সাদা পাল তুলে উদাসী মাঝি গান ধরে—‘নদীর পানি শুনছি নাকি সায়র পানে ধায়/... সেই অজানা পাড়ের লাইগা রে/ আমার কান্দে ভাটির সুর/ উজান গাঙের নাইয়া!’ মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীমের গাওয়া লোকসংগীতে সুরের রেখায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের এক ছবি মানুষের মনে এঁকে দিয়েছিলেন পল্লিকবি জসীমউদ্দীন।
কিন্তু অনেক প্রজন্মের দেখা প্রকৃতির সেই চিত্র এখন অতীত। বাংলাদেশের প্রায় ৭০০ নদ-নদী, শাখা ও উপনদীর অধিকাংশই মৃতপ্রায়; শুকনো মৌসুমে অনেকটাই পানিশূন্য আর সহসা বন্যা হলে পানি ধারণে অক্ষম।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষাকালে প্লাবনভূমির জলমগ্নতা নিরূপণ করেছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি—সাম্প্রতিক দু’দশকে প্রায় শূন্য বা বিরল হয়ে পড়েছে সেই অতি স্বাভাবিক জলমগ্নতা।
অথচ উজান দেশের ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার কণ্ঠে কী বেসুরো কথা! অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশকে দেওয়ায় ভারতের কৃষকরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) লোকসভা সদস্য নিশিকান্ত দুবে।
হতে পারে এটা কথার চাল, হতেও পারে এটাই নয়াদিল্লির নীরব অবস্থানের প্রতিফলন। বিষয়টি ভালো করে বুঝতে পারবেন বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা, বিশেষ করে যখন ভারতীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ হবে।
তবে দুবের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতি ভারতের পুরোনো মানসিকতা প্রকাশ্য আধিপত্যবাদী মনোভাবের ইঙ্গিতবহ। সেই মানসিকতায় স্বীকার করা হয় না, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ অনুযায়ী পানি বা জল পাওয়া নিম্ন অববাহিকার দেশটির ন্যায্য অধিকার।
সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) তার একাধিকবার লেখা প্রশ্নবোধক চিহ্নে বিবৃতিমূলক বাক্য—‘পানি বাংলাদেশে চলে যায়?’—এমন ধারণা দেয় যেন আন্তঃসীমান্ত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অন্যায্য বা অস্বাভাবিক।
নিজ দেশেরও কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রধানত দুটি নদীর পানিবণ্টন-সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন এই আইনপ্রণেতা। তার দাবি, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে নদীর পানি ভাগাভাগি করা হয়েছে ভারতের নিজস্ব প্রয়োজন না মিটিয়েই।’
সবাই জানে, এই ভারতীয় ভদ্রলোকের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—কয়েক দশক ধরে গঙ্গা ছাড়া সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি একতরফাভাবেই প্রত্যাহার করে এসেছে ভারত।
গঙ্গা বা পদ্মা নদীর পানিবণ্টনে দুদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আর আরেকটি প্রধান নদী তিস্তার পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার মেয়াদ ১৯৮৭ সালে শেষ হওয়ার পর আর কোনো চুক্তিই হয়নি। এর বাইরে ফেনী নদী নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে শেখ হাসিনা সরকার ভারতকে পানি প্রত্যাহারের অধিকার দেয় ২০১৯ সালে, যখন এ বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখার ‘দায়ে’ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যা করে তার দলীয় ক্যাডাররা।
ভারত থেকে বা ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে আসা নদ-নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদীর পানিবণ্টন ও পানি-সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা সমাধানে ১৯৭২ সালে গঠন করা হয় দ্বিপক্ষীয় কর্মদল যৌথ নদী কমিশন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে ভারত ৩০টিরও বেশি বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করেছে, যে অবকাঠামো বাধা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশমুখী পানিপ্রবাহে। এভাবে জোরপূর্বক নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন আন্তর্জাতিক নদী আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
যৌথ নদীতীরবর্তী আরেক দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে উজানে নদীপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি ব্যাপক ক্ষতি করেছে বাংলাদেশ বদ্বীপের পরিবেশ ও কৃষি প্রতিবেশের।
বর্ষাকালে যখনই পাহাড়ি ঢল নেমে আসে কিংবা ভারত বন্যা এড়াতে বাঁধ ও ব্যারাজের গেট খুলে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়, তখনই বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়, ফলে ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়। ২০২৪ সালে বিলম্বিত বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসল নষ্ট হয়। চলতি বছরের মে মাসে ধান কাটার কয়েক দিন আগে আগাম বন্যায় বোরো ফসল হারায় হাওর অঞ্চলের কৃষকেরা।
দেশের নৌ-চলাচলযোগ্য অভ্যন্তরীণ জলপথ গত শতকের সত্তরের দশক থেকে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে কমে চার হাজার কিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে। নদীর স্রোত কমে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বেড়েছে এবং তা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুল আলোচিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আগেই। এই লবণাক্ততা কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মতো জাতীয় সাফল্যকেও যেন পুরোপুরি সাফল্য বলা যাচ্ছে না, কারণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলননির্ভর সেচ পরিবেশের ক্ষতি করছে। প্লাবনভূমিতে উৎপাদিত আমন ধানের মৌসুম একসময় ছিল প্রধান শস্য মৌসুম। এখন তার জায়গা নিয়েছে শুষ্ক মৌসুমে কৃত্রিম সেচ ব্যবহার করে উৎপাদিত বোরো ধান। এই পরিবর্তিত ধানি জমিতেই আগে উৎপন্ন হতো বৈচিত্র্যময় রবিশস্য।
বোরো চাষের বিস্তার এবং অন্যান্য ফসলের জায়গা দখলের সঙ্গে সঙ্গে ঘটেছে আরেক অবনমন। তেলবীজ ও ডাল আমদানির ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশ। যদিও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা উৎকৃষ্ট মানের সরষে ও সুস্বাদু ডাল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশ ছিল উন্মুক্ত মিঠাপানির নানা প্রজাতির মাছের আশীর্বাদপুষ্ট; এখন প্রায় ৫০ লাখ টন মাছের তিন-চতুর্থাংশ উৎপাদন করতে হয় কৃত্রিম জলাশয়ে।
অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং পর্যাপ্ত প্লাবন না হওয়ায় কমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বছরে এক থেকে তিন মিটার হারে নিচে নেমে যাচ্ছে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে।
তাহলে সীমান্তের ওপারে উজানে নদীর পানি প্রত্যাহার না করা হলে বাংলাদেশ কি এসব বিপত্তি এবং পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে অনেকাংশে রক্ষা পেত না?
নির্জলা সত্য হলো, আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ হ্রাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই নয়াদিল্লির। ভারতীয় নেতাদেরও না জানার কথা নয়, উজানে পানি সরিয়ে নিতে কী করা হয়েছে।
১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশনের ‘ক্ষতি না করার নীতি’ অনুযায়ী, নিম্ন অববাহিকার রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় এমন বাঁধ বা পানি-বিভাজন প্রকল্প নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে। কনভেনশনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, ‘কোনো আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ নিজেদের ভূখণ্ডে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহভুক্ত রাষ্ট্রগুলো অন্য পানিপ্রবাহভুক্ত রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
কেউ বলতেই পারেন, ভারত তো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় পদ্ধতিই পছন্দ করে। তাহলে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিরোধ নিষ্পত্তিতে, বিশেষ করে একটি ‘ক্ষুদ্র’ রাষ্ট্রের সঙ্গে কেনইবা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে?
এর জবাব হচ্ছে, বহুপক্ষীয়তা এড়িয়ে চলাকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার হিসেবে দেখানো ব্যাপারটি স্ববিরোধী; কারণ ভারত নিজেই শতাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা, চুক্তি ও বহুপক্ষীয় জোটের সদস্য। অন্যদিকে এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সভ্য বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশ, ইসরাইলের মতো দুর্বৃত্ত (রগ) রাষ্ট্র নয়। তাই পানির মতো ‘মানবজাতির সাধারণ সম্পদের’ সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করে ভারত বাংলাদেশের সৎ প্রতিবেশী বলে প্রমাণ করতে পারে।
তবে একজন পানি বিশেষজ্ঞ এই লেখককে বলেছেন, বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং কূটনীতিক ও রাজনীতিকদের একটি অংশ বরাবরই ন্যায্য পানির হিস্যা দাবি করার আগেই ‘কী রকম একটা ঢাক ঢাক গুড় গুড়’ নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। তারা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্যাপক দরকষাকষি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপনে অনীহা দেখিয়ে থাকেন।
দ্বিপক্ষীয়তা ও অভ্যন্তরীণ অংশীজনের বিরোধিতার অজুহাত দেখিয়ে আর নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে ভারত একটি ছাড়া অন্যসব প্রধান নদীর পানিবণ্টনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদও চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে নদীর পানি ভাগাভাগির বিরোধিতা করে বিজেপি এমপির প্রকাশ্য অবস্থান ভবিষ্যৎ পানিবণ্টন আলোচনাকে মূল্যহীন করার উদ্দেশ্য কি না কে জানে! এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নতুন সরকারের দায়িত্ব হলো সর্বজনীন নীতি অনুসরণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে ভারতের সঙ্গে এক বা একাধিক পানিবণ্টন চুক্তি সই করা।
লেখক : সাংবাদিক
khawaza@gmail