বাংলাদেশের অনেকেরই সেই একটি ছবি আজও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়। ২০১১ সালের জানুয়ারি, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্ত—পনেরো বছরের এক মেয়ে, লাল-নীল জামা পরা, কাঁটাতারের বেড়ায় উপুড় হয়ে ঝুলে আছে। তার নাম ফেলানী খাতুন।
বাবার হাত ধরে সে দেশে ফিরছিল, ভারতে গৃহকর্মীর কাজ সেরে। বাবা সীমান্তের কাঁটাতার টপকে এপারে চলে এসেছিলেন, কিন্তু ফেলানী পারেনি। বিএসএফের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া তার কিশোরী শরীরটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। রক্ত ঝরেছিল অনেকক্ষণ—কেউ তাকে নামাতে আসেনি। সেই ছবি দেখে পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পৃথিবীর বহু সীমান্তেই বেআইনি পারাপার ঘটে, যেমন আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তাই বলে কি মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মারা কোনো সভ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ভাষা হতে পারে? সীমান্ত আইন প্রয়োগের জায়গা হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা বিসর্জন ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের জায়গা হতে পারে না।
আজ পনেরো বছর পরও ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম একই কথা বলে যাচ্ছেন—আমি বিচার চাই। বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ, যাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, দুবার বিচারে খালাস পেয়েছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট পড়ে আছে ২০১৫ সাল থেকে, শুনানির তারিখ বারবার পিছিয়েছে। একটি মেয়ের মৃত্যু, একটি পরিবারের চোখের জল—এত দিনেও এর কোনো ফয়সালা হলো না।
কিন্তু প্রশ্ন শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে নয়। প্রশ্ন আমাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ, কূটনৈতিক দৃঢ়তা ও সীমান্তবাসীর নিরাপত্তারও। অন্যের দিকে আঙুল তোলা সহজ; কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের ব্যর্থতা খুঁজে দেখা। কেন এত বছরেও সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকের জীবন সুরক্ষিত হলো না? কেন কূটনৈতিকভাবে আমরা এমন অবস্থান তৈরি করতে পারলাম না, যাতে একজন বাংলাদেশির জীবনকে কেউ এত সহজে তুচ্ছ করতে না পারে?
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায়কে আড়াল করা নয়, আবার কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক রেটরিকও নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো—অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের আয়নায় তাকানো, আমাদের দুর্বলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির ঘাটতি কোথায় তা বোঝা। অন্যকে সংশোধন করা সবসময় আমাদের হাতে থাকে না; কিন্তু নিজেদের রাষ্ট্রকে সঠিক পথে দাঁড় করানো আমাদেরই দায়িত্ব।
সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা নয়
ফেলানী একটি নাম, একটি মুখ। কিন্তু তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার নামহীন মানুষের সারি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব বলছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সাল—এই ২০ বছরে অন্তত ১ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৪৫ জনের বেশি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যও উদ্বেগজনক—২০২১ সালে ১৮ জন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে এসে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।
এদের কেউ যুদ্ধ করতে যায়নি। বেশির ভাগই গরু ব্যবসায়ী, কৃষক, দিনমজুর—যারা পেটের তাগিদে এমন একটি সীমান্তরেখা পার হয়েছেন, যা কোনো এক ঔপনিবেশিক মানচিত্রকার বহু আগে এঁকে দিয়ে গেছেন, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার কথা একবারও না ভেবে। তাই সীমান্তে প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও স্মারক। একজন নাগরিক সীমান্তে নিহত হলে প্রশ্ন শুধু ‘কে গুলি করল’ নয়; প্রশ্ন হলো—আমরা তাকে রক্ষার জন্য কী করেছি?
সাম্প্রতিক সময়েও আমরা এমন ঘটনা দেখেছি, যেখানে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার পর প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু জবাবদিহির দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। আরো উদ্বেগের বিষয়, কখনো কখনো সরকারি পর্যায় থেকেও এমন ভাষা শোনা যায়, যা সীমান্ত হত্যার প্রশ্নে আমাদের নীতিগত অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। সীমান্তে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলেও তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার কোনো বাহিনীর থাকতে পারে না। অপরাধ হলে গ্রেপ্তার হবে, তদন্ত হবে, বিচার হবে—কিন্তু গুলি করে হত্যা কোনো সভ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ভাষা হতে পারে না।
ভালো কথা হলো, সরকারি পর্যায় থেকে পরে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়াকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে এবং বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকেও বিষয়টি তোলা হয় বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু মুখে স্বীকৃতি আর হাতে জবাবদিহির কাঠামো—এই দুয়ের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক, সেটাই আমাদের মূল সমস্যা। ক্ষতিপূরণ, বিচার, তদন্ত এবং নিয়মিত কূটনৈতিক চাপ—এসব ছাড়া শুধু বিবৃতি দিয়ে সীমান্তবাসীর আস্থা ফিরবে না।
যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমেছিল, তখন তারা শুধু একটি সরকারের পতন চায়নি। তারা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন নাগরিকের জীবনের দাম থাকবেÑসেটি ঢাকার রাস্তায় হোক আর কুড়িগ্রামের সীমান্তে হোক। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছিল জুলাই সনদ, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে জনগণ যার পক্ষে রায় দেয়। এখন নতুন সরকার গঠনের পর এর প্রতিশ্রুতিগুলো আইনে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় আছে।
সীমান্তে যদি এখনো নাগরিকের জীবন অনিরাপদ থাকে, সীমান্তবাসীর জীবনে যদি সংস্কারের কোনো বাস্তব প্রভাব না পড়ে, তাহলে ২০২৪ সালের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করা যাবে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে হয়তো সীমান্ত হত্যা একদিনে বন্ধ হয়ে যেত না, কিন্তু এমন একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠত, যেখানে নাগরিকের জীবনহানির দায় ক্ষমতাসীনরা এত সহজে এড়িয়ে যেতে পারতেন না।
প্রান্ত নয়, প্রাণকেন্দ্র
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা জনপদগুলোকে স্রেফ ‘প্রান্তিক এলাকা’ বলে দেখলে বড় ভুল হবে। এই অঞ্চলগুলোকে জাতীয় উন্নয়ন, শিক্ষা ও কৌশলগত চিন্তার কেন্দ্রে আনতে হবে—কারণ যেখানে মানুষ অবহেলিত থাকে, সেখানেই বাইরের প্রভাব, অপরাধচক্র ও বিভাজনের রাজনীতি সহজে শিকড় গাড়ে। একটি স্কুল, একটি হাসপাতাল, একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ—এসব যতটা নিরাপত্তা দেয়, কোনো সীমান্তচৌকি একা তার সমান দিতে পারে না।
সরকার ও বিরোধী দল—সবাইকে দলীয় হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে সীমান্ত নিয়ে একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করতে হবে, যার কাজ হবে সীমান্ত হত্যা, ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করা। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও নৈতিক নেতৃত্ব গঠনের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার, শহীদদের স্মরণে একটি জাতীয় সংস্কৃতি ও গবেষণা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত অপরাধের সামাজিক কারণগুলোও দেখতে হবে। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ও দুর্বল প্রশাসন মিলেই অনেক সময় সীমান্ত অপরাধের পরিবেশ তৈরি করে। তাই সীমান্ত নিরাপত্তা মানে শুধু টহল বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাধারণ মানুষ অবৈধ পথে যেতে বাধ্য না হয়।
ফেলানীর প্রশ্ন এখনো জীবন্ত
সবচেয়ে বড় কথা—জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই শক্তিশালী হতে পারে না। দুর্বল ও বিভক্ত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নিয়ে বাইরের শক্তি হিসাব করার সাহস পায়; ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের সামনে সেই সাহস তারা সহজে দেখাতে পারে না। ফেলানীর মা জাহানারা বেগম একবার বলেছিলেন—বিএসএফ তার মেয়েকে কেড়ে নিয়ে তার হৃদয়টা শূন্য করে দিয়েছে। একজন মায়ের এই একটি বাক্যের ভেতরে আছে পনেরো বছরের প্রতিটি নির্ঘুম রাত, প্রতিটি ঈদের সকাল যেখানে একটি মুখ অনুপস্থিত। সেই শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি, বিচার আজও আসেনি।
আমরা যদি আজও এই প্রশ্নের সামনে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে ২০২৪ সালের রক্তের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না। রাষ্ট্রকে এমনভাবে গড়তে হবে, যাতে কোনো অঞ্চল অবহেলিত না থাকে, কোনো নাগরিকের জীবন সস্তা না হয়।
ফেলানীর ঝুলন্ত দেহ শুধু একটি নিষ্ঠুর সীমান্ত হত্যার ছবি ছিল না। সেটি ছিল আমাদের রাষ্ট্রীয় বিবেকের সামনে ঝুলে থাকা এক প্রশ্নÑযে প্রশ্ন আজও আমাদের সম্মিলিত নীরবতার ভেতর ঝুলে আছে। পনেরো বছর পরও সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা পুরোপুরি দিতে পারিনি।
আর ফেলানীই শেষ নয়। আজও সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন হলো—এমন ধারাবাহিক মানবিক ট্র্যাজেডির সামনে জাতীয় মিডিয়া, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র আর কত দিন নীরব থাকবে? সীমান্তে প্রতিটি বাংলাদেশির জীবন আমাদের নাগরিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় আত্মসম্মান এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
লেখক : কানাডাপ্রবাসী অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক