যবচ্ছেদ

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের শক্তি ও প্রভাব কি কমছে

বিএনপির ভূমিধস বিজয় ও ‘হলুদ সিগন্যাল’

জিয়াউর রহমানের আদলে ক্যাবিনেট গঠন করবেন তারেক রহমান

‘ভালোবাসা’ দিবস

স্বাধীন রাষ্ট্রে মানসিক পরাধীনতা

ডিজিটাল ডেটা নিয়ে নীতিমালা প্রয়োজন

বিবর্তিত বিশ্বাসঘাতকতা

ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসের বৈশ্বিক প্রভাব

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা