হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আলোর সুইচ, ভূতুড়ে কণা ও অণুর আয়না

সৈয়দ আবদাল আহমদ

প্রতি বছর অক্টোবরের এই সময়টিতে সারা পৃথিবীর চোখ থাকে সুইডেনের স্টকহোমে। কারণ সেখানে ঘোষণা করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার। ২০২৬ সালের চিকিৎসা, পদার্থ ও রসায়ন—অর্থাৎ বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও। বিজ্ঞানের এ বছরের আবিষ্কারগুলো পৃথিবীকে এক নতুন চোখ দিয়ে দেখতে শিখিয়েছে। আবিষ্কারগুলো যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির একেবারে বাস্তব রূপ।

মানুষের মস্তিষ্কের কোষ বা নিউরনকে কি একটি আলোর সুইচ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবারের নোবেল পুরস্কার ঠিক এই অবিশ্বাস্য জাদুকরী প্রযুক্তিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে, যা আবিষ্কার করেছেন তিন বিজ্ঞানী—যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসরথ এবং জার্মানির পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। এই জাদুকরী আবিষ্কারের নাম ‘অপটোজেনেটিকস’। এটা আমাদের মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।

আমাদের রাগ, ভয়, বিষণ্ণতা ঠিক কোন গলিপথে তৈরি হচ্ছে, তা এবার সরাসরি আলো ফেলে ম্যাপ করা সম্ভব। এই আবিষ্কার মানুষের জটিল মস্তিষ্ককে ডিকোড (বুঝতে পারা) করার এক অনন্য চাবিকাঠি।

পদার্থবিজ্ঞানে এবার নোবেল জিতে নিয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। তিনি মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় কণা ‘নিউট্রিনো’ আবিষ্কার ও গবেষণার জন্য এ পুরস্কার পান। নোবেলবিজয়ী এই ‘নিউট্রিনো’ কণা জ্যোতির্বিদ্যার যুগান্তকারী সূচনা—মহাবিশ্বকে দেখার এক নতুন চোখ। বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনোকে বলছেন ‘ভূতুড়ে কণা’। ভূতেরা যেমন দেয়াল বা যেকোনো কঠিন বস্তু ভেদ করে অনায়াসে চলে যেতে পারে বলে গল্পে শোনা যায়, নিউট্রিনো ঠিক তেমনি বাস্তব জগতেই অবলীলায় যেকোনো বাধা পার হয়ে যায়। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য ও মহাবিশ্ব থেকে আসা প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের শরীর এবং পুরো পৃথিবী ভেদ করে এপার-ওপার চলে যাচ্ছে, অথচ আমরা টেরও পাচ্ছি না।

অ্যান্টার্কটিকার মাইলের পর মাইল গভীর আদিম বরফের নিচে এক অদ্ভুত ফাঁদ পেতে বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে অধরা নিউট্রিনো বা ‘ভূতুড়ে কণা’গুলো শিকার করেছেন, যা তাকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছে।

রসায়নের দুনিয়ায় হুবহু আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখার মতো দুটি অণুর একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, আর অন্যটি হয়ে উঠতে পারে মারাত্মক বিষ। অণুর এই রহস্যময় ‘ডান-বাম’ বা দর্পণ খেলার জট খুলে দিয়ে ফ্রান্সের হেনরি বি কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ তৈরিতে অভাবনীয় বিপ্লব এনে দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

মস্তিষ্কের কোষে আলোর সুইচ : স্নায়বিক রোগ চিকিৎসায় আশার আলো

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবার যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও বায়োইঞ্জিনিয়ার কার্ল ডেইসারোথ এবং দুই জার্মান বায়োফিজিসিস্ট পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। তাদের জাদুকরী আবিষ্কারটি হলো ‘অপটোজেনেটিকস’। সহজ কথায়, তারা এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, যার মাধ্যমে আলো দিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের একক স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে অন (চালু) কিংবা অফ (বন্ধ) করা যায়।

বিজ্ঞানীরা প্রথমে পুকুরের এক ধরনের এককোষী শ্যাওলার মধ্যে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন খুঁজে পান। সেই প্রোটিনকে কাজে লাগিয়ে তারা মস্তিষ্কের কোষে এক ধরনের ‘আলোর সুইচ’ বসাতে সফল হন।

মানুষের মস্তিষ্ক এক মস্ত বড় রহস্যের খনি। এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা এখন লাইট জ্বালিয়ে বা নিভিয়ে দেখতে পারেন—মস্তিষ্কের কোন অংশ কীভাবে কাজ করে।

আলঝেইমার্স (স্মৃতিভ্রম), পারকিনসন্স, অন্ধত্ব, এপিলেপসি (মৃগী রোগ) কিংবা তীব্র বিষণ্ণতার (ডিপ্রেশন) মতো জটিল মানসিক ও স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় এই আবিষ্কার এক নতুন আশার আলো।

আমাদের মস্তিষ্ক জটিল ইলেকট্রনিক সার্কিটের মতো। যখন আমরা রাগ করি, কোনো কিছু মনে করি বা হাত-পা নাড়াই, তখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষ বা নিউরন একে অপরের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে।

আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন, মস্তিষ্কের কোনো একটি অংশ এই কাজগুলো করছে, কিন্তু ঠিক কোন ধরনের কোষ বা কোন গলিপথটি এর জন্য দায়ী, তা সুনির্দিষ্টভাবে তাদের জানা ছিল না। অর্থাৎ দূর থেকে একটি শহরে আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কোন বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে আর কোন বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, তা বোঝা যাচ্ছে না। এই আবিষ্কারের ফলে সেটি এখন জানা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এখন মস্তিষ্কের একদম নির্দিষ্ট কোনো নিউরন সার্কিটকে আলোর সুইচের মতো অন বা অফ করে বুঝতে পারছেন—কোন সংকেতটির অর্থ ‘ভয় পাওয়া’ আর কোনটির অর্থ ‘স্মৃতি মনে করা’ বা ‘ভুলে যাওয়া’; মস্তিষ্কের কোন অংশে ত্রুটি হলে পারকিনসন্স, বিষণ্ণতা, মৃগীরোগ বা অন্ধত্বের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ নতুন এই আবিষ্কারকে স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সের জন্য যুগান্তকারী বিপ্লব বলে উল্লেখ করেছে। বিবিসি বলেছে, এটা মস্তিষ্কের ভেতরের গোপন কর্মপদ্ধতি উন্মোচনের চাবিকাঠি। সিএনএন বলেছে, তিন বিজ্ঞানীর এই যৌথ আবিষ্কার মস্তিষ্কের জটিল সংকেত ডিকোড করার এক জাদুকরী কৌশল। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের ভাষায়, মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি এবং আচরণগত ব্যাধিগুলোর নিউরাল সার্কিট সরাসরি শনাক্ত করতে এ আবিষ্কার সাহায্য করেছে। এছাড়া ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে দৃষ্টিহীন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার এই গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে।

এককথায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেওয়া এবারের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আবিষ্কারটি পারকিনসন্স, বিষণ্ণতা, অন্ধত্ব এবং অন্যান্য জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা করেছে।

চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কারের খবর পাওয়ার পর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসারোথ তার ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়ি থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিকিৎসাক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কারের বৈপ্লবিক প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সহজ ভাষায়, অপটোজেনেটিকস হলো আলোর সাহায্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষগুলোকে ইচ্ছামতো সক্রিয় (অন) বা নিষ্ক্রিয় (অফ) করার একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে আমরা ল্যাবে দেখতে পাই, কীভাবে মস্তিষ্কের ভেতরের নির্দিষ্ট কোষগুলো মানুষের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আগ্রাসন, অন্ধত্ব বা স্মৃতির মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের ঠিক কোন কোষগুলো এসব আচরণের জন্য দায়ী, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানার ফলে এখন নির্ভুলভাবে নতুন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল রোগের ওষুধ তৈরির জন্য এই প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগম্যান বলেন, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি যখন একটিমাত্র কোষের অতি ক্ষুদ্র শৈবাল নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন তার লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির এক অদ্ভুত আচরণ বোঝা—‘আলো পড়লে এই শৈবাল কীভাবে সাড়া দেয়?’ বিজ্ঞানের মৌলিক কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া একটি গবেষণা যে কয়েক দশক পরে মানুষের জটিলতম অঙ্গ মস্তিষ্ককে বোঝার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে রূপ নেবে, তা ছিল অভাবনীয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম উপাদানের ভেতরের রহস্যও কত বড় পরিবর্তনের জন্ম দিতে পারে।

জার্মানির ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জর্জ নাগেল বলেন, এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসাধারণ মেলবন্ধন। তারা যখন ক্লোন করা জিন থেকে তৈরি প্রোটিনকে অন্য কোষে প্রবেশ করিয়ে সেটিকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করতে পেরেছিলেন, তখনই নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন যুগের সূচনা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া এই তিন বিজ্ঞানী তাদের আবিষ্কার সম্পর্কে যৌথভাবে বলেন, এই পুরস্কার কেবল সফল একটি প্রযুক্তির স্বীকৃতি নয়, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের গভীরতম রহস্য—যেমন আমরা কীভাবে ভাবি, আমাদের অনুভূতি কীভাবে তৈরি হয়, তা উন্মোচনের এক অনন্য চাবিকাঠি।

অ্যান্টার্কটিকার বরফে মহাজাগতিক ভূতুড়ে কণা

পদার্থবিজ্ঞানে এবার নোবেল জিতে নিয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। তিনি মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় কণা ‘নিউট্রিনো’ আবিষ্কার ও গবেষণার জন্য একটি বিশালাকার টেলিস্কোপ তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। এই নিউট্রিনোগুলোকে বলা হয় ‘ঘোস্ট পার্টিকেল’ বা ‘ভূতুড়ে কণা’! কারণ এরা এতটাই হালকা আর ছায়াময় যে কোটি কোটি নিউট্রিনো প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীর ও আস্ত পৃথিবী ভেদ করে চলে যাচ্ছে, অথচ আমরা টেরই পাচ্ছি না। বিজ্ঞানী হালজেন অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে এক ঘন কিলোমিটারজুড়ে তৈরি করেন ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’। এই বিশাল বরফের ফাঁদেই ধরা পড়ে মহাশূন্যের গভীর থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো। এগুলোকে ভালোভাবে বুঝতে পারলে আমরা জানতে পারব—কীভাবে গ্যালাক্সিগুলো তৈরি হয়েছে, ‘ব্ল্যাকহোল’ কীভাবে কাজ করে, কিংবা ‘বিগ ব্যাং’-এর পর মহাবিশ্ব কীভাবে আজকের রূপ নিল। এই আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানের দুনিয়ায় নতুন চোখ খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানী হালজেনের ভাষায়, নিউট্রিনো এমন এক কণা, যা কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই পৃথিবী বা যেকোনো পদার্থের ভেতর দিয়ে কোটি কোটি কিলোমিটার পার হয়ে যেতে পারে। এদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

তাই আমরা বুঝতে পারি, অ্যান্টার্কটিকার সাউথ পোলের স্বচ্ছ ও নিরেট বরফকে ব্যবহার করে এই কণার গতিপথ ধরা সম্ভব। তাই ২০১১ সালে বরফের নিচে এক ঘনমিটার এলাকাজুড়ে আমরা ‘আইসকিউব’ নামক বিশাল দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করি। সাধারণ আলো বা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বের যে গভীর অন্ধকার অংশ বা ‘ব্ল্যাকহোল’ দেখা সম্ভব নয়, এই নিউট্রিনো কণাগুলো সেখান থেকে তথ্য বয়ে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, দূরবর্তী গ্যালাক্সির রহস্য এবং নক্ষত্রের বিস্ফোরণের মতো মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর এমন সব তথ্য জানা যাচ্ছে, যা আগে মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ বিজ্ঞানী হালজেনের এই কাজ মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীর, শক্তিশালী রহস্যগুলো উন্মোচন করতে বিজ্ঞানীদের অভূতপূর্বভাবে সাহায্য করেছে বলে মন্তব্য করে। একে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে মূল্যায়ন করে।

অণুর আয়না ও নিরাপদ ওষুধ তৈরির প্রযুক্তি

এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি কাগান ও জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। অ্যাসিমেট্রিক জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব এবং অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের জন্য তাদের রসায়নে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণু দুটি রূপে থাকে, যা একে অপরের প্রতিবিম্ব। তবে সব জীবদেহে এসব অণুর শুধু একটি রূপই দেখতে পাওয়া যায়। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এ ধরনের বিষমতা কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা রসায়নবিদদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি রহস্য ছিল। নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী ওই রহস্যই উন্মোচন করেছেন। এই রহস্য হচ্ছে ‘মিরর মলিকিউল’ বা ‘ডাবল অণু’র রহস্য। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কাইরালিটি (chirality) বা আণবিক অসমতা।

সহজভাবে বিষয়টি বোঝার জন্য দুই হাতের উদাহরণ দেওয়া যায়। ডান হাতের ওপর বাঁ হাত রাখলে দেখা যাবে, দুই হাত পুরোপুরি মিলবে না। বুড়ো আঙুল দুটি দুই দিকে থাকবে। অর্থাৎ একটি হাত অন্যটির নিখুঁত আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবি; কিন্তু হাত দুটি এক নয়। একইভাবে প্রকৃতির বহু অণু বা মলিকিউল (যেমন আমাদের শরীরের প্রোটিন তৈরির উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিড) এরকম জোড়ায় জোড়ায় থাকে—একটি ডানহাতি রূপ এবং অন্যটি বাঁহাতি রূপ। ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে যখন অণুগুলো তৈরি করতে যান, তখন সবসময় অর্ধেক ডানহাতি আর অর্ধেক বাঁহাতি অণু তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃতির ম্যাজিক হচ্ছে, আমাদের শরীরের সব কোষ, ডিএনএ এবং প্রোটিন শুধু একটি নির্দিষ্ট রূপ (যেমন কেবল বাঁহাতি অ্যামিনো অ্যাসিড) ব্যবহার করে। অন্য রূপটি প্রকৃতিতে প্রায় দেখাই যায় না। একে বলা হয় হোমোকাইরালিটি। কেন প্রকৃতি একটি নির্দিষ্ট রূপকেই বেছে নিল আর ল্যাবে কেন দুটোই সমানভাবে তৈরি হয়—বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছিল শতাব্দীর বড় ধাঁধা।

গবেষণা করতে গিয়ে নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী এমন কিছু বিক্রিয়া ঘটিয়েছেন, যার মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতেও অণুর এই একতরফা রূপ তৈরি করা সম্ভব। হেনরি কাগান দেখান, কীভাবে খুব সামান্য কিছু উপাদান ব্যবহার করে বিক্রিয়া ঘটিয়ে একটি নির্দিষ্ট আয়না-প্রতিচ্ছবি বা একমুখী অণুর পরিমাণ বিপুলভাবে বাড়িয়ে দেওয়া যায় (নন-লিনিয়ার ইফেক্ট)। আর বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই এমন একটি বিক্রিয়া ঘটান, যেখানে একটি একমুখী অণু নিজেই নিজের ক্লোন বা কপি তৈরি করতে থাকে। অর্থাৎ একটি অণু থেকে নিজে নিজেই কোটি কোটি হুবহু একমুখী অণু তৈরি হয়ে যায়। একে বলা হয় অ্যাসিমেট্রিক অটোক্যাটালাইসিস। অনেক সময় ওষুধের একটি রূপ রোগ ভালো করে, কিন্তু তার আয়না-রূপটি শরীরের জন্য মারাত্মক বিষ বা বিষাক্ত হতে পারে। এই আবিষ্কার অণুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে। এর ফলে মানুষ যে ওষুধগুলো খাচ্ছে, সেগুলোর ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত ও নির্ভুল সংস্করণ তৈরিতে এটি ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ এখন নিখুঁত এবং নিরাপদ ওষুধ তৈরি করা সহজ হবে (যেমন হাঁপানি বা ভাইরাসের ওষুধ)।

ওষুধশিল্পে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা : অনেক ওষুধের অণুর একটি প্রতিবিম্ব রোগ নিরাময় করে; কিন্তু অন্য প্রতিবিম্বটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত বা অকার্যকর হতে পারে। এ আবিষ্কারের ফলে এখন ল্যাবরেটরিতে কেবল কার্যকর ও নিরাপদ নির্দিষ্ট অণুটিই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা আধুনিক ওষুধশিল্পের জন্য আশীর্বাদ।

কৃত্রিম সুগন্ধি ও স্বাদ উৎপাদন : সুগন্ধি, খাদ্য ও প্রসাধনশিল্পে সুনির্দিষ্ট গন্ধ বা স্বাদের রাসায়নিক উপাদান নিখুঁতভাবে তৈরিতে এটি দারুণ ভূমিকা রাখবে। নতুন প্রজন্মের স্মার্ট ম্যাটেরিয়ালস বা উন্নত গুণসম্পন্ন নানা ধরনের আধুনিক পদার্থ তৈরিতে রসায়নবিদদের এক নতুন হাতিয়ার দিয়েছে এই আবিষ্কার। পৃথিবীতে কীভাবে নির্জীব উপাদান থেকে প্রথমে প্রাণের স্পন্দন তৈরি হয়েছিল এবং কেন জীবদেহ কেবল এক ধরনের অণু বেছে নিল, সেই মহাজাগতিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের পথ দেখাচ্ছে এই গবেষণা।

নোবেল পুরস্কার কেমিস্ট্রি কমিটির চেয়ারম্যান হেইনার লিংকে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দুই বিজ্ঞানীর কাজকে ‘চমকপ্রদ’ আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, হেনরি কাগান এবং কেনসো সোয়াই রসায়নের দুনিয়ায় শত বছরের পুরোনো একটি রহস্যের সমাধান করেছেন। প্রকৃতি ছাড়া আর কেউ এর আগে ল্যাবরেটরিতে এই অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখাতে পারেনি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা)

একাডেমিক স্বাধীনতা যখন বুলিংয়ে পরিণত হয়

বিপ্লবের সাইরেন শহীদ আবরার ফাহাদ

নোয়াখালী যেভাবে বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের মানচিত্র

বেসামরিক অভিযান নয়, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা জরুরি

ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা এবং আমাদের সিনিয়র সাংবাদিকরা

জিন্নাহর ছবি ও ইতিহাসের দায়

বাংলাদেশে এআইনির্ভর অর্থনীতি

বুয়েটিয়ানরা কেন দেশ ছাড়ে, পেশা ছাড়ে

ভারতে ‘জেনজি’র লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

সুন্দর শরতে অসহ্য ডেঙ্গু